বারট্রান্ড রাসেল : এক নতুন চিন্তার নাম

আপডেট: 09:37:39 01/07/2017



img

মিলন আশরাফ

বারট্রান্ড রাসেল। আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মধ্যে অন্যতম। রাসেল জন্মগ্রহণ করেন ইংল্যান্ডের লর্ড পরিবারে ১৮ মে, ১৮৭২। তাঁর বয়স যখন চার, তখনই রাসেলের মা ও বাবা দুজনেরই মৃত্যু হয়। তিনি ও তাঁর দাদা ঠাকুরমার কাছে মানুষ হয়েছেন।
খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে নানারকম প্রশ্নের উদয় হতো, কিন্তু সেগুলোর জবাব কেউ যুতসইভাবে দিতে পারতো না। ধীরে ধীরে জীবন সম্পর্কে কেমন একটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছিলেন তিনি। সবকিছু সম্পর্কে নিশ্চিত হবার আকাঙ্ক্ষায় তিনি বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মিশে সত্যকার স্বরূপ যাচাই করতে চাইতেন। অল্প বয়সে মা-বাবা মারা যাওয়ায় পৈত্রিক বাড়ি ত্যাগ করে অন্য বাড়িতে যেতে হয়েছিল তাঁদের।
গণিতশাস্ত্রের মধ্যে রাসেল সর্বপ্রথম দেখতে পান একটা নিশ্চিত তত্ত্বের। পরবর্তী জীবনে এসে তিনি বলেছিলেন যে, ‘গণিতের প্রতি মন আকৃষ্ট না হলে কিশোর বয়সে আমাকে আত্মহত্যা করতে হতো।’ অথচ প্রথম জীবনে নামতা মুখস্ত করতে বসে রাসেল কেঁদেছিলেন। জ্যামিতির উপপাদ্যগুলো তাঁর মোটেই সুবিধার মনে হতো না। ছেলেবেলা কেটেছে রাসেলের একেবারে সঙ্গী ছাড়া। তাঁর ধারণা এই নিঃসঙ্গতাই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ সহজ করেছে। তিনি বলতেন, ‘শৈশবে যারা অভিভাবকের অত্যধিক আদর ও অনেক সঙ্গী পরিবৃত হয়ে দিন কাটায় তাদের বুদ্ধির পরিণতি লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে।’ মনের বিকাশের জন্য একা থাকা প্রয়োজন। সেই জন্যেই বোধহয় ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ নিউটন সম্পর্কে বলেছিলেন, `Voyaging through strange seas of thought alone.’ প্রতিভাবান ব্যক্তির জন্য একথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
আঠারো বছর বয়সে রাসেল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজে অনেক প্রসিদ্ধ অধ্যাপকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এ এন হোয়াইটহেড। গবেষণা বিষয়ে রাসেলের সঙ্গে হোয়াইটহেডের বেশ সখ্য ছিল। ১৮৯৩ সালে রাসেল র্যাং লার হন। কিন্তু পরীক্ষায় তিনি ভালো ফল করলেন না। তিনি দেখলেন যে, গণিতশাস্ত্রের অনেক ভুল জিনিস সত্য বলে চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে অধ্যাপকদের সঙ্গে তাঁর তর্ক হত, যা সত্য নয় বলে জানেন, সেই নিয়মের অঙ্কগুলো তিনি কখনও করতেন না। মূলত এসব কারণেই তাঁর ফল খারাপ হয়েছিল। এরপর গণিতের ওপর তিনি এমন বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন যে, পরীক্ষার পরে গণিতের বইগুলো সব বিক্রি করে দেন তিনি। আর কখনও অঙ্ক করবেন না বলেও শপথ গ্রহণ করেন।
ছেলেবেলায় একা থাকলেও কলেজে এসে তাঁর বন্ধু জুটলো অনেক। কলেজের সভা-সমিতিতে রাসেল ছিলেন নিয়মিত বক্তা। এরই সূত্র ধরে বাইরের অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ওই সময়ে এক কোয়েকার পরিবারে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন। মেয়েদের সঙ্গে এতোদিন পরিচয়ের কোন সুযোগ তাঁর হয়নি। ওই পরিবারের মেয়ে অ্যালাইস স্মিথের সঙ্গেই তাঁর প্রথম ঘনিষ্ঠতা হয়। এই ঘনিষ্ঠতা প্রণয় পর্যন্ত গড়ায়। যদিও লর্ড পরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে কোয়েকার পরিবারের খাপ খাওয়া কঠিন। আত্মীয়-স্বজন বাধা দিলেও ১৮৯৪ সালে রাসেল অ্যালাইসকে বিয়ে করেন। তাঁর বয়স তখন বাইশ, আর স্ত্রীর বয়স সাতাশ।
রাসেল এগারো থেকে আটত্রিশ বছর পর্যন্ত গণিতশাস্ত্রের মূল তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এরপর তিনি দর্শনশাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তীতে ইতিহাসের প্রতিও আকৃষ্ট হন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে মতামতের জন্য তিনি সাধারণ পাঠকের কাছে বেশি পরিচিত। তাঁর প্রথম বই রাজনীতির উপর। ১৮৯৫ সালে তিনি জার্মান যান, সেখান থেকে ফিরে এসে ফোবিয়ান সোসাইটিতে তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা ‘German Social Democracy’ নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।
মার্কসবাদের সঙ্গে তার মতবিরোধ ছিল। কিন্তু তাদের ম্যানুফেস্টোকে তিনি নানা কারণে ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, এই ম্যানুফেস্টো 'almost unsurpassed in literary merit.’ হোয়াইটহেডের সহযোগিতায় বিখ্যাত গ্রন্থ Principia Mathematica বের হয় ১৯১০ সালে। বইটি মোট তিন খণ্ডের ঢাউস সাইজের। গণিতের দার্শনিক ভিত্তি এবং গণিত যে বিজ্ঞানের পথ ধরে চলে, এর মধ্যে কোন রহস্য নেই তা প্রমাণ করার জন্যই এই বই লেখা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় বইটা পাঠকরা তেমন গ্রহণ করেনি। ১৯১০ সালের অক্টোবর মাসে রাসেল ট্রিনিটি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ঠিক ওই একই বছরে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে হেরে যান। মূলত তিনি যে নাস্তিক ভোটার এটা জানবার ফলেই তাঁর এই হার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসেল অনেক যুদ্ধবিরোধী প্রচারকার্য চালিয়েছিলেন, অনেক প্রবদ্ধ ও প্রচারপত্র ছাপিয়ে। ১৯১৬ সালে যুদ্ধবিরোধী প্রচারকার্য চালনার জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করা হয়। দু’বছর পর একটি প্রবন্ধে আমেরিকান সৈন্যদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার ফলে বিচারে তাঁর ছ’মাস জেল হয়। জেলে বসে সেই সময় তিনি বেশ কয়েকটা বই লেখেন।
১৯২০ সালে রাসেল রাশিয়া ভ্রমণে যান। তখনকার দিনে রাশিয়াকে দেখে রাসেল মন্তব্য করেছিলেন, 'Russia confirmed me in the belief that whatever is good is to be found in indiviuals, not in societies.’’
রাশিয়া থেকে আসার কিছুদিন পরই তিনি চীন ভ্রমণে বের হন। চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর ‘দি প্রবলেম অব চায়নায়’ লিপিবদ্ধ আছে। চীন সম্বন্ধে অনেক ভবিষ্যদ্বাণীই আজ সত্য হয়েছে। তাঁর মতে চীনারা হচ্ছে, 'an artist nation, with the virtues and vices to be expected of the artist.’ রাশিয়া ও চীন ভ্রমণ করে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে রাসেলকে লেখার আয়ের উপর নির্ভর করতে হয়েছিল। তার উপর আবার চেলশিয়া নির্বাচন কেন্দ্র থেকে স্যার স্যামুয়েল হোরের বিরুদ্ধে পার্লামেন্ট আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান তিনি। জীবিকা নির্বাহ ও শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি ও তাঁর স্ত্রী দু’জন মিলে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রাসেল চেয়েছিলেন, এটা একটা আদর্শ স্কুল হবে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকেরা তাঁর আদর্শানুযায়ী কাজ না করায় তিনি বিরক্ত হয়ে স্কুলটা বন্ধ করে দেন।
ইংল্যান্ডে তখন পুরুষের সঙ্গে সমান অধিকারে নারী আন্দোলন চলছে। সেই সময় রাসেল এটার সমর্থক ছিলেন। যৌনজীবনে নারীদের কিছু অসুবিধা ভোগ করতে হয় বলে নারী-আন্দোলনের পটভূমিকায় যৌনজীবনে এসব কুসংস্কার দূর করার ব্যাপারেও আলোচনা হয়। রাসেল তাঁর ‘ম্যারেজ অ্যান্ড মর‌্যালস’ নামক গ্রন্থে যেসব মতবাদ প্রচার করেন তাতে ইংল্যান্ডে ও আমেরিকায় আড়োলন সৃষ্টি হয়। এই বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, যৌনজীবন সম্বন্ধে অহেতুক গোপনীয়তার ফলেই যৌন অপরাধের সংখ্যা এতো বেশি। যৌন আকর্ষণের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যদি অবাধে প্রচার করা হয় তাহলে মানুষ এই দুর্নিবার আকর্ষণের বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে পারে। তাছাড়া যৌন অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো বিয়ে সুখের হয় না এই মতবাদে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বন্ধনহীন পরীক্ষামূলক বিবাহ প্রচলনের প্রস্তাব করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, এক বিবাহের ফলে বর্তমানে সমাজে অনেকে অনাবশ্যক দুঃখ কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছে। একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলেই অন্য কোন নারী বা পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারবে না, এটাকে কুসংস্কার বলে তিনি উড়িয়ে দিতেন। তিনি বলেন, 'of all forms of caution, caution in love is perhaps the most fatal to true happiness.’’

রাসেল শুধু যে যৌনতত্ত্ব তাঁর বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন তা নয়। তাঁর নিজের জীবনেও এর প্রয়োগ রয়েছে। তিনি বিয়ে করেছেন চারটি। তার মধ্যে এক স্ত্রী আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের অভিযোগ করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান। যৌনতার ক্ষেত্রে রাসেল ছিলেন বেশ উদার। তাঁর এক স্ত্রী ডোরা কিছুদিন তার প্রেমিককে এনে স্বামীর বাড়ি রেখেছিলেন। ডোরার গর্ভে চারটি সন্তানের মধ্যে দুটি যে তাঁর নয়, একথা জেনেও রাসেল কোন আপত্তি না জানিয়ে স্বচ্ছন্দে তার সঙ্গে ঘর করেছেন।
রাসেলের সবচেয়ে বড় ভুল তিনি মানুষের জীবনকে একটা মেশিন ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ছাচে ফেলে দেখেছেন। আমাদের মনের গুরুত্বকে তিনি তেমন আমলে নেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি সপরিবারে আমেরিকায় ছিলেন। যুদ্ধের সময় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরা তাঁর জন্যে অসম্ভব ছিল। এই অবস্থায় দেশ থেকে টাকা আনাও বন্ধ ছিল। এই আর্থিক সংকটকালে তিনি ইউ ইয়র্ক সিটি কলেজের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপকের পদ লাভ করার অনুমতি পান। কিন্তু এক করদাতা তাঁর নিয়োগের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেন। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, রাসেলের রচনা হলো, 'lecherous, salacious, libidinous, lustful, venereous, erotomaniac, apherodisiac, atheistic, irreverent, narrow-minded, untruthful, and bereft of moral fibre.’ সুতরাং তিনি বুঝাতে সক্ষম হন যে, এরকম এক লোককে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিলে ছাত্রদের এবং সমাজের ক্ষতিসাধন হবে। আদালতও এই অভিযোগের অনুকূলে রায় দিয়ে তাঁর নিয়োগপত্র বাতিল করে দেয়। সেই সময় বক্তৃতা দিয়ে ও লিখে যেসব অর্থ উপার্জন করতেন তাই দিয়ে কোনরকম অতিকষ্টে দিনযাপন করতেন তিনি। এ সময়কার বক্তৃতাগুলো নিয়ে সংকলিত হয় ‘হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি’। এটি তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ। ১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে এলে রাসেলের ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হয়। যে ট্রিনিটি কলেজ থেকে চাকরি গিয়েছিল সেখানে তিনি আবার নিয়োগ পান। যে সরকারের আদেশে তাঁর কারাদণ্ড হয়েছিল, তিনিই এবার দিলেন পুরস্কার ‘অর্ডার অব মেরিট’। জনসাধারণের অন্তরেও পেলেন ঠাঁই। হঠাৎ এরকম পরিবর্তনের কারণ একটাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ব্রিটিশের অংশগ্রহণ করাকে সমর্থন করেছিলেন। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতা করায় হয়েছিলেন লাঞ্ছিত।
বৃদ্ধ বয়সে এসেও রাসেল খুব কর্মক্ষম ছিলেন। তাঁর এই সুস্থ থাকার কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার যা ভালো লাগে তাই খাই, যেভাবে খুশি সেভাবে চলি, স্বাস্থ্যের কথা ভুলে থাকি বলেই ভালো আছি।’ রাসেল শেষ জীবনে এসে রাজনীতি ও সমাজনীতি নিয়ে মেতেছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ নিয়েও পাঠকমহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ব পরিমণ্ডলে রাসেলের যে আসল দান তা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি।
রাসেল দার্শনিক। তিনি আমাদের সামনে কতগুলো প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। দার্শনিকের কাজই জিজ্ঞাসা রেখে যাওয়া, পরে বৈজ্ঞানিকেরা এসে সেই জিজ্ঞাসার জবাব দেবেন। রাসেল বলেছেন, 'Science is what you know, Philosophy is what you don’t know.’ রাসেলের দর্শন সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, 'I want to stand at the rim of the world and peer into the darkness beyond, and see more than others have seen, of the strange shapes of mystery that inhabit that unknown might... I want to bring back into the world of men some little bit of new wisdom.’

উৎসুক পাঠকরা আরো বিস্তারিত জানতে Allan Wood লিখিত 'Bertrand Russell, the passionate Sceptic.’ বইটি পড়লে আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষীর জীবন ও চিন্তাধারা সম্বন্ধে চমৎকার ধারণা পেয়ে যাবেন।

লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন