বিতর্কিত স্কুলের শিক্ষক কর্মচারীরা একই পরিবারের!

আপডেট: 02:03:29 09/07/2018



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের হাজরাকাঠি বেলতলায় ‘রাজাকারের’ নামে স্থাপিত অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুলটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থামছে না। পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে স্কুলটি। এই নিয়ে এলাকায় হইচই পড়ে গেছে।
অভিযোগ করা হচ্ছে, ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে করা হয়েছে চরম স্বজনপ্রীতি। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে আটজন একই পরিবারের। বাকিরা ওই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু শিক্ষক-কর্মচারীই নয়, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান পদটিও রয়েছে ওই পরিবারের দখলে। সম্প্রতি এলাকায় গিয়ে এমন তথ্য মিলেছে। তবে পরিবারটি এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় এই বিষয়ে সরাসরি মুখ খুলতে চাচ্ছেন না কেউ।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, ‘রান ডেভেলপমেন্ট নিছার আলী মেমোরিয়াল অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’য়ের ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে আটজনই হচ্ছেন নেছার আলীর ছেলে, পুত্রবধূ, শ্যালিকা পরিবারটির ঘনিষ্ঠ। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নিছার আলীর বড় ছেলে মিজানুর রহমান মিন্টু। যিনি ইউনিয়নের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থেকেও এই স্কুলপ্রধানের পদটি আঁকড়ে ধরেছেন। যদিও তিনি একদিনও অটিস্টিক স্কুলে থাকেন না। স্কুলটির সিনিয়র-সহকারী শিক্ষক হয়েছেন মিন্টুর ছোটভাই রাশিদুল ইসলাম লিট্টু; যিনি কেশবপুর উপজেলায় একটি কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সহকারী শিক্ষক হলেন, প্রধান শিক্ষক মিন্টুর দুই স্ত্রী জান্নাত খাতুন সজনী ও তানজিলা খাতুন এবং মিন্টুরই ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জান্নাতি আক্তার। স্কুলের আয়া হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মিন্টুর খালা রিনা বেগম। নৈশপ্রহরী নিযুক্ত করা হয়েছে মিন্টুর পালিত ভাগ্নে মাসুদ রানাকে। প্রতিষ্ঠানের বাকি পাঁচ শিক্ষক-কর্মচারীও মিন্টুর পরিবারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন মিন্টুর মা ছামছুননাহার। ফলে এলাকাবাসীর কাছে প্রতিষ্ঠানটি মা-ছেলের স্কুল নামে পরিচিতি পেয়েছে।
এদিকে খোলামেলা পরিবেশে স্কুল প্রতিষ্ঠা না করে তা করা হয়েছে মিন্টুদের বসতবাড়ির প্রাচীরের ভেতরে বৈঠকখানায় । স্কুলটির গায়ে রয়েছে মিন্টু ও লিট্টুর বসতঘর। আর যে বৈঠকখানা ভেঙে স্কুল করা হয়েছে তাও ‘রাজাকার’ হিসেবে অভিযুক্ত আফসার আলীর সম্পত্তির ওপরে। অভিযোগ রয়েছে, চাচার সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে নিতে তারই জমির ওপর কৌশলে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যদিও মিন্টুর দাবি, চাচার ছেলেদেরকে এই জমির পরিবর্তে অন্যস্থানে সমমূল্যের জমি দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অটিস্টিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘আমরা দুই ভাই অটিস্টিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে আছি। আমাদের কারো স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির সাথে জড়িত নন।’
যদিও মিন্টুর প্রথম স্ত্রী জান্নাত খাতুন সজনী এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি ও লিট্টুর স্ত্রী শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন।
মাসুদ রানা ও রিনা বেগম সম্পর্কে মিজানুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘মাসুদ রানা আমাদের বাড়ির পাশে ঘর করে থাকেন। আর রিনা আমাদের দূর সম্পর্কের খালা।’
একসঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানে কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন জানতে চাইলে মিন্টু বলেন, ‘আমি অটিস্টিক স্কুলের প্রশাসনিক দিকটা দেখি। আর লিট্টু বেতন পান না বলে কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।’
এর আগে, নিছার আলীর নামে প্রতিষ্ঠিত অটিস্টিক স্কুলটি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এবং নিছারের স্ত্রী ছামছুননাহার।
সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য কর্তৃক কথিত রাজাকারের নামে স্কুল উদ্বোধন করায় তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মশ্মিমনগর ইউনিয়নের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। তারা বিষয়টি নিয়ে গত মাসের ২০ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করেন। সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধারা দাবি করেন, স্বপন ভট্টাচার্য্য কুখ্যাত রাজাকার আফসার আলীর ভাই নিছার আলী রাজাকারের নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ওই এলাকায় রাজাকারদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, এই আফসার-নিছার দুইভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার বহুমানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। তারা হাজরাকাঠি গ্রামের মুন্তাজ মোড়লকে হত্যাসহ ওমর আলী ও শাহ আলী সানাকে ধরে নিয়েছিল, যাদের খোঁজ আজো পাননি স্বজনরা। রাজাকারের নামে এবং রাজাকারের পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্কুলটি বাতিল করে ইউনিয়নের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দ্বারা পরিচালনায় নতুন করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
এর কয়েকদিন পরে সংবাদ সম্মেলনে নিছার উদ্দিনের স্ত্রী ছামছুননাহার দাবি করেন, তার ভাসুর আফসার আলী মোড়ল রাজাকার ছিলেন। তবে তার স্বামী রাজাকার ছিলেন না। তার স্বামী একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক ছিলেন।

আরও পড়ুন