ফুটবল-উন্মাদনা ও বিশ্বকাপ

আপডেট: 04:03:16 04/07/2018



img

এন ইসলাম

ফুটবল জ্বরে কাঁপছে বিশ্ব, জ্বরের ঘোরে কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলছে অনেকে। ফুটবল দুনিয়ার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে চলছে দ্বন্দ্ব সংঘাত উন্মাদনা। প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত-অপরিচিত, স্বামী-স্ত্রী, মা-মেয়ে, বাপ-ছেলে, ভাই-ভাইয়ে ও প্রতিবেশী-প্রতিবেশিনীদের মধ্যে। ভাবখানা এমন যে, পারলে একদল আর এক দলের চামড়া ছুলে ডুগডুগি বাজায়। অপরদিকে পেলে-ম্যারাডোনা-রোনালদো পেরিয়ে এখন নেইমার মেসি ফ্যানে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরী যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে সিসটার-মিসটার আন্টিরা। সচ্ছল বুড়োহাবড়ারা আক্রান্ত অবশ্য রুশ ভদকা আর স্বর্ণকেশী নী নয়না রুশ ললনাতে।
সুরা-সাকির গল্প বাদ রেখে চলুন খেলাধুলার ইতিহাসের পাতা থেকে একটু ঢু মেরে আসা যাক। তবে মুশকিল হলো প্রাচীন ইতিহাসের যেখানেই যাবেন নাকবোঁচা বাটুল চীনারা আপনার পিছু ছাড়বে না। তাই ওদেরকে সাথে নিয়েই গুগলের সার্চ ইনজিনে চড়ে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন ইস্টিশনে নেমে চা-সিগারেট পান করতে করতে জানা গেল খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে থেকে বিভিন্ন খেলাধুলার প্রচলন করেছিল চীনারা। জিমন্যাস্টিকস্ ছিল প্রাচীন চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। যা এখনো চীনদেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ফুটবল খেলার ইতিহাস অবশ্য অতো পুরনো না।
খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে চীন দেশে এক আড়ম্বরপূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আকর্ষণীয় ক্রীড়া উৎসবের আয়োজন হতো। এই একটিমাত্র ক্রীড়া উৎসবকে ঘিরে চমৎকার বাহারি রঙের কাপড় দিয়ে খেলার মাঠ সাজানো হতো। প্রজাদের মধ্যে উৎসবের উত্তেজনা-উচ্ছ্বাস বিরাজ করতো।
চৈনিক সভ্যতার নথিপত্র ঘেঁটে ঐতিহাসিকরা দাবি করছেন, উন্মুক্ত মাঠে রাজকীয় আড়ম্বরপূর্ণ যে খেলা হতো চীনা ভাষায় তার নাম ছিল টু সু ছু পা। ‘টু সু’ কথার অর্থ পা দিয়ে লাথি মারা। ‘ছু’ অর্থ চামড়ার তৈরি বল। পুরো অর্থ ‘চামড়ায় তৈরি বলকে পা দিয়ে লাথি মারো’। সাধারণ চীনারা অবশ্য 'টু সু' খেলা বলতো। সম্ভবত হান সাম্রাজ্যের আমলে শাসকদের জন্মদিন ও যুদ্ধজয় করার আনন্দে টু সু খেলার আয়োজন করা হতো। কালক্রমে এই টু সু খেলাই আজকের ফুটবল খেলা।
অবশ্য চৈনিক ঐতিহাসিকদের এই দাবির সাথে মোটেও একমত নয় গ্রিক এবং ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ। তাদের মতে প্রত্যেকটি দেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন খেলার জন্ম হয়েছে। সেসমস্ত খেলার বহু খেলা কালের গর্ভে বিলুপ্ত হয়েছে, আবার কিছু খেলা কালোত্তীর্ণ হয়ে বিশ্বময় স্থান করে নিয়েছে।
রোম, অটোমান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক আমলে অধিকৃত দেশে যেসব খেলাধু্লা সৈনিকরা নিয়ে যেত সেসব খেলা ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তো। ঐতিহাসিকদের দাবি, খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালের দিকে গ্রিকজাতি সর্বপ্রথম ফুটবল খেলার জন্ম দেয়, তখন এ খেলার নাম ছিল Episkyros। গ্রিক থেকে রোমে এসে এ খেলার নাম হয় Harpastum।
ফিফা প্রাচীন গ্রিক খেলা Episkyros-কে ফুটবল খেলার আদিরূপ হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও পরে তা পরিবর্তন করে প্রতিযোগিতামূলক cuju খেলাকে ফুটবলের আদি রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
চাইনিজ মিলিটারি গ্রন্থ Zhan Guo Ce-এর বর্ণনা মতে cuju খেলা সামরিক অনুশীলনের অংশ ছিল। সামরিক শৃঙ্খলার কারণেই ২০৩ খ্রিস্টাব্দে cuju খেলার কিছু নিয়মকানুন সম্রাট কর্তৃক বেঁধে দেওয়া হয়। হয়তোবা নিয়মকানুনের সূত্র ধরে cuju খেলা আধুনিক ফুটবলের জনকের স্বীকৃতি পেয়েছে। অপরদিকে চীনা সম্রাটদের সখের খেলা টু'সু' ছু' জাপানি সম্রাটদের কাছে 'কেমারি', কোরিয়াতে 'chuk-guk' নামে গেড়ে বসলেও গ্রিকদের Episkyros' রোমে গিয়ে Harpastum ইংল্যান্ডে গিয়ে mob football হয়ে যায়।
সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে, ফুটবল বা ‘ফুট বল’ শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে কোনো বলকে পা দিয়ে লাথি দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে। যেমন মধ্যযুগীয় ইউরোপে পা দিয়ে খেলা হতো এমন অনেক খেলাকে বোঝাতেই ফুটবল শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। আর এসব খেলায় অংশ নিত সাধারণভাবে কৃষকরা। অভিজাতরা যখন ঘোড়ায় চড়ে বিভিন্ন ক্রীড়ায় অংশ নিত, তখন দরিদ্র কৃষকরা পায়ের উপর ভর করে খেলতো বলেই হয়তো এর নাম ফুটবল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে ফুটবলের প্রাচীনতম ধরনটি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছুই জানা যায় না। কোথা থেকে ফুটবলের সূচনা হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে নানা অভিমত। চীন, জাপান, কোরিয়া, আমেরিকা, ইটালি, মেক্সিকো এমনকি আমেরিকার আসল মালিক রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যেও এ ধরনের খেলার প্রচলন ছিল। ১৬১০ সালে উইলিয়াম স্ট্রাসি রেড ইন্ডিয়ানদের প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে আধুনিক ফুটবলের আকৃতির পাথরের বল আবিস্কার করেছেন। দখলদার মার্কিনিরা অবশ্য ফুটবলকে সকার বলে।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়াতে আদিবাসীরা ‘ম্যার্ন গ্রক’ নামের যে খেলা খেলতো তা অবিকল ফুটবল খেলার মতো। আলাস্কার এক্সিমোরাও ‘একসাকটুক’ নামের একটি খেলা খেলতো বরফের বল দিয়ে। প্রাচীন জনপদের কাহিনিতে ফুটবলের সাথে মিল আছে এমন খেলার বিবরণী ভুরিভুরি আছে। তবুও ফুটবলের সূচনা নিয়ে মানুষের খুঁতখুঁতুনি যায়নি। ইউরোপের প্রাচীন লোকজ কাহিনির উপর ভিত্তি করে একদল গবেষকের অভিমত, ইউরোপের অন্ধকার যুগে অ্যাংলো স্যাক্সনরা যুদ্ধে পরাজিতদের কাটা মাথায় পদাঘাত করতে করতে ফুটবল খেলার আবির্ভাব হয়েছে। যদিও এই কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তবুও এটাকে নিছক কল্পকাহিনি বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেননা দাস যুগে দাস মালিক ও মধ্যযুগে বর্বর সামন্ত শাসকদের বিকৃত বিনোদনের খোরাক ছিল মানুষ। সেসময় সামন্ত প্রভুরা দাবা খেলার ঘুঁটি হিসেবে জীবন্ত মানুষ ব্যবহার করতো। গ্লাডিয়েটরদের দিয়ে নৃশংস পৈশাচিক লড়াইয়ে পরাজিতের বুক চিরে কলিজা বের করে সামন্ত প্রভু ও দর্শকদের দিকে ছুড়ে দেওয়ার সেই পৈশাচিক উল্লাস আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখেছি। কাটা মুণ্ডু নিয়ে উল্লাস, শত্রুর মুণ্ডুতে লাথি মারা এমনকি গোল হয়ে কাটা মুণ্ডু নিয়ে ফুটবলের মতো খেলা করার ইতিহাস এখনো মুছে যায়নি। শত্রুর কাটা মুণ্ডুর উল্লাসের নমুনা আমরা ভারতীয় উপাখ্যানেও পাই দেবী চণ্ডীর গলায়। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এখনো শিরশ্ছেদ করা মুণ্ডু জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হয় উল্লসিত হয়ে। তাই বর্বর যুগে শাসকবর্গকে শত্রুর কাটা মাথায় লাথি মারতে দেখে সাধারণের মধ্যে বিকল্প কিছুতে লাথি মারার ভাবনা আসাটা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে অন্ধকার যুগ পেরিয়ে মেসিডোনিয়ামে এই খেলার প্রচলন ও বিকাশ ঘটতে থাকে রাজন্যবর্গদের হাতে। মহাবীর আলেকজান্ডার, গল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর জুলিয়াস সিজার'দের কৃপায় গ্যালো-রোমান সভ্যতার পাশাপাশি এই খেলারও বিকাশ ঘটতে থাকে।
ইংরেজ ঐতিহাসিকদের মতে, ১০৬৬ সালে হাস্টিংয়ের যুদ্ধে বিজয়ী উইলিয়ামের অনুসারীদের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে ফুটবলের প্রচলন ঘটে। সেই থেকে ইংরেজরা ফুটবলকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বিশেষ দিনগুলোতে দিনের মধ্যভাগে বাজার এলাকায় একেক দলে ৫০০ জন করে এ খেলায় নামতো এবং তা চলতো সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এসব খেলায় তীব্র উন্মাদনা ও সহিংস উত্তেজনায় ব্যাপক সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটতো। চরম বিশৃঙ্খলা অরাজক পরিস্থিতির কারণে রাজা দ্বিতীয় অ্যাডওয়ার্ড ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ করেন। তবুও ফুটবল উন্মাদনা অব্যাহত থাকলে ১৩১৪ সালে আর একটি রাজ ফরমানে বলা হয় ‘একটি বড় আকারের বল নিয়ে নগরে যে কোলাহল হয়, যে অপকাণ্ড ঘটে তা ঈশ্বরের নিয়মবিরুদ্ধ। তাই রাজার নির্দেশে লন্ডন শহরে এই প্রকার খেলা নিষিদ্ধ করা হলো।’ এই নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকে ১৬৩০ সাল পর্যন্ত। এ সময় ‘অ্যানাটমি অব এবিউজেস' গ্রন্থে ফিলিপ স্টাবেজ ফুটবল সম্পর্কে লেখেন, ‘এটা এমন এক খেলা যা হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, শত্রুতা, অসন্তোষ কী না ঘটায়! কখনো কখনো মারপিট, ঝগড়া-বিবাদ, খুন-জখম ইত্যাদিতে রক্তস্রোত বয়ে যাওয়া হচ্ছে এর নৈমিত্তিক চিত্র।’
তবুও সৌভাগ্য ক্রমে ফুটবলের প্রসার ঘটেছে সেই দ্বন্দ্বমুখর মেজাজেই। রাস্তায় মারপিটও কোনো অংশে কমে যায়নি। ৩১৬ বছরের রাজদণ্ডের একদিনের জন্যেও ফুটবলের উন্মাদনা থেকে নিবৃত হয়নি ইংলিশরা। ১৬৩০ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের অভিষেক হলে ইংরেজ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম ফুটবলকে অনুমোদন করেন দ্বিতীয় চার্লস। তিনি রাজকীয় আবাস কর্মীদের দল ও ডিউক অব আলবেমার্লের ভৃত্যদের নিয়ে গড়া দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি খেলাও উপভোগ করেন।১৭৭১ সালেই ফুটবলের ১৭টি নিয়ম চূড়ান্ত করা হয়। কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে উক্ত ১৭টি নিয়ম এখনো বলবৎ রয়েছে। নতুন নিয়মে খেলার কারণে ফুটবল আরো জনপ্রিয় আরো ব্যাপ্তিলাভ করে।
১৮২৪ সালে বিশ্বের প্রথম ফুটবল ক্লাব হিসেবে এডিনবার্গের জন হোপ ফুটবল ক্লাব গঠিত হয় এরপর আরো ক্লাব গঠিত হতে থাকে ইউরোপ ইংল্যান্ড ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে। ১৮৪৮ সালে অ্যাসোসিয়েশন ফুটবলের গোড়াপত্তন হয়। ১৮৫০ সালে প্রথম ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ডের শেফিল্ডে।
ধীরে ধীরে ফুটবলের জন্য আরো নিয়ম-কানুনের প্রচলন হতে থাকে। ইতিমধ্যে শিল্প বিপ্লব ঘটে গেছে ইংল্যান্ডে, সাংবিধানিকভাবে বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় এসেছে। রাজতন্ত্র চলে গেছে পর্দার আড়ালে। উদীয়মান শক্তি পুঁজিবাদের উদ্ভবের ফলে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, কয়লার খনি আর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে অনেক শিল্প শহর আর কারখানা গড়ে উঠছে। ফুটবলেও পুঁজিবাদের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। বেশ কিছু কারখানা এখন ফুটবলের জন্য নিত্যনতুন পণ্য তৈরি করছে। শুধু পণ্য বানালেই তো হবে না, খেলাটাকেও পণ্যে রূপান্তর করতে হলে তার গ্রাহক তৈরি করতে হবে। উৎপাদন ও উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনের ধারাবাহিতায় যে বিপুল সংখ্যক নতুন দর্শকের জন্ম হয়েছে, যারা তুলনামূলক মানবিক বলে দাবি করেন, তাদেরকে গ্যালারিতে টেনে আনতে হবে। সেজন্য নতুন ইভেন্ট, নতুন গ্যালারি নতুন ক্লাব নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করছে বুর্জোয়ারা। বিলেতে তৈরি অন্যান্য পণ্যের সাথে ফুটবলকেও নিয়ে ছুটছে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে।
ভারতবর্ষে আদিতে ফুটবলসদৃশ কোনো খেলার প্রচলন ছিল কিনা ইতিহাসে তার কোন হদিস মেলে না। তবে ১৮৫৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে গঙ্গার ঘাটে নোঙর করা দুটো বিলেতি জাহাজে করেই যে এদেশে প্রথম ফুটবলের আগমন ঘটে, তার হদিস মেলে কোম্পানি আমলের নথিপত্রে। প্রতিদিন সকালে বিলেতি নাবিকরা যখন পুরনো কেল্লার মাঠে ফুটবল খেলতো তখন কেল্লার সৈনিকরা হা করে তাকিয়ে থাকতো। ১৮৫৪ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইংরেজ ও বাঙালি বাবুদের মধ্যে প্রথম ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয় এসপ্লানেড ময়দানে। সেই থেকেই ফুটবল এই উপমহাদেশে তার জয়যাত্রা শুরু করে।
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব শুরু হলে ১৪ বছর ফুটবলের কথা ভুলে যায় ইঙ্গ-বাবুরা।
নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমনের পর বেশ খোশ মেজাজে আবার ফুটবলে লাথি মারা শুরু হয়।
সাহেব-বাবুদের ফুটবলে লাথি মারা দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি কলকাতার
হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী, ক্লাসের বন্ধুদের কাছ থেকে ত্রিশ টাকা চাঁদা তুলে ইংরেজদের দোকান থেকে বল কিনে লাথি মারা শুরু করেন বন্ধুরা মিলে, খেলা তো নয় যেন বল নিয়ে হুড়োহুড়ি। নিয়মের কোনো বালাই নেই তাই বল নিয়ে এলোপাতাড়ি দৌড়াতে থাকে নগেন, ফাঁকা মাঠে বাধাহীনভাবে দৌড়াচ্ছে নগেন, পিছে তার সহযোদ্ধারা। কিন্ত না, সামনে বাঙালি বাবুরা, তার পিছনে ইঙ্গরা, নগেন তাদের পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগুনোর চেষ্টা করছে। কিন্ত কিছুতেই বলটাকে বিপদ মুক্ত করা যাচ্ছে না, নগেন প্রাণপণ চেষ্টা করে গোল পোস্টের দিকে দৌড়াচ্ছে, ইঙ্গ-বাবুরাও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্ত নগেনকে আটকানো যাচ্ছে না, সে আরো জোরে দৌড়াচ্ছে। বলটাকে পাস করে দিল বামে দাঁড়ানো শিবদাস ভাদুড়ীর কাছে, শিবদাস কোনো দিকে না তাকিয়েই গোল পোস্টে শট মেরে দিলো, দর্শকরা চেঁচিয়ে উঠলো গো...ল, গো...ল, গো...ল, কিন্ত না, বলটা গোল পোস্টের বারে লেগে ফিরে এসেছে, বল চলে গেছে ডানপাশে দাঁড়ানো বাবুদের কাছে, ইঙ্গদের হাততালি, নগেনদের চোখে জল।
১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর ১১টি ফুটবল ক্লাব লন্ডনের হলবর্নের ফ্রি মেসনস ট্যার্ভানে মিলিত হয়ে বিশ্বের প্রথম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয়। এই সংগঠনটিই ফুটবল খেলার জন্য নিয়ম-কানুন চূড়ান্ত করে। ফলে নতুন শাসক নতুন অর্থনীতি পুঁজিবাদের হাতে পড়ে খেলার সহজ নিয়মকানুন ও সাধারণ উপকরণে খেলতে পারার সুবিধা দেখে হাজার হাজার মানুষ ফুটবল খেলতে শুরু করে। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটার সাথে ফুটবলের ব্যাপক প্রসার সে সময়ের ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী অবদান রাখে। কৃষির উপর নির্ভরশীলতা কমতে থাকে। আবিষ্কৃত হতে থাকে কয়লা ও লোহার নতুন নতুন ব্যবহার কৌশল। কৃষি থেকে শিল্পপ্রধান জাতিতে রূপান্তর এবং রেল যোগাযোগের সুবিধা গড়ে ওঠার ফলে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জনগণের মধ্যে যাতায়াত বেড়ে যায়। ব্রিটিশ বণিক, সৈনিক এবং ধর্মযাজকরা এক পর্যায়ে বিশ্বের চারপ্রান্তে ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। কয়েক বছরের মধ্যে ফুটবল একটি আন্তর্জাতিক খেলায় পরিণত হয়। আর এর কৃতিত্ব সেই ইংরেজদের, যারা যখন যেখানে গেছেন সেখানেই রোপণ করেছেন ফুটবলের বীজ। একারণেই ফুটবলের জন্ম যেখানেই হোকনা কেনো ইংল্যান্ডকে আধুনিক ফুটবলের জনক বলা হয়।
১৯০৪ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে সাতটি ইউরোপীয়ান দেশের বৈঠকে ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ফিফা) গঠিত হয়। যা ফুটবলের উন্নয়নকারী এবং নিয়ন্ত্রক। ফিফার তত্ত্বাবধানে ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজনে প্রথম আসরটি বসে উরুগুয়েতে। ১৩টি দেশ প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয়। ফাইনালে উরুগুয়ে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে। সেই থেকে প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে। ক্রীড়াজগতের একক সর্ববৃহৎ এই মহাযজ্ঞের নেপথ্যে থাকে পুঁজিপতি শ্রেণি। এখানেও পুঁজিবাদের সেই চিরাচরিত নিয়ম, খেলাটা উপলক্ষ, মুনাফাটা মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্র পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফাযজ্ঞ নির্বিঘ্ন করতে দায়িত্ব পালন করে। ফিফার কর্তাদের দায়িত্ব শুধুমাত্র মালিকদের পাতানো ছকে খেলাটা পরিচালনা করা।
বিশৃঙ্খল ফুটবলকে পুঁজিবাদ যেভাবে তার মুনাফার স্বার্থে সুশৃঙ্খল ও ছন্দময় করে গোটা মানবজাতির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। একইভাবে মুনাফার স্বার্থে পুঁজির তীব্র প্রতিযোগিতায় সেই ছন্দময় নান্দনিক ফুটবলও এখন তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে তার সমস্ত নান্দনিকতা বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র গোলের পিছে ছুটছে। একেকটা গোলের মূল্য এখন হাজার হাজার কোটি ডলার। দর্শকদের কাছেও এখন আর নান্দনিক ফুটবলের কোনো কদর নেই, তারাও গোল চায়, পছন্দের দল গোল করুক তা সে যতই নৃশংস বর্বর উপায়ে হোক না কেনো দর্শকরা উন্মাদনায় নেচে গেয়ে উঠবে। দর্শক গ্যালারির ঠিক এমন উন্মাদনা দেখতে পাওয়া যায় গ্লাডিয়েটর মুভিতে। এ যেন সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ যা পুঁজিপতি শ্রেণি তার লালিত মনে ধারণ করে।
তাই পুঁজিবাদের বিলোপ ছাড়া যেমন মানবিক সমাজ সম্ভব না তেমনি পুঁজিবাদের কাছে বিনোদনধর্মী কোনো খেলাধুলাও আর আশা করা যায় না।
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরগুলো এখন আর শুধুমাত্র খেলার আসর নয়, সুরা-সাকি হয়ে উঠেছে এর অন্যতম অনুসঙ্গ। বিশ্বকাপ ফুটবল আর সেক্স যেন একটির সঙ্গে আরেকটির পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
যেসব ফুটবল ভক্ত বিশ্বকাপের আসরে জড়ো হন তাদের জন্য থাকে নারীসঙ্গ ভোগের নানান আয়োজন। তারা চাইলেই যে কোনো ধরনের নারীসঙ্গ ভোগ করতে পারেন। এ জন্য বিশ্বকাপের আসরকে কেন্দ্র করে দেহপসারণীদের একটি রমরমা ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। অন্য দেশ থেকে দেহব্যবসায়ী নারী, যুবতী আগে থেকে হোটেল ভাড়া নিয়ে খদ্দেরের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।প্রয়োজনে রাষ্ট্র নিজেও দেহপসারিণী আমদানির অনুমতি দিয়ে থাকে। বিষয়টাতে এতদিন রাখঢাক ছিল কিন্ত ২০০৬ তে জার্মানি আসরে ৪০ হাজার, ২০১০ এ দক্ষিণ আফ্রিকার আসরে ৮০ হাজার এবং গত বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে ব্রাজিল সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় লক্ষাধিক দেহপসারিণী আমদানির সাথে সে দেশের যুবতী নারীদের সাথে অবাধ যৌনাচারের সুযোগ করে দিলে মিডিয়াতে তা উঠে আসে।
এবারের বিশ্বকাপের আসর রুশ ভদকা আর স্বর্ণকেশী নীল নয়না রুশ যুবতীদের সঙ্গ পাবার একটা মওকা করে দিলেও বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে রাশিয়ার নারী বা যুবতীদের যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে কেন্দ্র করে এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। পার্লামেন্টের পরিবার, নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির চেয়ারওম্যান তামারা প্লেটনিওভা বিদেশিদের সঙ্গে তাদের সেক্স নিষিদ্ধ করেন। তবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন রাশিয়ান এমপি মিখাইল দেগতিয়ারিওভ। আবার তামারার নিষেধাজ্ঞাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এমপি মিখাইল দেগতিয়ারিওভ প্রকাশ্যে রুশ নারীদের উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে সেক্স করো তাদেরকে বিছানায় টেনে নাও। তারমতে সফররত ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে রুশ মেয়েদের সন্তান নেয়া উচিত। এসব সন্তান একদিন গর্ব করে বলবে তারা বিশ্বকাপ সন্তান। তাদের পিতামাতা রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ চলাকালে তাদের জন্ম দিয়েছেন। ফলে বিশ্বকাপ ফুটবল রাশিয়ায় যৌনতার এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করেন রুশ যুবতীদেরকে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেদেরকে নিতে দেয়া উচিত। তবে বিদেশি কালো চামড়ার লোকদের সঙ্গে যেন যৌন সংসর্গে জড়িয়ে না পড়েন রাশিয়ান মহিলারা।
অন্যদিকে যারা খেলা উপভোগের পাশাপাশি সুরা-সাকির বৈচিত্র্য খুঁজবেন, তাদের জন্য মস্কোতে গড়ে তোলা হয়েছে মানবীয় গুণসম্পন্ন নারী রোবটের এক বিশাল জগৎ। সেখানে একজন পর্যটক ঘণ্টায় ২৪ থেকে ৪০ ডলারের বিনিময়ে এসব নারী রোবটের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে পারবেন। মানবীয় গুণসম্পন্ন রোবটগুলোকে দেখতে একেবারে বাস্তব মনে হয়। মস্কোতে ব্যবসায়িক এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘দ্য ডলস হোটেল’। এখানে নারী রোবট দিয়ে সাজানো হয়েছে। উদ্দেশ্য, বিশ্বকাপ উপলক্ষে যে হাজার হাজার ভক্ত মস্কো সফরে যাবেন তাদের মনোরঞ্জন করে টু পাইস কামানো। সদ্যগজিয়ে উঠা রোবটপল্লির মালিক দমিত্র আলেক্সানদ্রোভ বলেন, চারিদিকে যখন এইচআইভির ঝুঁকি তখন রোবট নারীরা যৌন জীবনের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা। রাশিয়ায় অনেক দিনের পুরনো একটি সমস্যা সমাধানেরও এটা একটি উপায়। তবে জীবন্ত দেহপসারিণীরা রোবট পল্লীর তীব্র প্রতিবাদ জানালেও বৈচিত্র্যের সন্ধানীদের কথা বিবেচনা করে সরকার কর্ণপাত করেনি। রক্তমাংসের পসারিণীরা তাই ব্যবসা মন্দার আশঙ্কা করছে। যদিও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যতই মন্দা বিরাজ করুক না কেনো মানুষের চিত্তে স্থান করে নেওয়া বিভিন্ন খেলা, মাদক আর এই ঘৃণিত দেহ ব্যবসা কখনোই মন্দা যাবার নয়।