বন্ধ হোক রোহিঙ্গা হত্যা

আপডেট: 02:43:58 11/09/2017



img

কবীর মামুন

গত আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে চলছে রক্ত-উৎসব। রচনা হয়েছে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আরাকানের রোহিঙ্গাদের উপর চালাচ্ছে নারকীয় গণহত্যা। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো। হত্যা করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে মানুষ। আসছে বাংলাদেশে। কেউ কেউ আবার মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ায় যাচ্ছে। তবে বেশিরভাগ অংশ আসছে বাংলাদেশেই। প্রবেশ করছে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে। এখনো পর্যন্ত কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে তার সঠিক হিসাব মেলেনি। বহু রোহিঙ্গা নারী ও শিশুর লাশ নাফ নদী ও সমুদ্র উপকূলে ভেসে উঠছে। আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি তার কিছু চিত্র। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ যেসব ত্রাণ শিবির খুলেছিল সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। কয়েকদিনে বাংলাদেশে ঢুকেছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। আর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নো-ম্যানসল্যান্ডে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে। মানুষগুলো আক্রান্ত, ক্ষুধার্ত। কোন সম্বল হাতে নিয়ে আসবার সুযোগও তাদের ছিল না। অনেকেই অসুস্থ, আর এই অবস্থাতেই তারা রয়েছে খোলা আকাশের নীচে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের হাতে যে ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, অত্যাচার, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন সেটা এক মানবিক ট্র্যাজেডি। একে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কী বলে আখ্যায়িত করা যায়?
এবার আমরা একটু দেখি রোহিঙ্গা আসলে কারা? উইকিপিডিয়া বলছে, রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। তাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মিয়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং, মংডু, কিয়কতাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা, কাইউকপাইউ, পুন্যাগুন ও পাউকতাউ এলাকায় এদের নিরঙ্কুশ বাস। এছাড়া মিনবিয়া, মাইবন ও আন এলাকায় মিশ্রভাবে বসবাস করে থাকে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী। বর্তমান মিয়ানমারের "রোসাং" এর অপভ্রংশ "রোহাং" (আরাকানের মধ্যযুগীয় নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। আরাকানের প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ। রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা "কুরুখ" (Kurukh) নৃ-গোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে, ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু, পরবর্তীতে যাদের অনেকেই ধর্মান্তরিত মুসলিম, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এ সকল নৃ-গোষ্ঠীর শংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা। বস্তুত রোহিঙ্গারা হল আরাকানের বা রাখাইনের একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করেন। ঔপনিবেশিককালে এ ভূখণ্ডটি চলে আসে ব্রিটিশদের দখলে। তখন তারা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া, হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। ধর্মীয় সম্প্রদায়গত হিসাবে রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তবে সনাতন হিন্দু ধর্মের অনুসারী রয়েছে অনেকেই।
নিপীড়ন সইতে না পেরে প্রতি বছরই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে অবৈধভাবে। ২৫ আগস্টের ঘটনা শুরুর আগেই বাংলাদেশে পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল, যাদের মধ্যে বড় একটা অংশ রেজিস্টার্ড নয়। এই দফায় এখনও পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আরো অনেকে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশে ঢুকবার জন্য। নিঃসন্দেহে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা এবং নারী ও শিশুর প্রতি আক্রমণ একটি বড় মানবিক বিপর্যয়। মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী অং সাং সুচি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হয়েও এমন একটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞে তার নীরব ভূমিকা কিংবা ইন্ধন দেওয়া পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
এই শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা আর ফিরবে কি না মিয়ানমারে তা এখনো অনিশ্চিত। শরণার্থী শিবিরের জন্য প্রচুর খাদ্য, চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন, প্রয়োজন তাদের থাকবার, ঘুমাবার বন্দোবস্ত, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনসহ আরো হাজারো রকমের প্রয়োজন সেখানে রয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশে ১০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। এরই মধ্যে এই চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এবং মানবিক সংগঠনগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো কূটনৈতিক। আন্তর্জাতিকভাবে সঠিক কূটনীতি পরিচালনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরবার ব্যবস্থা করা। এখানে মিয়ানমারকে পথ ছেড়ে দেবার কোন সুযোগ নেই। রোহিঙ্গাদেরকে তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম। পরাজিত পাকিস্তান বাহিনী ফেরত গেছে কিন্তু সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আজও আমরা বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে পারিনি। তাদের বোঝা বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এমন পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও কাম্য নয়। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির। আমেরিকার হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে সংঘর্ষ বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা। দেশে দেশে মুসলিম জঙ্গি তৈরির মাধ্যমে যে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হচ্ছে তার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারা। গৃহহীন মানুষের হিংস্র হয়ে উঠতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। সেই চ্যালেঞ্জকে অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে।
নানান টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। মানবিকতার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব নেতৃত্বেরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের সেখানে ফেরত পাঠানোর। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কারণ ফোঁড়া যার ব্যাথা তাকেই অনুভব করতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের আজীবনের দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশ পারবে না আর সেটা সম্ভবও নয়। মিয়ানমারের সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন। বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষদেরকে দাঁড়াতে হবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে। তুলতে হবে আওয়াজ। আমরা যুদ্ধ চাই না। বিশ্বব্যাপী শান্তি চাই। পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে মানুষ নামক হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির বিলুপ্তি ঠেকাতে হবে। অবশ্যই বন্ধ করতে হবে রোহিঙ্গা হত্যা এবং বন্ধ করতে হবে পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষ হত্যা। মানুষের পৃথিবী যুদ্ধবাজের হতে দেওয়া যাবে না। এই স্লোগানে জেগে উঠুক বিশ্বের সচেতন মানুষ, মানবতাবাদী মানুষ।

লেখক : মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন