ফুলের রঙে রঙিন স্বপ্ন

আপডেট: 06:51:45 12/02/2019



img
img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ফুলের রঙে স্বপ্ন রাঙাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঝিনাইদহের ফুলচাষিরা।
চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলার চার উপজেলায় ফুলের চাষ হয়েছে ২৪৫ হেক্টর জমিতে। গেল বছর জেলায় চাষ হয়েছিল ২৫৫ হেক্টর জমিতে। সবচেয়ে বেশি ফুলের চাষ হয় জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে। যে কারণে এ এলাকাটি ফুলচাষের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।
১৯৯১ সালে এ এলাকায় প্রথম ফুলচাষ করেন বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ছব্দুল শেখ নামে এক শৌখিন কৃষক। তিনি ওই বছর মাত্র ১৭ শতক জমিতে চাষ করে স্থানীয় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও জাতীয় দিবসগুলোতে প্রায় ৩৪ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেন। এরপর এলাকায় বিভিন্ন জাতের ফুল চাষের বিস্তার লাভ করতে থাকে। বর্তমানে এলাকার হাজার হাজার ফুলচাষি প্রতিবছর ফুল বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে।
প্রতিবছর বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে এ এলাকায় উৎপাদিত ফুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। চলতি মাসেই রয়েছে তরুণ তরুণীদের বড়সড় উৎসবের দিন বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এছাড়া রয়েছে ২১ ফেব্রæয়ারি মাতৃভাষা দিবস। এ দিবসের ফুলের বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার ফুলচাষিরা।
ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাঠের পর মাঠে চাষ করা হয়েছে লিলিয়াম, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গ্লাডিওলাসসহ নানা জাতের ফুল। এসব ফুল ক্ষেত থেকে সংগ্রহ ও মালা গাঁথা থেকে শুরু করে বিক্রি করা পর্যন্ত নানা কাজ মেয়েরা করে থাকে। ফলে পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার বড়ঘিঘাটি গ্রামের ফুলকন্যা পুতুল, ফারজানা ও আয়েশা বেগম জানান, সারা বছরই তারা ফুল তোলার কাজ করেন। কিন্তু এখন কাজ বেশি। আয়-উপার্জনও ভালো। প্রতি ঝাপি ফুল তুলে গেঁথে দিলে ১২ টাকা মজুরি পান তারা। প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৭ ঝাপি ফুল তোলা যায় বলে জানান তারা। 
ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ফুলচাষি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রতি বছরই ফুল চাষ করি। এবছর আমি ১৬ কাঠা জমিতে ফুল চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার টাকা। জানুয়ারি ও ফেব্রæয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেছি। আসছে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।’
একই গ্রামের ফুলচাষি টিপু সুলতান বলেন, ‘২০১৭ সালে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে পাঁচ বিঘা জমিতে জারবেরা ফুলের চাষ করেছিলাম। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছি। এবছর প্রায় দুই বিঘা জমিতে গোলাপের চাষ করেছি।’
এলাকার পুরনো এই ফুলচাষির আশা, আসছে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না এলাকার ফুলচাষি নয়ন হোসাইন জানালেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফুলচাষ লাভজনক।
বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, দুপুর থেকে শত শত কৃষক তাদের ক্ষেতে উৎপাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইনজিনচালিত বিভিন্ন পরিবহনযোগে নিয়ে আসছেন। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ড ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে।
সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষের দিন, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভালোবাসা দিবস প্রভৃতি দিনে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। এ সময় দামও থাকে ভালো।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিএম আব্দুর রউফ জানান, ঝিনাইদহ মাটি ও আবহাওয়া ফুলচাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ বছর জেলায় প্রায় ২৪৫ হেক্টর জমিতে লিলিয়াম, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদাসহ নানা জাতের ফুল চাষ হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় গাদাফুল।
‘তবে, দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও দ্রুত পচনশীল এ ফসল সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার। ফলে যখন বাজারে ফুলের যোগান বাড়ে, তখন হঠাৎ দাম কমে যায়। সেসময় লোকসানে ফুল বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না চাষিদের,’ বলছিলেন কৃষি কর্মকর্তা রউফ।

আরও পড়ুন