বিআইএন লক, মোটরপার্টস আমদানি বন্ধ

আপডেট: 02:07:45 29/03/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : দুই শতাধিক মোটরপার্টস ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকের বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) লক করে দেওয়ায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে সব ধরনের মোটরপার্টস আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে।
অনেক আমদানিকারকের পণ্য ইতিমধ্যে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে চলে এসেছে। অনেকের পণ্য আবার বেনাপোল স্থলবন্দরের গুদামে পড়ে আছে। কিন্তু বিআইএন নম্বর লক হওয়ার কারণে এসব পণ্য তারা কাস্টমস থেকে ছাড় করাতে পারছেন না। এ কারণে নতুন করে কেউ এলসিও খুলছেন না।
চলতি মাসের শুরু থেকে সব ধরনের মোটরপার্টস আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দুই শতাধিক আমদানিকারক যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি এর বিরূপ প্রভাবও পড়ছে দেশের মোটরপার্টসের বাজারে। এ খাত থেকে কমে যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয়।
দেশে মোটরপার্টসের অন্যতম বড় মোকাম যশোর। এখানকার দুই শতাধিক আমদানিকারক বেনাপোল বন্দর দিয়ে মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের পার্টস, বাস-ট্রাকের ইঞ্জিন ও পার্টস এবং রিকন্ডিশন্ড মোটরপার্টস আমদানি করে থাকেন।
সারা দেশে মোটরসাইকেল পার্টসের মোট চাহিদার প্রায় পুরোটাই যশোর থেকে যায়। আর চট্টগ্রামের পর রিকন্ডিশন্ড মোটরপার্টসের সবচেয়ে বড় মোকাম যশোর। তাই যশোরের ব্যবসায়ীদের বিআইএন লক হওয়ার কারণে এর প্রভাব সারা দেশের মোটরপার্টস বাজারের ওপর পড়ছে।
মোটরপার্টস ও টায়ার টিউব ব্যবসায়ী সমিতি যশোর অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সবুজ জানান, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন অনুযায়ী ৪ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে তাদের রিটার্ন দাখিল করার কথা। কিন্তু এত দিন দেশের কোথাও এই বিধি অনুযায়ী কাজ হয়নি। রাজধানীতে বছরখানেক হলো এটা চালু করার চেষ্টা চলছে। যশোর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। মাসখানেক আগে যশোরের আমদানিকারকরা বেনাপোলে তাদের পণ্য ছাড় করাতে গিয়ে দেখেন বিআইএন লক। তখন ভ্যাট অফিসে যোগাযোগ করা হলে জানানো হচ্ছে, পূর্ববর্তী বছরগুলোর রিটার্ন দাখিল করে বিআইএন লক ছাড়িয়ে নিতে হবে। এতে দেখা যাচ্ছে, একেকজন ব্যবসায়ীকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ, কাউকে কাউকে ৮৬ লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হবে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ ব্যাপারে সমিতির পক্ষ থেকে ভ্যাট কমিশনারেট যশোর অঞ্চলের কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়ে দেন, যার যা বকেয়া পড়েছে তার চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে বিআইএন লক খুলে নেওয়া যাবে। বাকি টাকা পরে দিলেও চলবে।’
সমিতির সভাপতি শাহিনুর হোসেন ঠান্ডু বলেন, ‘বগুড়ায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পুরনো ভ্যাট নেওয়া হচ্ছে না। ঢাকায় প্রতি বিল অব এন্ট্রিতে ১০-১৫ হাজার টাকা করে নিয়ে বিআইএন খুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ যশোরে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। দেশের একেক স্থানের ব্যবসায়ীদের জন্য একেক রকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; যা কাম্য না।’
তিনি বলেন, যশোরের পার্টস আমদানিকারকদের সবাই বেনাপোল বন্দর দিয়ে তাদের পণ্য আমদানি করেন। এ খাত থেকে সরকার বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে। যশোরের পার্টস ব্যবসার সঙ্গে প্রায় দশ হাজার মানুষের রুটি-রুজি জড়িত। এখন এই ব্যবসায়ীদের কাছে পুরনো ভ্যাটের জন্য যে টাকা দাবি করা হয়েছে, তা যদি দিতে হয় তাহলে তারা পথে বসে যাবেন। এ খাতে সৃষ্টি হবে বিপর্যয়।
‘আমরা পণ্য আমদানির শুল্কের পাশাপাশি উৎসে ৪ শতাংশ ভ্যাট দিচ্ছি। প্যাকেজ ভ্যাটও দিয়েছি। এখন আরো চার শতাংশ ভ্যাট দাবি করা হচ্ছে,’ বলেন ব্যবসায়ী নেতা ঠান্ডু।
যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়ক এলাকার মোটরপার্টস ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কোয়ালিটি ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার কামরুল হাসান রুবেল বলেন, ভ্যাট কমিশনারেট অফিস থেকে তার প্রতিষ্ঠানের পুরনো ভ্যাট ধরা হয়েছে ৮৬ লাখ টাকা। বিআইএন ছাড়ানোর জন্য এখন সাড়ে ২১ লাখ টাকা দিতে বলছে। বাকি টাকা পরে দিতে হবে। এ অবস্থায় ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
এসএম মোটরসের মালিক মশিয়ার রহমান বলেন, তিনি ৫৩ পিস বাস-ট্রাকের ইঞ্জিন আমদানি করেছেন; যা এখন বেনাপোল বন্দরের খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। বিআইএন লক থাকায় তিনি এগুলো ছাড়াতে পারছেন না। প্রায় ২১ লাখ টাকার এসব পণ্য ছাড় করালে সরকার ১৫-১৬ লাখ টাকা রাজস্ব পেত। কিন্তু সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
ভ্যাট কমিশনারেট যশোর অঞ্চলের কমিশনার মো. শওকাত হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীদের তো নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাটের টাকা দিতেই হবে। যার যা বাকি পড়েছে, আপাতত তার কিছু অংশ পরিশোধ করে বিআইএন পুনরায় সচল করে নেওয়া যাবে। বাকিটা পর্যায়ক্রমে দিতে হবে। তিনি জানান, যশোরে মোট এক হাজার ৬০০ ব্যবসায়ীর বিআইএন লক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৩ জন বকেয়ার কিছু অংশ পরিশোধ করে তাদের বিআইএন আবার সচল করে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, বকেয়া পরিশোধের ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়নি- কথাটি সত্য নয়। হয়তো প্রত্যেককে আলাদাভাবে বলা হয়নি। কিন্তু মোটরপার্টস ব্যবসায়ীদের সমিতিতে গিয়ে বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে।
শওকাত হোসেন আরো বলেন, এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় তিনি এ বিষয়টি উল্লেখ করবেন। সরকার এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটিই বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার যদি পুরোটাই নিতে বলে, তাহলে পুরোটাই দিতে হবে। যদি কিছুটা বা পুরোটা মওকুফ করে, সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বেনাপোল কাস্টম হাউজের অতিরিক্ত কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, ‘চলতি মাসে আর কেউ নতুন করে বন্দর দিয়ে মোটরপার্টস আমদানি করছেন না। এতে আমাদের রাজস্ব আহরণ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে।’

আরও পড়ুন