বেনাপোল-খুলনা ট্রেন ফের বেসরকারি খাতে যাচ্ছে!

আপডেট: 06:53:07 11/02/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : বেনাপোল-খুলনা রুটের ট্রেন চলাচল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে খবর রটেছে। লাভজনক এই রুটে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাচলকারী কমিউটার ট্রেন নাকি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ করা হচ্ছে, বর্তমান আয় থেকে বেশি পাওয়া যাবে এই অজুহাতে এই ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন রেলওয়ের কতিপয় কর্মকর্তা। বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কমিউটার ট্রেনটি লিজ নেওয়ার জন্য  মহাপরিচালকের দপ্তরে দেনদরবার করছেন।
রেল সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ চালু ছিল। যুদ্ধকালীন ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে কিছু দিনের জন্য এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার তা চালু হয়। লোকসানের কারণ দেখিয়ে ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব সরকার এই রুটে রেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর বেনাপোল যশোরসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ আবার রেলপথটি চালু করার জন্য সরকারের কাছে দাবি করতে থাকেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার ২৫ কোটি টাকা খরচ করে বেনাপোল-খুলনা ভায়া যশোর যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৯৯ সালের ২৩ নভেম্বর এই রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রীট্রেন চলাচল উদ্বোধন করা হয়; যা ২৮ জুলাই ২০১০ পর্যন্ত সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পরে সরকার বেনাপোল-খুলনা কমিউটার ট্রেন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়। প্রথমে বেসরকারি কোম্পানি ‘মেসার্স বান্না এন্টারপ্রাইজ’ ও পরে ‘ইসলাম শিপ বিল্ডার্স’ চুক্তিবদ্ধ হয়ে কমিউটার ট্রেন পরিচালনা করে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাত্রীসেবা নিম্নমুখি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্যত চোরাকারবারি, টানাবাজদের দখলে চলে যায় কমিউটার ট্রেনটি। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের দাবিতে ২০১৩ সাল থেকে আবার সরকারি তত্ত্বাবধানে যায় কমিউটার ট্রেন।
লাভজনক ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে এ রুটে দিনে দুইবার যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় খুলনা থেকে কমিউটার ট্রেন যাত্রী নিয়ে বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা হয়ে দৌলতপুর, নওয়াপাড়া, সিঙ্গিয়া, যশোর, ঝিকরগাছা, নাভারন স্টেশন পার হয়ে সকাল সাড়ে আটটায় বেনাপোল পৌঁছায়। এ সব স্টেশন থেকে ওঠা বেশির ভাগ যাত্রী ভারতে যান। পরে সকাল নয়টায় বেনাপোল স্টেশন ত্যাগ করে বেলা ১১ টা ৪৫ মিনিটে খুলনা পৌঁছায় ট্রেনটি। এই ট্রেন আবার দুপুর ১২টায় খুলনা স্টেশন ছাড়ে। বেনাপোল পৌঁছায় দুপুর আড়াইটায়। কমিউটার ট্রেনটি বিকেল সাড়ে তিনটায় খুলনার উদ্দেশে বেনাপোল ত্যাগ করে।
রেলওয়ের সূত্র মতে, দিন দিন ট্রেনে যাত্রী বাড়ছে। স্থলপথে ভারত যাতায়াতের জন্য দেশের বৃহত্তম চেকপোস্ট যশোরের বেনাপোলে। দেশের অন্যান্য স্থান ছাড়াও খুলনা-যশোর অঞ্চলের বিপুল অধিকাংশ যাত্রী ভারত-বাংলাদেশ আসা-যাওয়া করেন বেনাপোল হয়ে। অনেক সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী খুলনা, যশোরসহ মধ্যবর্তী শহরগুলোতে যাতায়াত করেন এই ট্রেনে চেপে।
বেনাপোল থেকে যশোরে ভাড়া ২২ টাকা ও খুলনার ভাড়া ৪৫ টাকা। বেনাপোল থেকে ছেড়ে যাওয়া কমিউটার ট্রেনে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক যাত্রী টিকিট না কেটে ট্রেনে ওঠেন। এরা অর্ধেক পয়সায় গন্তব্যে পৌঁছে যান। আবার অনেকে টিকেটের গোটা টাকাই ফাঁকি দেন। চেকাররা টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে নেন বিনা রশিদে। ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও লাভবান হচ্ছেন অসাধু চেকাররা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঠিকমতো টাকা জমা না হওয়ায় লোকসান দেখিয়ে এখন ট্রেনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়ার যুক্তি তৈরি হয়েছে।
খুলনা থেকে বাসযোগে বেনাপোল আসতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। ভাড়া দেড়শ’ টাকা। আর কমিউটার ট্রেনে খুলনা থেকে বেনাপোল আসতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা, ভাড়া মাত্র ৪৫ টাকা। এ কারণে খুলনা থেকে জেলা শহর যশোরসহ ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা বাসের চেয়ে কম খরচে ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন।
বিজিবি, পুলিশ এবং ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরিদর্শকদের কড়াকড়ির কারণে আগের চেয়ে চোরাচালানিদের দৌরাত্ম্য কমেছে। চুরি-চামারি সত্ত্বেও আগের তুলনায় কমিউটার ট্রেন থেকে সরকারি কোষাগারে বেশি টাকা জমা হচ্ছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি মাসে এট্রেন থেকে ৩৭ লাখ টাকা টাকা আয় করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই লাভজনক ট্রেনটির প্রতি নজর পড়েছে তাই ব্যবসাবুদ্ধিসম্পন্নদের।
ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে পাকশীতে কর্মরত রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মিহিরকুমার গুহ বলেন, ‘নীতিমালা মেনেই ট্রেন বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হয়। আপাতত বেনাপোল-খুলনা কমিউটার ট্রেনটি লিজ দেওয়ার কোনো চিন্তা নেই। তবে কোনো কোম্পানি যদি শেষ ছয় মাসের আয়ের চেয়ে বেশি টাকা দিতে চায়, তাহলে তাদের অনুকূলে লিজ দেওয়া যেতে পারে।’
বেনাপোল রেলস্টেশন মাস্টার শাহিদুর রহমান জানান, ‘আপনারা যেভাবে জেনেছেন আমিও ওই ভাবে জেনেছি। তবে লিজ দেওয়ার ব্যাপারে আমি অফিসিয়ালি কিছুই জানি না।’

আরও পড়ুন