বদলে যাওয়া রাজনীতির উল্টো স্রোতে মার্কেল

আপডেট: 01:50:28 22/11/2016



img

মতিউর রহমান চৌধুরী, লন্ডন

বদলে যাচ্ছে দুনিয়া। নির্বাসিত হচ্ছে উদার রাজনীতি। দুঃসহ পরিস্থিতিতে মুক্তচিন্তা। এক ধরনের নয়া জাতীয়তাবাদ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে রাজনীতিকে। দেশে দেশে পরিবর্তনের হাওয়া। এলোমেলো করে দিচ্ছে সব। ‘ভূমিকম্পে’ তছনছ সনাতনী রাজনীতি। চারদিকে জাতিগত সংঘাত। যুদ্ধ-বিগ্রহতো আছেই। উদার নেতৃত্বের সংকট। এরমধ্যে ব্যতিক্রম একজন। অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। জার্মানির চ্যান্সেলর। অন্য এক রাজনীতিবিদ। সমালোচনা তাকে নিপীড়নের পথে ঠেলে দেয় না। মুক্ত চিন্তাকে তিনি গলাটিপে ধরেন না। সিভিল সোসাইটিকে দেখান না রক্তচক্ষু। শত্রুর প্রতি প্রদর্শন করেন না নিষ্ঠুরতা কিংবা বন্ধুর প্রতি আনুকূল্য। লোভ-লালসা থেকে নিজেকে রেখেছেন দূরে। রাস্তায় মিছিল হচ্ছে। ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। তার ছবিতে বসানো হচ্ছে মুসলিম শরণার্থীর মুখ। পাশ দিয়ে তার মোটর শোভাযাত্রা যাচ্ছে। পুলিশি কোনো অ্যাকশন নেই। বরং তিনি গাড়িতে বসে মৃদু হাসেন। বিরোধী মত দমানোর কোনো কৌশলই নেননি তিনি। ১১ বছর পার করে দিলেন এভাবেই। এই যখন অবস্থা রোববার বিকালে মাইকের সামনে এলেন। তার সামনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির হাজার হাজার সমর্থক।
নীরবতা ভাঙলেন। বললেন, বহুদিন যাবৎ দেখছি, মিডিয়া আমাকে নিয়ে অনেক খবরই লিখছে। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। আমি সব মতকেই শ্রদ্ধা করি। ফের নির্বাচনে দাঁড়াবো- এ নিয়ে অন্তহীন জল্পনা। অনেক ভেবেছি, অনেক চিন্তা করেছি। ইউরোপের কথা ভেবেছি, দুনিয়ার কথা ভেবেছি। নিজের দলের কথাতো অবশ্যই চিন্তা করেছি। অনেক হিসাব-নিকাশ করে দেখলাম, নির্বাচনী ময়দানে আমাকে থাকতে হবে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী নির্বাচনে লড়াই করার। এ ঘোষণায় হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল জার্মানি। তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। আগামী বছরের শেষদিকে জার্মানিতে নির্বাচন। কেন মার্কেলকেই বেছে নেয়া হলো। কারণ তার বয়স অন্যদের তুলনায় কম। বার্নি স্যান্ডার্স ৭৫ বছর বয়সে নির্বাচিত হতে চেয়েছিলেন। হিলারির বয়স ৬৯। আর ডনাল্ড ট্রাম্প তো ৭০ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। মার্কেল তার কাজ পছন্দ করেন। কাজের মধ্যেই ডুবে থাকেন। তার পার্টি তার কোনো বিকল্প খুঁজে পায়নি। সর্বোপরি তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক ক্যারিশমা তুলনাহীন।
৬২ বছর বয়স্ক ডক্টর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল- উদারপন্থি হিসেবেই সমধিক পরিচিত। পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্রী। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন ১৯৯০ সনে। ’৯৪ সনে হয়ে যান পরিবেশ মন্ত্রী। পূর্ব বার্লিনের যে পরিবারে তার জন্ম হয়, সেটা মোটেই সচ্ছল ছিল না। থাকতেন বার্লিনের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে। বিজ্ঞানী স্বামী ইওয়াখিম সাউয়ার মিডিয়াবিমুখ। সুপার মার্কেটে যাওয়া কিংবা ছুটি কাটানো থেকে শুরু করে সব কিছুতেই থাকতেন আড়ালে। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট কোহল তাকে বলতেন, মাই গার্ল। ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। ও যাবে, অনেক দূরে। ১৬ বছর শাসন করেছিলেন হেলমুট কোহল। সে রেকর্ড ছুঁতেই হাঁটছেন মার্কেল। রোববার চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যখন ঘোষণা দেন, তখন সামনে একটা জরিপের ফলাফল এলো- ৬৫ ভাগ মানুষ এখনো মার্কেলকে চান। নয়া জাতীয়তাবাদ জার্মানিকে তার লক্ষ্য থেকে এখনো টলাতে পারেনি। তবে মার্কেলের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় কয়েক মাস আগে স্থানীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অনেক ভাষ্যকারই বলেছিলেন, মার্কেল জমানার কি ইতি ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি তার জোটের মধ্যেও সংশয় তৈরি হয়েছিল। মার্কেল ২০০৫ সনের ৫ই নভেম্বর ইউরোপের অর্থনীতির পাওয়ার হাউস হিসেবে খ্যাত জার্মানির দায়িত্ব নেন। প্রথম মহিলা চ্যান্সেলর। ২০১৫ সনে হন টাইম পারসন অব দ্যা ইয়ার। জর্জ ডব্লিউ বুশ, টনি ব্লেয়ার, জ্যাক শিরাক, বার্লোসকোনি রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু মার্কেল আছেন। অনেক চ্যালেঞ্জ তার সামনে। অর্থনৈতিক মন্দা, শরণার্থী সমস্যা, রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেন দখল, সর্বশেষ হোয়াইট হাউসে নতুন নেতৃত্ব এসব নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষকরে শরণার্থী নিয়ে মার্কেল অনেক চাপের মুখে। সমালোচনা সত্ত্বেও জার্মানির সীমান্ত খুলে দেন তিনি। প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী জার্মানি জুড়ে। তিনি বলছেন, আমি জানি, বুঝি। দেশের অর্থনীতি এতো বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে স্থান দিতে সক্ষম নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানবিকতা আগে। কামানের গোলায় মানুষের দেহ ছিন্নভিন্ন হচ্ছে। আমি কি তাহলে চুপ করে বসে থাকবো। রাজনীতি যদি মানবিকতা হয়, আমি চুপ থাকতে পারি না। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা দেশে ও বাইরে। ইউরোপের নেতারা তার সমালোচনায় মুখর। ব্রেক্সিটতো হলো অনেকটা এ কারণেই। কিন্তু মার্কেল দমবার পাত্রী নন। শরণার্থীদের কেউ কেউ জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়লো। চাপের মধ্যে পড়ে গেলেন মার্কেল। প্রচুর সমালোচনা যখন হচ্ছে, মানুষ যখন রাস্তায় নেমেছে, তখন তিনি দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, শরণার্থীরা এ দেশে জঙ্গিবাদ আমদানি করে নিয়ে আসেনি। মার্কেলের বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাতে কি? কে ভেবেছিল, ব্রেক্সিট হবে? ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস বদলে দেবেন? এ অভিজ্ঞতা সামনে রেখে মার্কেল বলছেন, মানুষের ওপর তার রয়েছে অগাধ বিশ্বাস। তারা অনিশ্চয়তাকে আমন্ত্রণ জানাবে না। অন্তত দু’টো দেশে আমরা
দেখছি, অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ কিভাবে হা-হুতাশ করছে। মার্কেল যাই বলুন না কেন, ব্রেক্সিট জ্বরে কাঁপছে দুনিয়া। রাজনীতির ধ্যান-ধারণা, ইতিহাস কিংবা মূল্যবোধ চাপের মুখে পড়েছে। ভাইয়ে ভাইয়ে মমত্ববোধ ক্রমশ হিংসায় পরিণত হয়েছে। ম্যারিন ল্য পেন ফ্রান্সে ঝড় তুলেছেন। আগামী বছর দেশটিতে নির্বাচন। প্রাথমিক নির্বাচনে নাটকীয় ফলাফল দেখা যাচ্ছে। যদিও মার্কেল এ থেকে আলাদা। তেমন কঠিন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তার সামনে নেই। দুইদিন আগে বারাক ওবামা মার্কেলের উপস্থিতিতেই বলেছেন, তিনি যদি জার্মানির নাগরিক হতেন তাহলে মার্কেলকেই ভোট দিতেন। জার্মান রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ডেকার বলেছেন, এটা অভাবনীয়। কেবল মার্কেলকে সামনে রেখেই এমনটা ভাবা যায়। ইতালিতে গত ৭০ বছরে ২০ জন প্রধানমন্ত্রী। বৃটেনে ১৫ জন। কিন্তু মার্কেল? তিনি বলেন, জার্মানিতে কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। যতবার ইচ্ছা দাঁড়ানো যায়। রাজনীতিবিদদের নিজ থেকেই সরে যাওয়া উচিত। কিন্তু বিকল্প না থাকলে কি করা যাবে? মার্কেলের বিকল্প দলেও নেই, বাইরেও নেই। মার্কেল সহকর্মীদের বলছেন, তিনি শেষ যুদ্ধ করতে চান। অনেকটা জুয়া খেলার মতো। একদা যারা মার্কেলকে কুইন অব জার্মানি বলেছিলেন, তারা এখন বলছেন, তিনি হচ্ছেন পশ্চিমা বিশ্বের উদার রাজনীতির শেষ রক্ষাকবচ। সত্যিকার অর্থেই এক কঠিন সময়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। নয়া জাতীয়তাবাদের আঘাতে রাজনৈতিক মানচিত্র যখন ছিন্নভিন্ন তখন উদার রাজনীতি মার্কেলের জন্য কতটুকু সহায়ক হবে- এ নিয়ে তো প্রশ্ন রয়েছেই। কিন্তু মার্কেল গত ১১ বছর যেভাবে হাল ধরেছেন জার্মানির, তাতে তার কট্টর সমালোচকরাও বলছেন, আর যাই হোক অর্থনীতি তো স্থিতিশীল রয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে। পুতিনের সঙ্গে লড়াই করবারই বা কে আছে। মুক্ত দুনিয়ার নেতাই বা কে এই মুহূর্তে। তাই তো সবাই বলছেন, অ্যাঙ্গেলা মার্কেলই হচ্ছেন মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতা। মুক্ত বিশ্বের শেষ বাতিঘর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ত্রিমোতি গার্টনও তাই বলছেন, মার্কেলই মুক্ত চিন্তার, মুক্ত বিশ্বের নেত্রী।
(মানবজমিন থেকে)