বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে রোজা

আপডেট: 03:16:54 10/06/2018



img

মাওলানা মুহাম্মাদ আসাদুজ্জামান ফারুকী

মানবজীবনের আত্মিক, সামাজিক ও দৈহিক উপকারে সিয়াম সাধনা বা রোজার অবদান অপরিসীম। রমজান মাস বিশ্ব মুসলিমের জন্য কাক্সিক্ষত একটি নাম। কী এক আবহ আর প্রশান্তি! রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত বলে শেষ করা সম্ভব নয়। ইহকাল ও পরকালে এর হাজারো কল্যাণময় দিক রয়েছে। বিশ্বাসী আত্মারা চায় তাদের পাপগুলো ধুয়ে মুছে যাক এই রমজানে। রমজান নামটির যেন এতেই সার্থকতা। পাপ জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম বলেই রোজার মাসের নাম রমজান। রামজুন মানেই জ্বালিয়ে দেওয়া। যেমন পাপ জ্বালিয়ে দিতে পারে তেমনি পারে রোগ জ্বালিয়ে দিতে। কারণ রোজার আছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ।
পবিত্র কুরআনুল কারিমের সুরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যার অসুখ থাকবে অথবা যে সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশির সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখো, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।’
সুরা বাক্বারার ১৮৪ নম্বর আয়াতের শেষাংশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, ‘ওয়া ইন তাছুমু খায়রুল্লাকুম ইনকুনতুম তা'লামুন’। অর্থ : ‘আর যদি রোজা রাখো তবে তা তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণময়, যদি তোমরা বুঝতে পার।’
এ আয়াতের মূল বক্তব্য পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, অবশ্যই রোজার মধ্যে শুধু পারলৌকিক নয় বরং অনেক পার্থিব কল্যাণও নিহিত রয়েছে।
হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা রোজা রাখো, তাহলে সুস্থ থাকতে পারবে।’
রোজা শুধু ধর্মীয় ফরজ ইবাদতই নয়, দৈহিক সুস্থতা লাভে রোজার ভূমিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সবার জানা থাকা জরুরি। আজকের যুগ বিজ্ঞানের। বিশ্বজুড়ে আজ বিজ্ঞানের জয়জয়কার। বিজ্ঞানের যুক্তি প্রমাণ ছাড়া কেউ কিছু মানতে চায় না। আমাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনপ্রণালি ও জীবনাচারে বিজ্ঞানের আধিপত্য মেনে নিতে হয়। আজ আমরা জানবো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোজার উপকারিতা সম্পর্কে।
১. স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. শেলটন তার ‘সুপিরিয়র নিউট্রিশন’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোাটিন, চর্বি, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টি বিধান হয়।’
২. নোবেল পুরস্কার বিজয়ী চিকিৎসাক অ্যালেকসিস বলেছেন, ‘উপবাসের মাধ্যমে লিভারে রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয়। ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোাটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারের কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। অভ্যন্তরীণ দেহযন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হৃৎপিণ্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়।’
৩. ডা. আইজাক জেনিংস বলেছেন, ‘যারা আলস্য ও গোড়ামির কারণে এবং অতিভোজনের কারণে নিজেদের সংরক্ষিত জীবনীশক্তিকে ভারাক্রান্ত করে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়, রোজা তাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে।’
৪. বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী নাস্টবারনার বলেন, ‘ফুসফুসের কাশি, কঠিন কাশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েনজা কয়েকদিনের রোজার কারণেই নিরাময় হয়।’
৫. ডাক্তার দেওয়ান এ কে এম আব্দুর রহিম বলেছেন, ‘রোজাব্রত পালনের কারণে মসিÍষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়।’
৬. স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. আব্রাহাম জে হেনরি রোজা সম্পর্কে বলেছেন, ‘রোযা হলো পরমহিতৈষী ওষুধবিশেষ। কারণ রোজা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।’
৭. পাকিস্তানের প্রখ্যাত প্রবীণ চিকিৎসক মুহাম্মদ হোসেনও একই ধরনের কথা বলেছেন। তার মতে, ‘যারা নিয়মিত রোজা পালনে অভ্যস্ত সাধারণত তারা বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত কম হন।’
৮. চিকিৎসাবিজ্ঞানী ক্লাইভ বলেন, ‘রোজার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত। সেহেতু ভারত, জাপান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ নাইজেরিয়াতে অন্যসব এলাকার তুলনায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় রোগ ব্যাধি অনেক কম দেখা যায়।’
এভাবে বিশ্বের অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী রোজার উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাদার ব্যক্তি ধূমপান না করার কারণে ফুসফুস রোগমুক্ত থাকে। পেপটিক আলসারের রোগীরা রোজা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্যও রোজা উপকারী।
ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৮-১৯৬৫ সালে রমজানে রোজা রাখার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়। তাতে সুনির্দিষ্টভাবে নিম্নোক্ত স্বাস্থ্যগত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় :
১. শতকরা ৮০ ভাগ রোজাদারের শরীরের ওজন কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়া ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। এই ধরনের ওজন হ্রাস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কারণ দেখা গেছে, মেদবহুল রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতিতে এই ধরনের প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এই ধরনের রোগীদের রমজান মাসের রাতের বেলায় এবং বছরের অন্যান্য সময় অতিভোজন ও চর্বিযুক্ত আহার থেকে বিরত থাকতে হয়।
২. পাকস্থলীর মাত্রাতিরিক্ত অম্লরস রমজান মাসে মাসব্যাপী রোজা পালনের কারণে হাইপো এবং হাইপার ক্লোরিড্রিয়া পরিবর্তিত হয়ে স্বাভাবিক অ্যাসিডিটি আইসোক্লোরিড্রিয়াতে পরিণত হয়।
রোজা রাখার কারণে পাকস্থলীতে অম্লরসের পরিমাণ কমে যায় (রাতে আহারের পর রোজা রাখা অবস্থায় খুব সকালে খালি পেটে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড নিঃসরণের মাত্রা সর্বনিম্ন হয়ে থাকে)
রমজান মাসের রোজা অতিমাত্রায় অ্যাসিডিটি নিঃসরণে সহায়তা করে; যা পেপটিক আলসার সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহের অন্যতম ।
৩. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশের মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে পেপটিক আলসার তুলনামূলক অনেক কম।
এর কারণ হতে পারে দুটি। আর তা হলো-
ক. রমজান মাসে মুসলমানদের নিয়মিত রোজা পালন এবং খ. তাদের খাদ্য তালিকায় অ্যালকোহল না থাকা ।
ডাক্তারদের মতে, রোজার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ার কারণে মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়; যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা খুব উপকারী। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধারে ১৫ দিন রোজা রাখলে বহুমূত্র রোগ উপশম হয়। রোজা চর্মরোগের জন্যও খুবই উপকারী। পুষ্টির সঙ্গে চর্মরোগের সম্পর্ক অত্যন্ত গভির। তাই চর্মরোগের কিংবা ত্বকের উপর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রোজা খুবই কার্যকর পদ্ধতি। কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে ভেবে রোজা রাখতে চান না। অথচ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, রোজা রাখলে কিডনিতে সঞ্চিত পাথরকণা ও চুন দূরীভূত হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, সারা বছর অতিভোজন, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ জমা হয়, তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক মাস রোজা পালনের ফলে তা সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়।

আহার ও নিদ্রা
ইসলাম প্রচারের চৌদ্দশত বছর পরে, বর্তমান জগতের ডাক্তার ও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, অতিভোজনকারীর জীবন স্বল্প ভোজনকারীর জীবনের চেয়ে ক্ষণস্থায়ী অর্থাৎ মোটা লোক কাজে-কর্মেও দুর্বল এবং তারা তাড়াতাড়ি মৃত্যুবরণ করে। এর কারণ নির্ণয়ে দেখা গেছে যে, মোটা লোকের শরীরে কোলেস্টরেল জমা হয়, যা হৃৎপিণ্ডের কাজের ব্যাঘাত ঘটায় এবং তাতে তাড়াতাড়ি মানুষের মৃত্যু হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা স্বল্পাহারী ছিলেন এবং অন্যকেও স্বল্পাহারের উপদেশ দিতেন, সেই সঙ্গে আবার কেউ যাতে অনাহারে না থাকে, সেদিকেও সর্বদা সুনজর রাখতেন। রোজা স্বল্পাহারের অভ্যাস করায় ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে।
ধূমপায়ীদের জন্যও রোজা একটা বিরাট উপকার করে। তাদের ফুসফুস অন্তত এক মাসের জন্য নিকোটিনের বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকে। কোষ্ঠ-কাঠিন্যের জন্যও রোজা কিছুটা সুফল আনে। একই রাতে তিনবার আহার করায় এবং ইফতারির সময় প্রচুর পানি ও শরবত পান করায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যায়।
ভারতের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধীও উপবাসের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষ খেয়ে খেয়ে স্বীয় শরীরকে অলস বানিয়ে ফেলে। আর অলস শরীর না জগতবাসীর আর না মহারাজের। যদি তোমরা শরীরকে সতেজ ও সচল রাখতে চাও তাহলে শরীরকে দাও তার ন্যূনতম আহার এবং পূর্ণ দিবস উপবাস করো।’ -(দাস্তান গান্ধী, বিশেষ সংখ্যা)।
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমল্ড নারায়াড বলেন, ‘রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্ক রোগ নির্মূল করে দেয়। মানবদেহের আবর্তন-বিবর্তন আছে। কিন্তু রোজাদারের শরীর বারংবার বাহ্যিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। রোজাদার বৈিদহিক খিঁচুনি এবং মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয় না।’
তাই আসুন, রমজানকে এমনভাবে কাজে লাগাই যাতে আমরা প্রত্যেকে বিশুদ্ধ হয়ে যাই।
[লেখক : খতিব, কলারোয়া থানা মসজিদ]

আরও পড়ুন