বিকল্পধারা ছাড়াই জোট!

আপডেট: 01:10:54 12/10/2018



img

সালমান তারেক শাকিল : বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সম্ভাব্য জোটের রূপরেখা ও নামের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ায়’। ক্ষণে-ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে বৈঠকের স্থান। চলছে একে-অন্যের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশও। বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাতটায় রাজধানীর বেইলি রোডে ড. কামাল হোসেনের বাসায় ঐক্যপ্রক্রিয়ার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে আগের দিন ১০ অক্টোবর যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান পরবর্তী বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে পিছিয়ে যান সাবেক রাষ্ট্রপতি ওযুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও। এরআগে ওইদিন দুপুরেই খবর রটে যায়, ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠক হচ্ছে না। বৈঠক হবে রাত নয়টায় উত্তরায় আ স ম আবদুর রবের বাসায়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আবার খবর আসে, আ স ম রবের বাসায়ও বৈঠক হচ্ছে না।
একাধিক রাজনৈতিক সূত্র বলছে, আ স ম রবের বাসায় মাহী বি চৌধুরী যাচ্ছেন- এমন খবরে বিএনপি নেতারা অনীহা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে বি চৌধুরী বা বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নানকে ছাড়া ঐক্যপ্রক্রিয়ার আলোচনা তারা করতে চান না। তবে এই বিষয়ে বিএনপির কোনো নেতাই মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আ স ম রবের রাজনৈতিক সচিব গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়েজি বলেন, ‘আ স ম রবের বাসায় বৈঠক হচ্ছে না। বাতিল করা হয়েছে।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে মাহী বি চৌধুরী বলেন, ‘আমি আ স ম রবের বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছি। বৈঠকে উপস্থিত থাকবো।’
পরে রাত আটটার দিকে মাহী বি চৌধুরী জানান, তানিয়া রব ফোন করে বৈঠক বাতিলের কথা জানিয়েছেন। সে কারণে আর সেখানে যাওয়া হচ্ছে না।
রাত সোয়া আটটার দিকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আজকে বৈঠক হবে না। এটা পরবর্তী সময়ে আবার হবে। আর ঐক্য তো প্রক্রিয়ার বিষয়। এটা চলতে থাকবে। এটা তো এমন না যে, এক বৈঠকেই ঐক্য হয়ে যাবে। কয়েকটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কার্যকরভাবে ঐক্য যেন হয়, সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
‘বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছেন বলে খবর পেয়েছেন এই প্রতিবেদক।’
যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতা জানান, গত ৮ অক্টোবর উত্তরার বৈঠকের শেষ দিকে মেজর (অব.) আব্দুল মান্নানের সঙ্গে তর্ক হয় আ স ম আবদুর রবের। সেখানে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে দাবি-দাওয়া পূরণে আগেই ফায়সালা করার প্রস্তাব দেন মান্নান। এ বিষয়টি সাংবাদিকদের সামনেও উপস্থাপনের প্রস্তাব দেন তিনি। এতে আপত্তি জানান আ স ম রব।তার যুক্তি, আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি-দাওয়া আদায়ের পরই এ বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে।
যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতার দাবি, ওই তর্কের পরই মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান পরবর্তী বৈঠকে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে, আব্দুল মান্নান এসব বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার একাধিক নেতা জানান, ড. কামাল হোসেনসহ শীর্ষ নেতাদের বৈঠকটি হতে আরো সময় লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে আজ (বৃহস্পতিবার) রাতেও বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে দাবি ও লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে খসড়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে আসন্ন জোটের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। সাতটি দাবি ও ১১টির মতো লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে।
যদিও যুক্তফ্রন্টের আরেক শীর্ষ নেতার ভাষ্য, ‘জাতীয় যুক্তফ্রন্টও হতে পারে। তবে সবকিছুই প্রাথমিক প্রস্তাব। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরই নাম নির্ধারণ হবে।’
প্রাথমিকভাবে যে সমস্ত দাবিকে সামনে রেখে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে,  অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতার নেতাকর্মীদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালো আইন বাতিল করতে হবে। নির্বাচনের দশ দিন আগে থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা । নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের ফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো ধরনের মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রাথমিকভাবে যেসব লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যানমূলক রাষ্ট্র গঠন করা। সংসদে, সরকারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনাসহ প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যায়পাল নিয়োগ করা। ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের সংশোধন করা। সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, সৎ-যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগদানের জন্য ‘সাংবিধানিক কমিশন’ গঠন করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা। সব নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চয়তার বিধান করা। কৃষক-শ্রমিক ও দরিদ্র জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা। নারীর সমতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা। রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃংখলা নিশ্চিত, জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। নিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবন মান নিশ্চিত করা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বেতন-মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল ও কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া। ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব,  কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেওয়া। বিশ্বের সব নিপীড়িতদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণসমর্থন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। একইসঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।
জোট গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করা সম্ভব হলে কী কী করা হবে, এর একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে চায় বিএনপিসহ জোটের বাকি অংশগ্রহণকারীরা।
বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  শুক্রবারের বৈঠকে খসড়া চূড়ান্ত করা সম্ভব না হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরা হবে। বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতা থাকতে পারেন।
নেতারা বলছেন, ঐক্য কার্যকর করার পূর্বশর্ত বিএনপির পক্ষ থেকে আসনবণ্টন ও সরকার গঠন সম্পর্কে স্পষ্ট ও পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি। এই প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবেই দিতে হবে। সম্ভাব্য এই বৈঠকে বিএনপি নেতারা তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন- এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দলটির দুই সিনিয়র নেতার পক্ষ থেকে।
যুক্তফ্রন্ট নেতারা বলছেন, আসনবণ্টন ও সরকার গঠনের বিষয়টি কীভাবে নিরূপিত হবে, এটা আগে পরিষ্কার করতে হবে। তারা ধারণা করছেন, ইতিমধ্যে বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের সেটআপ হয়েছে। ফলে, ঐক্য জোট আকারে আসা সময়ের ব্যাপার। যদিও যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক বিকল্পধারা চাইছে, কোনোভাবেই বিএনপি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী না হোক। দ্বিতীয় দফায় যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা থেকে না সরার ইঙ্গিত দিয়েছেন বি চৌধুরী।
ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্তত তিনজন নেতার ধারণা, বিএনপির সঙ্গে সম্ভাব্য এই ঐক্য থেকে শেষ পর্যন্ত বিকল্পধারা সরে পড়তে পারে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন