বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বিশেষ ধারা না থাকা বাঞ্ছনীয়

আপডেট: 02:54:45 26/11/2016



img

এমএম কবীর মামুন

গণমাধ্যমে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬-এর খবর পড়তে গিয়ে বারবারই মনে হচ্ছিল, ‘আমরা কি তবে পেছনের দিকে হাঁটছি?’ আইনের খসড়ায় বিশেষ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ বা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো মেয়ের ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিবেচনায় বিয়ে হলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না। খসড়াটি নাকি খুব শিগগির মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে নাকি আইনের এই বিশেষ ধারাটি থাকছে! বিস্মিত হওয়ার মতো কথা। আইনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকার বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ করবার পরিকল্পনা করছে। তখনই বিষয়টি বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়েছিল। সামাজিক সমস্যা কমাতে নাকি এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে কি আমরা সামাজিক অবক্ষয়ের দায় মেয়েশিশুদের উপর চাপাচ্ছি? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন নারী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন আহ্বান জানিয়েছিল এই সিদ্ধান্ত না নেওয়া। তবুও কেন এমন সিদ্ধান্ত?
বাল্যবিবাহের ওপর বিশ্বব্যাপী পরিচালিত কিছু গবেষণার দিকে দৃষ্টি দিলেই আমরা দেখতে পাই এর ভয়াবহতা বাংলাদেশে কতটুকু। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় (প্রতিবেদন, ইউনিসেফের বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১১)। এ প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, চীন ছাড়া উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে একজনের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশে এই সংখ্যা তিন ভাগের দুই ভাগ। ইউনিসেফের আরও একটি গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি, ১৮ বছর বয়সের আগেই যেসব মেয়ের বিয়ে হয় তাদের শতকরা হার ৬৫ ভাগেরও ওপর। অথচ একই বয়সের ছেলেদের বিবাহের শতকরা হার মাত্র ৫ ভাগ। আর সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত অন্য একটি গবেষণায় বাল্যবিবাহের হার দেখা যায়, শতকরা প্রায় ৭০ ভাগের কাছাকাছি। এসব পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ভয়াবহ রূপ।
বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছে এমন কিছু বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, নিরাপত্তার অভাব, সামাজিক রীতিনীতি-সংস্কার, কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক চাপ, শিশুকন্যার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, সচেতনতার অভাব প্রভৃতি কারণে এই বাল্যবিবাহের ঘটনাগুলো ঘটছে। এ ছাড়া দেখা যায় খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানি প্রভৃতি কৌশলে নারীর প্রতি যেসব সহিংসতা সমাজে অনবরত ঘটে চলেছে তাতে অভিভাবকরা শঙ্কিত এবং ভোগেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। কারণ বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতিতে নারী কোনো অন্যায়-অনাচার-নিপীড়নের শিকার হলে তার জন্য ওই নারীকেই দায়ী করা হয়। তাই কন্যাসন্তানের অভিভাবকদের এই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা অত্যন্ত স্বাভাবিক। অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজে কোনো মেয়ের বয়স ১৮-২০ পার হলে তুলনামূলক অধিক যৌতুক ছাড়া তার বিয়ে হবে না। এ ছাড়া বখাটেদের উৎপাত, আকাশ সংস্কৃতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতেও অভিভাবকরা কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। এরপর রয়েছে সামাজিক চাপ। মেয়ের বয়স ১৩-১৪ হলেই প্রতিবেশী ও সমাজের মাথাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। চারদিক থেকে চাপ আসতে থাকে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য। যেন এ সমাজে কন্যাসন্তানের পিতা-মাতা হওয়াটা এক ধরনের অভিশাপ। তাই এই শাপ মোচনের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি হওয়ার আগেই শিশু অথবা কিশোরী অবস্থায় তারা পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হচ্ছে। যার দায় টানতে হচ্ছে ওই মেয়েকে একা।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করছে এরকম এনজিওর সংখ্যা বাংলাদেশে খুব কম নয়। বাংলাদেশ সরকারও কাজ করছে এ বিষয়ে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যারা কাজ করছে তারা প্রায় প্রত্যেকেই বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করে থাকে। কিন্তু তবুও কমছে না এ প্রবণতা। সমাজটাকে বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে আন্দোলন শুরু হলেও ২০১৬ সালে অর্থাৎ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও আমরা সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করতে পারিনি। এই সমস্যাকে দূর করতে না পারার পেছনে যেসকল কারণকে চিহ্নিত করা যায় তা হলো, বাল্যবিবাহ বিষয়টি একটি সামাজিক সমস্যা, এটা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকলেও তা এতই ক্ষুদ্র যে হিসাবে ধরা যায় না। একই কারণে বাল্যবিবাহ দেওয়ার সময় মেয়ের অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যরা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহানুভূতি লাভ করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভোট হারানোর ভয়ে এই ব্যাধি মোকাবেলায় কাজ করতে সাহস করেন না। বরং যা করেন, তা হলো জন্ম-তারিখ পাল্টে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে আয়োজিত বাল্যবিবাহ আয়োজনে সহায়তা। অনেক ইমাম ও কাজি আইনের প্রতি সম্মান না জানিয়ে বাল্যবিবাহে সহায়তা করে যাচ্ছেন।
আমাদের সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে চলছে শিশুকালে কন্যাসন্তানের বিবাহ দেওয়ার রীতি। এ সমাজে কন্যাসন্তানকে মনে করা হয় বোঝা। পিতা-মাতার গলার কাঁটা। তাই একে ঠেলে ফেলে দিতে পারলে বা সরিয়ে দিতে পারলে পিতামাতা এক ধরনের স্বস্তিবোধ করেন। যদিও বিয়ের সময় যতটা স্বস্তিবোধ করেন, বিয়ের দু'চার বছর পর থেকে সেই সাময়িক স্বস্তি চরম অস্বস্তি হয়ে ফিরে আসে বেশিরভাগ সময়। আর এ অবস্থা একজন নারীর জন্য বয়ে নিয়ে আসে চরম অন্ধকার। বাংলাদেশের অর্থনীতি-সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতি কোনোভাবেই নারীর পক্ষে যায় না। আর শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এর ভয়াবহতা অনেক বেশি। আর্থিকভাবে তুলনামূলক সক্ষম ব্যক্তিরা শহরে বাস করার ফলে শহরাঞ্চলে এর ভয়াবহতা গ্রামাঞ্চলের মতো অতটা প্রকট নয়। বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। তাই অধিকাংশ মেয়েই শিকার হচ্ছে এই বাল্যবিবাহ নামক সামাজিক ব্যাধির। পিতা-মাতার পাশাপাশি রাষ্ট্রও কি তবে মেয়েশিশুকে অভিশাপ ভাবতে শুরু করেছে? নয়তো ১৯২৯ সালে যেখানে মেয়ের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়সসীমা ছিল ১৮ সেখানে ২০১৬ সালে এসে সরকার সেটাকে বিশেষ বিবেচনায় কমাচ্ছেন কেন?
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ এ শিশুর বয়সসীমা ১৮ বলে নির্ধারিত আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩-এর প্রথম অধ্যায়ের ধারা ৪তে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সকে শিশু হিসাবে গণ্য করার কথা বলা আছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬-এর প্রস্তাবিত খসড়ায় বিশেষ ধারা যুক্ত করে ১৮ বছরের কম বয়সে একজন শিশুকন্যার বিয়ের অনুমোদন কি বাল্য কিংবা শিশু বিবাহের আওতায় পড়বে না? বিষয়টি ভেবে দেখবার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করছি।
সামাজিক অবক্ষয়ের দোহাই দিয়ে একজন মেয়েশিশুকে ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে দিলেই কি অবক্ষয় রোধ হবে। ধর্ষকামী অমানুষরাতো ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করতেও ছাড়ছে না। তবে কি তার চেয়েও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে হবে? ১৮ বছর বয়সের কমে একটি মেয়ের বিয়ে হলে সে কত ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যদিয়ে যায় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা অনেকেই জানি। তথাপি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ দূর করার পদক্ষেপ না নিয়ে শিশু বিবাহের প্রচলন করার যৌক্তিকতা কতটুকু তা বোধগম্য নয়। এটাতো মাথা ব্যাথার চিকিৎসা হিসাবে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্তের মতোই ব্যাপার।
বিশেষ ধারার প্রয়োগ করে মেয়েদের বিয়ে দিতে থাকলে পরবর্তী যেকোনো গবেষণাতেই দেখা যাবে যে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার কমতে থাকবে। কিন্তু তাতে কি আমাদের দেশ আর সমাজ লাভবান হবে? অপরিণত বয়সে একটি মেয়ের গর্ভধারণের এবং অপুষ্ট সন্তান জন্মদানের মধ্য দিয়ে কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? তাই এক ধরনের শঙ্কা থেকে বারবারই মনে হচ্ছে, আমরা কি তবে পেছনের দিকেই ফিরে চলেছি? আমরা কি তবে সামনের দিকে যাবো না? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে সরকার আইনের বিশেষ ধারা রহিত করে ১৮ বছরকেই একটা মেয়ের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়সসীমা হিসাবে রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬ প্রণয়ন করবেন বলে সচেতন মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক : সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট

আরও পড়ুন