বেনাপোল বন্দরে পণ্য খালাসে বিস্তর সময়

আপডেট: 07:15:36 10/01/2017



img
img
img

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে লাখ লাখ টন মালামাল নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শত শত ভারতীয় ট্রাক। আমদানি-রফতানির সঙ্গে সংশ্লিস্ট কাস্টমসহ সব পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিকে কার্যক্রম চললেও বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চলছে ম্যানুয়াল পদ্ধতি অর্থাৎ হাতে কলমে। বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে অটোমোশন চালু হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ম্যানুয়েল ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিতে কার্গো পণ্য তদারকি করার ফলে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে পণ্য খালাসে অযথা সময় নষ্ট হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানি-রফতানি এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর। এছাড়া এ পুরনো পদ্ধতিকে পুঁজি করে বন্দরে গড়ে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। যাদের কারণে সরকার প্রতিবছরই বঞ্চিত হচ্ছে বড় ধরনের রাজস্ব থেকে। গত অক্টোবরে আগুন লেগে কত টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে এর কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই হিসেব মেলাতে কাস্টমসের কাছে ধরনা দিচ্ছে। অথচ এসব পণ্যের তালিকা কম্পিউটারে থাকলে এক ক্লিকে সব পাওয়া যেত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের প্রধান বন্দরগুলোতে ইতিমধ্যে অটোমোশন পদ্ধতিতে সব কার্যক্রম পরিচালিত হলেও স্থলবন্দর বেনাপোলে এখনো তা কার্যকর হয়নি। অনেক কর্মকর্তা এখনো অটোমোশন পদ্ধতি কী, তাও জানেন না। এর ফলে আমদানি-রফতানিসহ মালামাল খালাসে প্রতিদিন বাড়তি সময়ের অপচয় ঘটছে। পাশাপাশি আশানুরূপ সেবা পাচ্ছেন না বন্দর ব্যবহারকারীরা। অথচ কর্তৃপক্ষ ঠিকই শতকরা পাঁচ ভাগ বন্দর চার্জ আদায় করে নিচ্ছেন বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ অটোমোশন পদ্ধতি চালু না করার কারণে কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করাও সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কাস্টমসে বেশ কয়েক বছর আগেই কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে অটোমোশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বন্দরে অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ায় তাও কাজে আসছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বন্দরে কাগজপত্র সাবমিট করতে হচ্ছে। অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ভারত থেকে বন্দরে কী পরিমাণে মালামাল ঢুকছে, মালামালের সঠিক বর্ণনা, মালামালের পরিমাণ, কোন মাল কত নম্বর শেডে সংরক্ষিত হচ্ছে তার কোনো সঠিক হিসেব দিতে পারছে না। এসব জানতে চাইলে খাতাপত্র দেখে বলা হয়। যার ফলে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তাদের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে অন্যান্য বন্দরের তুলনায় শুল্ক ফাঁকির প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। ফলে সরকার এ বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেনাপোল বন্দরের ওপর গবেষণা চালায়। গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে দ্রুত কার্গো পণ্য আমদানি-রফতানিতে পুরনো ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিকে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই গবেষণাপত্রে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফআইসি) সহায়তা ‘বাংলাদেশ টাইম রিলিজ স্টাডি (টিআরএস)’ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করে বেনাপোল বন্দর কাস্টমস হাউজে। এছাড়া ওরজ-কোয়েস্ট রিসার্চ লি. (ওর-কোয়েস্ট) এ গবেষণায় সার্বিক সহযোগিতা করেছে। চট্রগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দর টিআরএস জরিপ এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দক্ষিণ এশিয়া সামাজিক ও অর্থনীতি ঋণ প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক উৎপাদন ও পচনশীল পণ্যবোঝাই ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকে। যার বিপরীতে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি বিল অফ এন্ট্রি পণ্য ক্লিয়ারেন্সের জন্য জমা হয়।
স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে সাতদিনের মধ্যে আমদানি করা সব কার্গো কীভাবে খালাস ও রফতানি কার্গো চারদিনের মধ্যে খালাস করা যায়, তা উঠে এসেছে গবেষণায়। গবেষণায় বৈধ বাণিজ্য সহজতর করতে সময় বাঁচানোর বিষয়ে এনবিআরকে কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুপারিশ করা হয়েছে।
পণ্য ও শুল্ক মুক্তির বিলম্বিত ক্লিয়ারেন্সের জন্য বিদ্যমান ম্যানুয়াল পদ্ধতি ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়াকে দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রভাব পাওয়া যায়নি। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়াতে কাস্টমস, অন্যান্য সরকারি সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং এজেন্টকে পদ্ধতি ও অনুশীলন বিষয়ে সচেতন হতে সুপারিশ করা হয়।
বলা হয়, এ পদ্ধতির ফলে কর ফাঁকি বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের এ পদ্ধতি থেকে মুক্তি ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ইলেট্রনিক পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত এবং আরামে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টিতেও সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বৃহত্তম এ স্থলবন্দরের অবাঞ্ছিত সময় নষ্ট বিষয়ে স্বল্প, মধ্য অথবা দীর্ঘ মেয়াদী পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য ঘোষণা, প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শতভাগ আরামদায়ক পদ্ধতি গ্রহণে পাইলট প্রোগ্রাম নিতেও বলা হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য কাস্টমস পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিটের ক্ষেত্রে জোর দেওয়া উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। ঝুঁকি এড়াতে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে সুপারিশ করা হয়েছে। পণ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় নষ্টের বিষয়টি চিহ্নিত করে সময় বাঁচাতে সব সংস্থার মধ্যে উন্নত যোগাযোগের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা করা যেতে পারে বলেও অভিমত দেওয়া হয় গবেষণায়।
পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে পচনশীল পণ্য পরিবাহী ভারতীয় ট্রাক একটি নির্দিষ্ট বন্ড আমদারিকারকদের অধীনে দেওয়া উচিত। কার্গো ক্লিয়ারেন্স, ব্যবস্থাপনা অনুমতি, কার্গো পরীক্ষণসহ অন্যান্য বিষয়ে একটি আন্তঃবিভাগীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে পরিচালনা করা উচিত বলে গবেষণায় বলা হয়।
সময় বাঁচানো, উন্নতি ও দ্রুত পণ্য আদান প্রদানের আরো কৌশল অবলম্বনের জন্য জাতীয় রাজস্ব থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা দরকার। পাইলট প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুফল পাওয়া যাবে বলে গবেষকরা মনে করেন।
জাপান ও যুক্তরাজ্য টিআরএস অনুসারে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অরগানাইজেশন (ডব্লিউসিও) মাধ্যমে কাস্টম হাউজে সেবা বৃদ্ধি করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনেক কাস্টম হাউজে এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
এ প্রতিবেদন অনুসারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড খুব শিগগিরই এ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানির বাঁধা দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেবে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপ পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরকে ডিজিটাল করতে প্রধান কার্যালয়ে কাজ চলছে। শিগগির বেনাপোল বন্দরকে ডিজিটালাইজ করা হবে। এর ফলে বন্দরের গতিশীলতা অনেক বেড়ে যাবে বলে তিনি মনে করছেন।
এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. শত্তকাত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের প্রধান কার্যালয়ের অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করছে। পুরো কাস্টম হাউজকে অটোমোশনের আওতায় আনা হলেও বন্দরের কারণে আমাদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

আরও পড়ুন