বটতলায় ফিরলো গ্রামীণ ঐতিহ্য

আপডেট: 05:56:36 01/04/2018



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : প্রাচীন বটগাছের নিচে এক কোণে গ্রামের কিশোরীরা বউচি খেলছে। অন্য এক কোণে কিশোর-কিশোরীরা খেলছে কানামাছি। আবার কোথাও চলছে রাখাল বালকদের ডাংগুলি এবং কাচের মার্বেল খেলা। এক পাশে দেখা গেল মাঠের ক্লান্ত কৃষকরা গাছের ছায়ায় গোল করে বসে আছেন। সেখানে এক বয়স্ক কৃষকের মুখে অতীতের নানা গল্প শুনে মজা করছেন।
শনিবার এরকমই হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ চিত্র দেখা গেল কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সুঁইতলা মল্লিকপুর বটগাছের নিচে।
দেশে আর্থসামাজিক উন্নতির কারণে মানুষের চাওয়া পাওয়া রুচিসহ জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনের ফলে অতীত গ্রামীণ সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম। গ্রামীন কৃষিসমাজে মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে আজকের প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী এই উৎসব। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে কালীগঞ্জের মরহুম কাজী আব্দুল ওয়াহেদ ফাউন্ডেশন। মরহুম কাজী আব্দুল ওয়াহেদ কালীগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। অনুষ্ঠানটির নানা আয়োজনের মাধ্যমে অতীতের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন আয়োজকরা।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র। এরমধ্যে ছিল কীভাবে অতীতের গ্রামীণ জীবনে চাঁদনি রাতে বাড়ির উঠানে গোল হয়ে বসে লণ্ঠন জ্বালিয়ে সব বয়সী মানুষের সামনে বয়স্ক ব্যক্তিরা রূপকথা, রাজারানি-রাজকন্যা-রাজপুত্রদের গল্প শোনাতেন। কখনো কখনো চলতো পুথিপাঠের আসর। আবার গ্রামের হাটখোলা বা মক্তবের মাঠে মিলেমিশে আয়োজন করতেন পালাগান, গুনাইবিবি, রূপবানসহ নানা নামের যাত্রাপালা। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে সারাদিন বৃষ্টিতে ভেজা কৃষকেরা ক্লান্তি দূর করতে জারি সারি গেয়ে সারা মাঠ মাথায় করতেন। চৈত্রের ক্লান্ত দুপুরে রাখাল ছেলের বাঁশির সুরে জেগে উঠতো কৃষকের মন। নতুন ধান ঘরে ওঠার পর গ্রামে আয়োজন করা হতো নবান্ন উৎসবের। বিয়ে হলে বর-বউ যেতেন পালকিতে চড়ে। পরিবারের মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িসহ আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যেতেন ছই দিয়ে ঘেরা সাজানো গরুগাড়িতে করে। বনভোজন বা দূরের কোনো গ্রামে যেতে বাহন হিসেবে ব্যবহার হতো গরুগাড়ি। গ্রামের যে কোনো উৎসব আয়োজনে মাটিতে শীতলপাটি পেতে লম্বা সারিতে বসিয়ে খাবার পরিবেশন করা হতো কলাপাতা অথবা পদ্মপাতায়।
মরহুম কাজী আব্দুল ওয়াহেদ ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক কাজী এমদাদুল হক এমদাদ জানান, কালের বিবর্তনে গ্রামীণ জীবন থেকে এ সব হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির কারণে হারিয়ে গেছে অতীত সংস্কৃতি। হারিয়ে যেতে বসা এসব তুলে ধরতেই কালীগঞ্জে অবস্থিত সুঁইতলা মল্লিকপুরের সুবৃহৎ বটবৃক্ষের নিচে আয়োজন করা হয় নানা গ্রামীণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সবাই গ্রামীণ সাজে সেজে একটি পালকি ও ছই করে সাজানো ছয়টি গরুর গাড়ি নিয়ে পৌঁছায় বটবৃক্ষের নিচে। এরপর শুরু হয় নানা গ্রামীণ খেলাধুলা।
তিনি আরো জানান, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা অতীত ভুলে যাবো এটা হয় না। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে অতীত গ্রামীণ সাংস্কৃতি মনে করিয়ে দিতেই এমন আয়োজন।
বনভোজনে অংশ নেওয়া দৌলতপুর গ্রামের বাবুল হোসেন মোল্যা জানান, আজকের দিনে গ্রামীণ সমাজেও শহুরে ছাপ পড়েছে। মানুষ ক্রমে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সব সময় রয়েছে ব্যস্ততা। আজকের প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি ফেলে বিদেশি সংস্কৃতিতে ঝুঁকে পড়ছে। যে কারণে তারা অতীতের গ্রামীণ সমাজের কৃষক শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা নতুন প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দিতে এমন উদ্যোগ নিয়েছেন।
কোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘গ্রামীণ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে। মানবসভতার বিকাশ ঘটেছে। দেশও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের অতীত ভুলে যাবো। যারা নতুন প্রজন্মের মাঝে আমাদের অতীতের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কৃষকদের জীবনযাত্রার দিকগুলো তুলে ধরেছেন তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই।’