বাজেটে শিক্ষার মান উন্নয়নে বরাদ্দ প্রয়োজন

আপডেট: 02:17:24 08/06/2018



img

মামুন কবীর

৭ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার ঘোষিত হয়েছে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেট। সরকারের শেষ বছর যে বাজেট ঘোষণা করা হলো তাতে নতুনত্ব কিছু নাই যা দিয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। তবে মন্ত্রী এমপিদের হাত দিয়ে তাদের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছে টাকা পৌঁছানো যায় এমন অনেক সুযোগই এখানে রয়েছে। ফলে এটাকে সরকারের নির্বাচনী বাজেটও বলা যায় এক অর্থে। আবার একে জনতুষ্টির বাজেট বললেও ভুল হবে না। কারণ এই বাজেটের মধ্যে দিয়ে সরকার জনগণকে তুষ্ট করে আবার ক্ষমতায় যেতে চায়। বাজেটটাকে একটু উল্টে-পাল্টে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বিশেষ করে শিক্ষা খাতের দিকে যদি আমরা তাকাই তবে দেখতে পাই এখানে শিক্ষার মান উন্নয়নের চেয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের জন্য ৫৩ হাজার ৫৪ কোটা টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে; যা খাতওয়ারি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। তবে এখানে অবকাঠামো খাতের উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে টাকার অঙ্কে মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীনে ২৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের (ছাত্র-ছাত্রী) জন্য পৃথক ওয়াশব্লকসহ ৭ হাজার বিদ্যালয় নির্মাণ, ৬৫ হাজার শ্রেণিকক্ষ, ১০ হাজার ৫০০টি শিক্ষককক্ষ, ৫ হাজার বিদ্যালয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে। এর পাশাপাশি এক হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। শিক্ষাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। যেমন সব ইউনিয়নও কয়েকটি শহরে আইসিটিভিত্তিক কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৬৪ জেলায় ৬৪টি জীবিকায়নও জীবনব্যাপী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। ‘সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’ প্রকল্প কিংবা ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন’ প্রকল্পের মধ্যেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়গুলোই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের আওতায় মাল্টিমিডিয়াসহ শ্রেণিকক্ষ, ভাষা কাম আইসিটি ল্যাব, হোস্টেল নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় আসবাব ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। এছাড়া মহাবিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ ২৬ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪৬ হাজার ৩৪০টি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও ২ হাজার ১২০টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চারটি বিভাগীয় শহরে চারটি মহিলা পলিটেকনিক, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে বালিকা কারিগরি বিদ্যালয়, ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং সব বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খুবই ভালো কথা। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যেতে হবে আমাদেরও। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাও হতে হবে ডিজিটাল। তবে বাজেটে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পগুলোর প্রায় সবই প্রকিউরমেন্টের সাথে সম্পর্কিত। ফলে এর হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়ে যাবে যার অধিকাংশই যাবে সরকারদলের সমর্থক ঠিকাদারদের হাতে। আবার সেই টাকা তারা নির্বাচনে ব্যয় করবে, ভোট কিনবে। ফলে মাছের তেলে ভাজা হয়ে যাবে মাছ। শিক্ষার মান উন্নয়নের কাজ খুব বেশি আগাবে বলে মনে হয় না। ছেলে-মেয়েরা যেটুকু এগিয়ে যাচ্ছে তা নিজেদের চেষ্টাতে।
অর্থনীতিতে অনেক গল্প চালু আছে। তার মধ্যে একটি এখানে উদ্ধৃত করা যায়। গল্পটি হলো, “দুইঅর্থনীতিবিদ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন সিনিয়র আর অন্যজন জুনিয়র। তারা হঠাৎ রাস্তায় দেখেন কিছু গোবর পড়ে আছে। সেটা দেখে সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জুনিয়রকে বললেন, 'তুমি যদি এখান থেকে একটু গোবর নিয়ে খেতে পারো, তবে তোমাকে বিশ হাজার ডলার দেবো।' জুনিয়র তাই শুনে একটু গোবর তুলে খেয়ে নিলেন। তখন সিনিয়র অর্থনীতিবিদ তার জুনিয়রকে বিশ হাজার ডলার দিয়ে দিলেন। তারপর তারা চলছেন আর গল্প করছেন। যেতে যেতে তারা দেখলেন আরো কিছু গোবর পড়ে আছে। এবার জুনিয়র তার সিনিয়রকে বললেন, 'স্যার, আপনি যদি এখান থেকে একটু গোবর খেতে পারেন তবে আপনাকেও বিশ হাজার ডলার দেবো।' তাই শুনে টাকা তুলে নেওয়ার জন্য সিনিয়র অর্থনীতিবিদও একটু গোবর খেয়ে ফেললেন। তখন জুনিয়র অর্থনীতিবিদ তার সিনিয়রকে বললেন, ,স্যার, ঘটনা যা ঘটল তা হলো আপনার টাকা আপনারই থাকলো, শুধু আমাদের গোবর খাওয়াই সার হলো।' তখন সিনিয়র অর্থনীতিবিদ বললেন, 'ব্যাপারটা তুমি বোঝনি। এখানে বিশ বিশ করে চল্লিশ হাজার ডলারের লেনদেন হয়ে গেল। অর্থনীতির চাকা ঘুরলো। অর্থনীতি এগিয়ে গেল সামনের দিকে।'
এই গল্প থেকে বুঝা যায় আসলে অর্থনীতির দশা কী। টাকা যেখান থেকে আসলো সেখানেই ফেরত গেলো আর মাঝখান থেকে জনগণ হলো বলির পাঠা ঠিক যেমন অর্থনীতিবিদরা গোবর খেলেন। আমাদের অর্থনীতি, উন্নয়ন আর বাজেটের দিকে তাকালেও এর ব্যত্যয় দেখা যাবে বলে মনে হয় না।
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাতে আমাদের নীতি নির্ধারকরা ব্যাপক এক্সপেরিমেন্ট চালান। তারা এই এক্সপেরিমেন্ট চালাতে গিয়ে শিক্ষার যা সর্বনাশ করার তা করে ফেলেছেন। এখন শুধু জিপিএ ৫ প্রোডিউস হয়। মাঝে মধ্যেই শিক্ষাবিদদের আলোচনা শুনি যে, এই জিপিএ ৫ শুধু নামের, কাজের নয়। শিক্ষার উন্নয়ন প্রয়োজন। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন প্রডিউস হচ্ছে সার্টিফিকেট। সেভাবে হচ্ছে না গবেষণার কাজ। ফলে গবেষণার জন্য শিক্ষকদের যেতে হচ্ছে অন্য দেশে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে মানহীন পড়ালেখা; যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকার খবরে জানা যায়। মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফল হিসাবে জুনিয়র সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে চাকরির সকল পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁসের খবর আসছে। মানহীন ডিগ্রিধারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে চাইবে- এটাই তো স্বাভাবিক। সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নে এই বাজেটে তেমন কোনো পরিকল্পনাও দেখাতে পারেনি। শুধুই অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। মানহীন সার্টিফিকেটধারী এই জাতি দেশের উন্নয়নে, পরিবর্তনে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে তা আমাদের ভাবতে হবে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এসে এখন আমাদেরকে শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে অনেক বেশি। শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা নির্বাচনে ভোট কেনার বাজেট এখানে কাম্য নয়। নিম্ন মধ্য থেকে মধ্য, মধ্য থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করতে হবে বাংলাদেশে। সেই বাংলাদেশে থাকবে মানবিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে মানুষের অধিকার সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেবে সরকার। আর এর জন্য শিক্ষার মান উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন বেশি বেশি। বরাদ্দ বাড়াতে হবে গবেষণা খাতে। বরাদ্দ বাড়াতে হবে শিক্ষকদের পাঠদানের মান উন্নয়নে। বরাদ্দ বাড়াতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ একীভূতকরণে। একই রাষ্ট্রে শ্রেণি অনুযায়ী ভিন্নভিন্ন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ সমানভাবে ঘটানো যাচ্ছে না। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করে পাঠক্রম সাজাতে হবে। পাঠ্যসূচি তৈরিতে নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকবার চিন্তায় কোনো গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করে ভবিষ্যত বাংলাদেশের কথা ভেবে এ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশীয় সম্পদ দেশে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দের কথা ভাবতে হবে। সামরিক শিক্ষায় বরাদ্দের চেয়ে বেসামরিক, মানবিক ও বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে এখাতের বরাদ্দগুলো নির্ধারণ করতে হবে।অবকাঠামোগত উন্নয়ন একেবারে যে প্রয়োজন নাই- তা বলছি না। সেটা সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসাবেই আসবে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা যদি মানুষ তৈরিতে, দেশপ্রেমিক তৈরিতে, মেধাবী তৈরিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে না পারে, তবে দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হলেও মানবিক উন্নয়ন সূচক পেছনের দিকে ধাবিত হবে আর ব্যাহত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গঠন।
লেখক : মানবাধিকার কর্মী