বাংলাদেশ-ভারত পানি-বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন

আপডেট: 02:58:56 09/08/2017



img

নাবাত তাসনিমা মাহবুব

প্রাচীন রোমান আইনে নদীকে বলা হতো Res Extra Patrimonium যার অর্থ হলো সকলের সীমাহীন ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত সম্পদ। বর্তমান বিশ্বে, যেখানে যৌথ পানি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধ একটি অতি সাধারণ বিষয়, সেখানে প্রাচীন রোমান আইনের এই ধারণাটি ধীরে ধীরে তাৎপর্য হারাচ্ছে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ ও তার আইনগত দিকগুলো তুলে ধরা। কিন্তু মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে পানিসম্পদ বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন; যা আমাদের আলোচনার তাৎপর্য অনুধাবনে সহায়ক হবে। পৃথিবীর সমগ্র জলরাশির কেবলমাত্র আড়াই শতাংশ পানি হলো সুপেয় বা fresh water। এই আড়াই শতাংশ সুপেয় পানির, ৭০ শতাংশ আবার সঞ্চিত আছে পর্বতের চূড়ায় বরফ ও হিমবাহ আকারে। বাকি ত্রিশ শতাংশ পানির অবস্থান নদীনালা (যাকে Surface Water বলা হয়) এবং ভূ-গর্ভস্থ উৎসে। সুতরাং পানি প্রকৃতির অফুরন্ত সম্পদ হলেও ব্যবহারযোগ্য সুপেয় পানির উপস্থিতি প্রকৃতিতে অফুরন্ত নয়। উপরন্তু দূষণ ও অন্যান্য ব্যবহার দরুণ সীমিত পরিমান সুপেয় পানিও তার ব্যবহারযোগ্যতা হারাচ্ছে।
বর্তমানে পৃথিবীর এক বিলিয়নের বেশি জনগোষ্ঠী সুপেয় পানি ও ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আশংকা করা হচ্ছে ২০২৫ সাল নাগাদ সারা বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়বে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাজেলদিন অদূর ভবিষতের পৃথিবীর এই পানি সংকটের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তাই যথার্থই মন্তব্য করেছেন,“আগামী শতকের বিশ্বযুদ্ধ হবে পানির ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে”।
আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন ও ভাগাভাগি নিয়ে দেশে দেশে যে বিরোধ বিদ্যমান তার মধ্যে অন্যতম হলো ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নদী পানিবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ। আন্তর্জাতিক পানি আইন ও এ সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে যতগুলো আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা হয়েছে তার প্রায় অনেকগুলোতেই গঙ্গার পানি নিয়ে বিরোধের প্রসঙ্গটি বারবার আলোচিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে এই দুই দেশের মধ্যকার পানিবণ্টনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টি ও মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে।
গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের আগে ভারত কর্তৃক ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৫১ সালে প্রথমবারের মতো পাকিস্তান সরকার ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের ভারতীয় সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত পাকিস্তান, বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থপরিপন্থী হতে পারে– এই মর্মে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে আপত্তি জানানো হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৭০ এই প্রায় দুই দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও তথ্যের আদান প্রদান ঘটলেও কার্যকর কোনো সমাধানে তারা পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৭০ সাল নাগাদ ফারাক্কা ব্যারেজের নির্মাণকাজ শেষ হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের মধ্যে আবার এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং ১৯৭৫ এর এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে ফারাক্কা ব্যারেজ সাময়িকভাবে চালু করার ব্যাপারে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা ব্যারেজের কার্যক্রম সাময়িকভাবে এক মাস দশ দিনের (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে ১৯৭৫) জন্য চালু করার কথা ছিল। ওই একই চুক্তি মোতাবেক সাময়িক কার্যক্রম শেষে ব্যারেজের পরবর্তী কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু অন্তরবর্তীকালীন এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ভারতের এই একতরফা সিদ্ধান্ত ছিল দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও পরিবেশের উপর ফারাক্কা ব্যারেজের সর্বনাশা প্রভাব মোটামুটি সর্বজনবিদিত। দীর্ঘ দুই দশকের আলোচনায় সাফল্য ও ব্যর্থতার চড়াই–উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন সংক্রান্ত একটি ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি সম্পাদন করে। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তিকে তাদের একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য বিবেচনা করলেও আইনগত বিচারে চুক্তিটির নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো হলো :
* ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পূর্বে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পদ্মার যে পানিপ্রবাহ ছিল, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য পানির হিস্যা তা থেকে অন্তত ৫০ শতাংশ কম;
* ফারাক্কায় পানি প্রবাহ বেশি মাত্রায় কমে গেলে বাংলাদেশ ন্যূনতম কত শতাংশ পানি পাবে – সে সংক্রান্ত গ্যারান্টি ক্লজ চুক্তিটিতে নেই;
* দুই পক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধের সূচনা হলে তার মীমাংসা কীভাবে হবে – সে সংক্রান্ত কোন দিক-নির্দেশনা বা আরবিট্রেশন ক্লজ চুক্তিটিতে নেই;
* চুক্তির পালন বা বাস্তবায়নে যৌথ নদী কমিশনকে কোনো কার্যকর ভূমিকা বা ক্ষমতা দেওয়া হয়নি;
* চুক্তিটিতে শুধুমাত্র পানির প্রবাহ বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশগত বিবেচনায় প্রবাহের পাশাপাশি পানির গুণাগুণ এবং ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ, যার কোনো প্রতিফলন ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে নেই।
১৯৯৬ সালের ফারাক্কা চুক্তির আঠারো বছর অতিবাহিত হলেও ওই সীমাবদ্ধতাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনো পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা ছিল তা পাওয়া যায়নি। পানির হিস্যা চুক্তি অনুযায়ী বন্টিত হচ্ছে কিনা – তা নিয়ে এখনো দুই দেশের অবস্থান অভিন্ন নয়। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯ এর মাধ্যমে চুক্তির উভয় পক্ষ তথা বাংলাদেশ ও ভারত সম্মত হয় যে, দুই দেশের ভেতর দিয়ে প্রবহমান অন্যান্য যৌথ নদীগুলোর পানিবণ্টন ও ব্যবহার দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই হবে এবং এক্ষেত্রে তারা সমতা, ন্যায়পরায়ণতা ও একে অপরের ক্ষতি সাধন না করার নীতি দ্বারা পরিচালিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক ফারাক্কা বাঁধের অপূরণীয় ক্ষতি সামলে উঠার আগেই বাংলাদেশ এখন মুখোমুখি হছে টিপাইমুখ বাঁধ, আন্তঃনদীসংযোগ প্রকল্প, ৫৩টি অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা এবং গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচিত তিস্তা নদীর ব্যবহার নিয়ে ভারতের একচ্ছত্র ও একতরফা পরিকল্পনা; যা কিনা ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির অনুছেদ ৯ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
যৌথ ও অভিন্ন নদীর ব্যবহার ও বণ্টন বিষয়ক যে আন্তর্জাতিক আইনগুলো রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আইন হলো– ১৯৯৭ সালের Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses, ১৯৯২ সালের Convention on the Protection and Use of Transboundary Watercourses and International Lakes, ১৯৯৬ সালের Helsinki Rules on the Uses of the Water Pollution in an International Drainage Basin এবং ১৯৮৬ সালের Rules on International Ground water। এছাড়া আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে আরও বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিগুলোতে যৌথ ও অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহার ও বন্টনের কিছু সর্বজনস্বীকৃত নীতি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এই নীতিগুলো হলো Principle of Equitable Utilization বা ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নদী ব্যবহারের অধিকার, Principle of No Significant Harm বা নদীর পানিকে এমনভাবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা যাতে করে অন্য রাষ্ট্রের পানি ব্যবহারের অধিকার বা সেখানকার পরিবেশ মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, Obligation of Prior Notification, Consultation and Exchange of Information অর্থাৎ যৌথ ও অভিন্ন নদীকেন্দ্রিক কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হলে তার সম্পর্কে অপর রাষ্ট্রকে অবহিত করা, তথ্য আদান– প্রদান করা এবং অপর রাষ্ট্রের ঐ বিষয়ে কোন আপত্তি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার দায়িত্ব ইত্যাদি। ১৯৯৭ সালের Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses এর অনুচ্ছেদ ৫, ৭, ১২, ১৩, ৩(৫), ৬(২), ৭(২) এবং ১৭ তে উপরিউক্ত নীতিগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালের কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী নদীর পানিপ্রবাহ যে দেশগুলো উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেসব দেশ স্ব স্ব ভৌগলিক সীমানার ভেতর ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নদীর পানিপ্রবাহকে ব্যবহার করবে (Reasonable and Equitable Utilization of International Watercourses)। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক নদী যে দেশগুলোর উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সে দেশগুলো স্ব স্ব ভূ–খন্ডের ভেতর নদীকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবে না – যাতে ঐ নদী ভাগাভাগি করে নেয়ায় অন্যান্য দেশ মারাত্মক ক্ষতি বা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। অনুচ্ছেদ ৭ এ অনুরূপ ক্ষতির বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের জন্য ক্ষতিপূরণ বিধ্না রাখা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১২ এবং ১৩ এর অধীনে আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রবাহ নিয়ে কোন দেশ কোন পরিকল্পনা বা প্রকল্প গ্রহন (যেমন– বাঁধ নির্মাণ নদীর গতিপথ পরিবর্তন ইত্যাদি) করলে তার সম্পর্কে অপর দেশগুলোকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। এ ধরণের কোন প্রকল্প শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিরুপণ করবে এবং সে সংক্রান্ত তথ্য ও প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহারকারী অন্যান্য দেশের সংগে আদান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আলোচনার মাধ্যমে নদীর ব্যবহার বিষয়ক যেকোন সমস্যা বা আপত্তির সুরাহা করবে যা কিনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১৭ তে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহমান অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবহার নিয়ে ভারতের বিভিন্ন আগ্রাসী পদক্ষেপ ১৯৯৭ সালের কনভেনের একাধিক অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন তথা আর্ন্তজাতিক আইনের লঙ্ঘন।
টিপাইমুখ বাঁধ প্রসংগে প্রাক্তন ভারতীয় হাই কমিশনার জনাব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বক্তব্য দিয়েছিলেন যে, আর্ন্তজাতিক আইনে এমন কোন বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই যা ভারতকে উক্ত বাঁধ নির্মাণ থেকে নিরস্ত করতে পারে। তার এই বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি ছিল এই যে, ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি এখনো আইনগত বাধ্যবাধকতা (Entry into Force) অর্জন করেনি। আন্তর্জাতিক আইনের একটি সাধারণ নীতি হলো কোন কনভেনশন বা চুক্তিকে আইনগত বাধ্যবাধকতা অর্জন করতে হলে, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক রাষ্ট্রকে উক্ত চুক্তি অনুস্বাক্ষর (Ratification) করতে হবে, অন্যথায় ওই চুক্তি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হবেনা। এছাড়াও কোন দেশ যদি কোন চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর না করে তবে সেই চুক্তির আইনগত দায়দায়িত্ব ঐ দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে না। ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য ৩৫টি দেশের অনুস্বাক্ষর প্রয়োজন যা এখনও অর্জিত হয়নি। ভারত বা বাংলাদেশ কোন পক্ষই কনভেনশনটি এখনও অনুস্বাক্ষর করেনি। জাতিসংঘে কনভেনশনটি গ্রহনের সময় বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও ভারত বিরত থেকেছে। সুতরাং প্রাক্তন হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বক্তব্য এক অর্থে সঠিক। কিন্তু আইনবিজ্ঞানের বিবেচনায় এই বক্তব্যটি ত্রুটিপ্র্ণূ।
আন্তর্জাতিক আইনের অঙ্গনে আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রসমূহ যে সকল নিয়ম নীতি অনুসরণ করে এসেছে বা যে সকল নীতিমালাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সে সকল নিয়ম নীতি একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের রূপ দেয়ার প্রচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে নেয়া হয়েছে। এই সকল প্রচেষ্টার মধ্যে International Law Commission বা ILC’র পদক্ষেপটি সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ, কেননা ILC’র তৈরি করা খসড়া আইনটিই পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের কনভেনশন এ পরিণত হয়েছে। আইনটির খসড়া প্রণয়নের সময় ওখঈ সেই সকল নিয়ম নীতি বা বিধানগুলোকেই তুলে এনেছে, যেগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের পূনঃপূন অনুসরণের দরুণ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন বা Customary International Law বলতে আন্তর্জাতিক আইনের সেই সব বিধি বিধানকে বোঝায় যেগুলোকে রাষ্ট্রসমূহ তাদের কর্মকান্ড, বক্তব্য এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে।
১৯৯৭ সালের যে অনুচ্ছেদ বা বিধানগুলো নিয়ে এর আগে আলোচনা করা হয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই Customary International Law বা প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা লাভ করেছে। সুতরাং ১৯৯৭ সালের কনভেশনটি ভারত অনুস্বাক্ষর না করলেও কনভেনশনে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের যে দায় দায়িত্বগুলোকে স্থান দেওয়া হয়েছে সেগুলো ভারতের জন্যও প্রযোজ্য। আগেই বলেছি প্রয়োজনীয় সংখ্যক অনুস্বাক্ষর অর্জন করতে না পারার কারণে ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি এখনো বাধ্যতামূলক আইনের মর্যাদা পায়নি। এক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, যে কনভেনশনটি এখনও আইনগত বাধ্যবাধকতা অর্জন করেনি কিংবা যে কনভেনশনটি ভারত অনুস্বাক্ষর করেনি সেই কনভেনশনের কিছু বিধান বা দায়দায়িত্ব ভারতের জন্য প্রযোজ্য হয় কি করে? দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ অনুস্বাক্ষর না করলেও কনভেনশনের বিধানগুলো (যেগুলো প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন হিসাবেও স্বীকৃত) ভারতের জন্য কেন প্রযোজ্য, সে প্রশ্নের উত্তর আগেই দিয়েছি। আইনগত বাধ্যবাধকতা অর্জন না করা সত্ত্বেও কনভেনশনটির কিছু বিধান কেন ভারতের জন্য প্রযোজ্য, এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য পানি আইন বিশেষজ্ঞ তানজি এবং আরকারি তাঁদের The United Nations Convention on the Law of International Watercourses: A Framework for Sharing গ্রন্থে যে যুক্তিটি দিয়েছেন তা তুলে ধরছি–
“Where there is coincidence between a particular provision of the Convention and a customary rule, the normative role under review would also be fulfilled vis-à-vis states that are not parties to the convention and irrespective of its entry into force”, অর্থাৎ যখন একটি কনভেনশনের কোন বিধানের সঙ্গে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের কোন বিধানের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, তখন ঐ কনভেনশনটি আইনগত বাধ্যবাধকতা অর্জন না করলেও কিংবা কোন দেশ কনভেনশটির পক্ষরাষ্ট্র (State Party) না হলেও কনভেনশনের উক্ত বিধানটি পক্ষরাষ্ট্র নয় এমন দেশের জন্যও প্রযোজ্য হবে। অতএব ১৯৯৭ সালের কনভেনশনের কিছু বিধান (যা ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছ) যেমন Equitable Utilization, No significant harm, arbitration, prior notification, consultation and exchange of information ইত্যাদি ভারতের জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে ভারতের কনভেনশনটি অনুস্বাক্ষর না করা বা কনভেনশনটির আইনগত অবস্থানের বিষয়টি ভারতের দায়দায়িত্ব এড়ানোর ক্ষেত্রে খুব একটা সহায়ক হবে না। আন্তর্জাতিক আইন যে এ বিষয়ে পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে তা আরও পরিস্কার করে বোঝানোর জন্য কিছু মামলার সিদ্ধান্ত এখানে তুলে ধরছিঃ
Lac Lanoux Arbitration (১৯৫৭) মামলায় ফ্রান্স লেক লেন্যু হ্রদের পানিপ্রবাহ পরিবর্তন করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলে স্পেন বিষয়টি আরবিট্রেশন ট্রাইবুনালে উত্থাপন করে। আরবিট্রেশন ট্রাইবুনাল তার সিদ্ধান্তে জানায়, একটি দেশ তার নিজস্ব ভূ–খন্ডের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানিপ্রবাহ ততক্ষন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে বা ব্যবহার করার অধিকার পাবে যতক্ষন পর্যন্ত তা অন্যদেশের ক্ষতিসাধন না করে। ট্রাইবুনাল আরও মত দেয় যে, উজানের দেশ নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ভাটির দেশের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারবে না এমন বিধানের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক আইনে আছে।
দানিউব নদীর ব্যবহার নিয়ে হাঙ্গেরী ও চেকোস্লোভাকিয়ার মধ্যে উদ্ভূত Gabcikovo-Nagymaros (১৯৯৭) মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত (International Court of Justice) সিদ্ধান্ত দেয় যে, চেকোস্লোভাকিয়া দানিউব নদীর পানির উপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে হাঙ্গেরীকে পানি ব্যবহারের যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে যা আন্তর্জাতিক আইনে সমর্থনযোগ্য নয়। এছাড়াও জার্মান প্রদেশ উরটেমবার্গ, প্রুশিয়া এবং ব্যাডেন এর মধ্যকার Donauversinkung (১৯২৭) মামলায় জার্মান আদালত মতামত দেয়, একটি আন্তর্জাতিক নদী যে সমস্ত দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেসব দেশের ঐ নদীর পানি ব্যবহার করার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে তবে তা অবশ্যই অন্য দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষুন্ন না করে। সুতরাং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীর পানি ব্যবহার ও ন্যায্য হিস্যা নিয়ে যে বিরোধ সেখানে আন্তর্জাতিক আইনের দুটি গুরুত্বপুর্ণ উত্স ‘প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন’ ও ‘আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত’ দুটোই বাংলাদেশের অধিকারের স্বপক্ষে আছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার যৌথ নদীগুলো নিয়ে ভারতের একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন সময় দাবী উঠেছে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ফোরাম অথবা আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইবুনালে নিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশ ফারাক্কা ইস্যুটি নিয়ে জাতিসংঘের মত বৃহৎ ফোরামে গিয়েছে এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থানের স্বপক্ষে প্রস্থাবনাও গৃহীত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে পানি বিরোধের বিষয়টিকে বরাবরই দ্বিপাক্ষিক সমস্যা বলে চালিয়ে এসেছে এবং দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধানের কথা বলেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশ ভারতের সাথে কার্যকর কোন সমাধানে আসতে পারেনি। তাই সময় এসেছে বিষয়টিকে আরেকবার আন্তর্জাতিক ফোরামে নিয়ে যাওয়ার। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালত বা আরবিট্রেশন ট্রাইবুনাল হতে পারতো সবচেয়ে কার্যকরী ফোরাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোন বিষয়ে দুটি দেশের মধ্যকার বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালত অথবা আরবিট্রেশন ট্রাইবুনালের মাধ্যমে মীমাংসা করতে হলে বিরোধে জড়িত দুই দেশেরই সম্মতির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের জন্য ভারতের সম্মতি অর্জন যে এক্ষেত্রে অত্যন্ত দূরুহ কাজ হবে তা বলাই বাহুল্য। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন শুধু অপেক্ষা কনভেনশনটি প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাষ্ট্র কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত হওয়ার। ১৯৯৭ সালের কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩৬ অনুযায়ী কনভেনশনটি পক্ষ রাষ্ট্রদের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য ৩৫টি দেশের অনুস্বাক্ষর প্রয়োজন। বর্তমানে কনভেনশনটি অনুস্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ৩৪টি, অর্থাৎ আর একটি মাত্র দেশ কনভেনশনটি অনুস্বাক্ষর করলেই এটি পক্ষরাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণকারী একটি আইনে পরিনত হবে। বাংলাদেশ কি ৩৫তম অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হয়ে দেশের মানুষের জীবন–জীবিকা এবং পরিবেশ রক্ষার জরুরী পদক্ষেপটি নেবে?
[আমাদের বুধবার থেকে]