বদলে যেতে হবে ট্রাম্পকে

আপডেট: 02:59:33 16/11/2016



img

আহমেদ সুমন

এ কথা সবার জানা যে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। কোন দলের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, সেটি বড় কথা নয়; বড় এবং সত্য কথা হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছেন। আমেরিকায় বহু দলীয় অনুশীলন বিদ্যমান থাকলেও সেখানে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান—এ দুই পার্টির মধ্যেই ক্ষমতার অদল-বদল ঘটছে। গত দুই দশককালে রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ (বুশ সিনিয়র), বুশ জুনিয়র, ডেমোক্রেট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা—তারা প্রত্যেকে দুই মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।
মুখ্যত দলীয় পরিচিতির বদলে এবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি বনাম ট্রাম্প—এ দুজনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যই আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল বেশি। নির্বাচনী প্রচারণাকালে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণী বিষয়ে হিলারির উদার, সহনশীল চিন্তাভাবনার বিপরীতে ট্রাম্পের অনেক কথা ও আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণের এক বিরাট অংশের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল। ট্রাম্পকে নিয়ে বহির্বিশ্বেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার প্রকাশ লক্ষ করা গেছে। ট্রাম্পের জয়ে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ দেখা দিতে পারে, বিশ্বও হয়ে উঠতে পারে অস্থিতিশীল—এমন অনেক কথাই নির্বাচনকালে উচ্চারিত হয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উদার গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী নাগরিক সমাজ, অভিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো, নারী সমাজের একটা বড় অংশ এবং মূলধারার গণমাধ্যমগুলো প্রকাশ্যে ট্রাম্পের ‘বিরুদ্ধে’ অবস্থান নিয়েছিল। বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এ জন্য বললাম যে গণমাধ্যমগুলো নির্বাচনী জরিপে বরাবরই হিলারি এগিয়ে থাকার তথ্য প্রকাশ করেছিল।
আমেরিকার গণমাধ্যমগুলো যেসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ডাটাবেজ তৈরি একটি জরিপ সম্পন্ন করে, সেখানে জরিপের নির্ভুলতা দীর্ঘকাল ধরে প্রশ্নের মুখে পড়েনি।
কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম দেখে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যার ফলে জরিপের পূর্বাভাস মেলেনি। যেকোনো গবেষণা বা কাজের ফলাফলের একটা ধারণা বা পূর্বানুমান করা হয়। কাজ শেষে ওই পূর্বানুমান বা ধারণা নাও মিলতে পারে। পূর্বানুমান মেলা বা না মেলা নিয়ে প্রপঞ্চগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বব্যাপী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা যদি ছিল এমন যে ট্রাম্প জিতবেন না, তবে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ধারণার বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প আমেরিকার গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।
রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেকেই ‘ক্ষমতা’ শব্দটি পরিহার করে ‘দায়িত্ব’ বলতে চান। এমন মতের অনুসারীদের ব্যাখ্যাটিও গ্রহণযোগ্য। ক্ষমতার মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা কাজ করে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব বরং ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল করে তোলে। ট্রাম্প ক্ষমতা বা দায়িত্বের বাইরে থেকে যেসব কথা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বিজয় ভাষণে বেশ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। যারা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ট্রাম্পের কথায় বিস্মিত হয়েছেন, নির্বাচনোত্তর ট্রাম্পের ভাষণেও ট্রাম্প সবাইকে বিস্মিত করেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কথায় ও আচরণে সংযত আচরণ দেখিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবাইকে নিয়ে দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন। হিলারির প্রতি ট্রাম্প শ্রদ্ধা ও সম্মানসূচক কথা বলেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্পকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, ভোটে জেতার পরও তাকে আমেরিকান সমাজের সেই অংশের আস্থা অর্জন করতে হবে, যে অংশটি যুক্তরাষ্ট্রকে উদার গণতান্ত্রিক, আইনের শাসনভিত্তিক ও সার্বিক অর্থে বহুত্ববাদী সমাজ বিবেচনা করে। ধর্ম, বর্ণ, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্বিশেষে সব আমেরিকান নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে ব্যবহার করা সংকীর্ণ উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগানগুলোর কথা ভুলে যেতে হবে। যে অভিবাসী নাগরিকদের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জাগিয়ে তিনি নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন, এখন তাকে তাদেরও প্রেসিডেন্ট হতে হবে, সেসব উদ্বেগ দূর করার মধ্য দিয়েই তিনি আমেরিকার সবার প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠতে পারেন।
বিশ্বব্যাপী আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। এখন আমেরিকার মূল কাণ্ডারি হিসেবে ট্রাম্পকে আমেরিকার বিদেশনীতি নিয়ে ভাবতে হবে। বলা হয়ে থাকে যে, আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট যান-আসেন, কিন্তু নীতি বদলায় না। বিশেষত, বিদেশনীতির বদল ঘটে কমই। ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়েও হয়তো তাই বহাল থাকবে। আমাদের জানা যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজা-বাদশা বা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো একক ও অলঙ্ঘনীয় ক্ষমতা নেই, যা তিনি যা ইচ্ছে পোষণ করবেন, তাই করতে পারেন। যদিও ট্রাম্পের মতের পক্ষে সায় দেওয়ার জন্য আমেরিকার সিনেটে তার প্রাধান্য রয়েছে। তবে আশার কথা যে, আমেরিকার পার্লামেন্ট বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো প্রশাসনের অন্ধ অনুগত নয়। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (আমেরিকাকে আবার মহান করুন) বলে ট্রাম্পের যে নির্বাচনী স্লোগান ছিল, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে হয়তো অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমেরিকার স্বার্থকে আরো বড় করে দেখার মধ্য দিয়ে।
ট্রাম্পের বিজয়ে অনেক মানুষের মূল্যবোধে আঘাত লেগেছে সত্য। ট্রাম্পের কথাবার্তায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সৌজন্যতার অভাব ছিল। তার আচরণে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, অপমানিত বোধ করেছেন। এখন নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সেসব ভুলিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ট্রাম্পেরই। ট্রাম্পের বিজয় ভাষণে পরিবর্তিত ট্রাম্প হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। ‘দায়িত্ব’ যে ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল ও সংযত হতে বাধ্য করে, তার অনেক উদাহরণ আছে। ভারতে ক্ষমতায় গেলে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে রামমন্দির করবেন বলে বিজেপির নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতার অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি সেখান থেকে সরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সকল ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’ আবার বিগত সময়ে হিন্দু উগ্রবাদী হিসেবে পরিচিত নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে যারা ভেবেছিলেন, ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হবে, তা এরই মধ্যে ভুল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। মোদির শাসনকাল বরং প্রশংসিত হচ্ছে।
তাই বলা যায়, বৈশ্বিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা অনেক। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে যেসব যুদ্ধ ও সহিংসতা চলছে, তা অবসানে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে মিলে গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া, বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপরাপর রাষ্ট্রের চলমান সহযোগিতার সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসন আরো এগিয়ে নেবেন—এমন প্রত্যাশা করা অনুচিত নয়।
লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক
(এনটিভি থেকে)

আরও পড়ুন