ফেসবুকের ভালো-মন্দ

আপডেট: 07:21:57 11/02/2018



img

রূপক মুখার্জি

ফেসবুক আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার। ফেসবুক নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। ফেসবুকের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিদের এবং একই সাথে হতাশার সুর বেজে উঠেছে। তবুও আসার কথা হলো, ফেসবুক সহসাই হারিয়ে যাচ্ছে না। তবে এটাও সত্য নয় যে, আগামীর পৃথিবী হবে ফেসবুকের পৃথিবী। ব্যবহারকারীদের মনে রাখতে হবে, এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর নয়। হুমকিও নয়। কেননা, শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ফেসবুকের অবদান ও গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়। শাসন ব্যবস্থার সাথে ফেসবুক জড়িত হয়ে পড়েছে।
দুইশত কোটি মানুষের একটি অভিন্ন প্লাটফর্ম হলো ফেসবুক। ফেসবুকের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বকে কেবল তাত্ত্বিকভাবে ‘বিশ্বগ্রাম’ নয়, বাস্তবিকই এক বিস্ময়কর ‘ভার্চুয়াল’ জগতে পরিণত করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। মাত্র এক যুগের মধ্যেই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ সমবেত হয়েছে ফেসবুক নেটওয়ার্কিংয়ে।
সহজ ভাষায়, পৃথিবীর অগুনতি মানুষের ধ্যান-ধারণা এবং বেঁচে থাকার শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো হয়ে পড়েছে ফেসবুক। ফেসবুকের কল্যাণে বর্তমানে পৃথিবী একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে।
ফেসবুকের কল্যাণকর তথা শুভ দিক যেমন আছে, তেমনি অকল্যাণকর বা অশুভ দিকও রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বে ফেসবুক নিয়ে ব্যবহারকারীদের মাঝে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ফেসবুক নিয়ে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শন পার্কার ‘অশনি বার্তা’ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি তিনি এই মর্মে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, ‘একমাত্র ঈশ্বরই জানেন ফেসবুক আমাদের সন্তানদের ‘মস্তিস্ক’ নিয়ে কীভাবে খেলছে।’ শন পার্কারের পাশাপাশি ফেসবুকের উন্নয়ন বিষয়ক সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট পালিহা পিথিয়া বলেছেন, ‘মানুষের সামাজিক বন্ধন নষ্ট করে দিচ্ছে ফেসবুক। মানুষের ভেতরের কিছু সহজাত দুর্বলতাকে পুঁজি করে ফেসবুক মূলত মানুষকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছে ‘রোবট নিয়ন্ত্রিত’ জীবনের দিকে। আর সস্তা প্রচারের লোভে মানুষ ভুলে যাচ্ছে নিজের মেধা ও সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগানোর কথা।’
আত্মসমালোচনা করে তিনি বলেন, এই মাধ্যমটি এক ধরনের মাদক। ব্যবহারকারীদের ফেসবুকে আসক্ত করার জন্য তিনি নিজে খুবই অপরাধ বোধে ভোগেন। এ গোপন কথাও তিনি প্রকাশ করেছেন যে, মানুষকে ফেসবুকে আসক্ত করার জন্য মানবমনের দুর্বল জায়গাগুলোকে টার্গেট করার সিন্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন ফেসবুকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আর এভাবে ব্যবহারকারীদের ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, শেয়ার’, ‘ছবি’ ইত্যাদির ফাঁদে ফেলতে সক্ষম হন তারা।
এখন অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, এক সময় সমাজব্যবস্থায় মানবীয় বন্ধনগুলো যেভাবে কাজ করতো, ফেসবুক তা খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে। ফেসবুক মূলত মাদকের মতো স্বল্প মেয়াদে ব্যবহারকারীদের মনে আনন্দ দিয়ে ‘ফিডব্যাক’ এর ফাঁদে ফেলে দেয়। এখানে ফিডব্যাকের ফাঁদ হলো, কোনো লেখা বা মন্তব্য কিংবা ছবি পোস্ট করার পর ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, ‘শেয়ার’, ‘রিঅ্যাকশন’ ইত্যাদির জন্য অপেক্ষা করা। এতে করে, ব্যবহারকারীদের সময় নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মানুষের সৃজনশীলতা।
আসলে এসকল সামাজিক মাধ্যম মানুষকে যেভাবে পরিচালিত করছে, মানুষ সেইভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। অনেকে এমাধ্যমকে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করার ‘কৌশল’ হিসাবে গ্রহণ করছে। যদিও এ জনপ্রিয়তা অনেকাংশেই ভঙ্গুর। এতে করে, সময় ও ব্যক্তি মূল্যায়নের অপরিসীম ক্ষতি হচ্ছে। ফেসবুক মানুষকে ‘রিউমার-গবলার’ তথা ‘গুজবখেকো’ জীব বানাচ্ছে। দেরিতে হলেও ফেসবুকের সর্বোচ্চ কর্তারা বুঝেছেন, তারা একটি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব’ সৃষ্টি করেছেন।    
এতো কিছুর পরেও মোদ্দা কথা হলো, সাধারণ মানুষকে ফেসবুকের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে উপলব্ধি করতে হবে। পরমাণু শক্তির মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বিপুল শক্তির অধিকারী। এই শক্তিকেও ব্যক্তি পর্যায়ে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে, মানবজাতির জন্য ফেসবুক অপরিমেয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই সত্য এবং এই সচেতনতা যত দ্রুত সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে, ততই মঙ্গল।

লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক