ব্যাটল অফ শিরোমণি

আপডেট: 02:44:05 16/12/2016



img
img
img

জিয়াউস সাদাত, খুলনা : মুক্তিযুদ্ধের শেষ সপ্তাহে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা ক্রমেই ঢাকাকে ঘিরে ফেলে। এরপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজী তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে জনসম্মুখে আত্মসমর্পণ করেন রেসকোর্স ময়দানে। ৯ মাসের জবরদখল থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ।
১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ঠিক ওই সময় একটি বৃহৎ প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা। খুলনার শিরোমণিতে পাকবাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনীর এই সম্মুখ যুদ্ধের কারণে খুলনা শত্রুমুক্ত হয় একদিন পর অর্থাৎ বিজয় দিবসের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর। শিরোমণির এ যুদ্ধকে বলা হয় ‘ব্যাটল অফ শিরোমণি’। এ যুদ্ধের অকুস্থল খুলনা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী যশোর সেনানিবাস ছাড়তে বাধ্য হয়। তারা ছড়িয়ে পড়ে খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। পাকিস্তান বাহিনীর খুলনা সদর দপ্তরের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মুহম্মদ হায়াত খান একটা বড় ব্রিগেড নিয়ে খুলনার শিরোমণি, আটরা, গিলেতলা, তেলিগাতি, দৌলতপুর ও শোলগাতিয়া এলাকার একাধিক স্থানে ক্যাম্প গড়ে তোলেন। তার মধ্যে জনশূন্য শিরোমি ণএলাকায় কমান্ডার হায়াত খান সবচেয়ে বড় ক্যাম্প গড়েন এবং মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা-মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে ৯ ডিসেম্বর যশোরের নওয়াপাড়া (অভয়নগর) মুক্ত হয়। পরদিন ১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী খুলনা অভিমুখে ফুলতলা উপজেলার চৌদ্দমাইল নামক স্থানে অবস্থান নেয়। সেখানে থেকে খুলনা মুক্ত করার কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি পাক বাহিনীকে লক্ষ্য করে ভারি অস্ত্রের গোলাবর্ষণ করতে থাকে।
হায়াত খান তার সাজোয়াঁ ও গোলন্দাজ ব্রিগেড নিয়ে খুলনা শহরের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম এলাকা জুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলেন। তাছাড়া আটরা থেকে শিরোমণি এলাকার যশোর রোডে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মাইন পুঁতে বিশেষ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচন্ড গোলাবর্ষণ করেও কোনো সাড়া না পেয়ে এবং তাদের নীরবতা দেখে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ফুলতলার চৌদ্দ মাইলে অবস্থানরত মিত্রবাহিনীর মেজর মহেন্দ্র সিং ও মেজর গণির নেতৃত্বে একটা বড় কনভয় ১৪ ডিসেম্বর খুলনার দিকে রওনা হয়। মিত্রবাহিনী খুলনার শিরোমণি এলাকার যুদ্ধক্ষেত্রে নিশানার মধ্যে পৌছালে পাকবাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। ওই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সামনে থাকা বিপুল সংখ্যক সেনা হতাহত হন। তবে বিপুল ক্ষতির পরও কিছু সংখ্যক সেনা ফুলতলার চৌদ্দ মাইল ক্যাম্পে ফিরে যেতে সক্ষম হন। সেখানে মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং, মুক্তিবাহিনীর আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর, নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল যৌথভাবে এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তখন মেজর মঞ্জুর সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর হুদাকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ কৌশল তৈরি করেন। চক্রাখালি মাধ্যমিক স্কুল থেকে মেজর জয়নাল আবেদিনের (স্বাধীনতা পরবর্তী নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার) নেতৃত্বে গল্লামারি রেডিও সেন্টার অভিমুখে আক্রমণ শুরু করেন। রেডিও সেন্টারে নিরাপত্তার জন্য অসহযোগ আন্দোলনের আগ থেকে পানজাবি সেনা মোতায়েন ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ১৭ ডিসেম্বর সকালে রেডিও সেন্টার ক্যাম্পে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সদ্য প্রয়াত লে. গাজী রহমতউল্লাহ দাদু বীরপ্রতীকের সাক্ষ্যমতে, মেজর জয়নাল আবেদীন ও তিনি সকাল ৯টায় যৌথভাবে সার্কিট হাউজে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন।
অপরদিকে, মিত্রবাহিনীর একটি ইউনিট ইস্টার্ন জুটমিল গেট এলাকা দিয়ে ভৈরব নদ পার হয়ে শিরোমণির ঠিক পুব পাশে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা পশ্চিম পাশে পাক সেনাদের উদ্দেশে গোলা ছুড়তে থাকেন। ওই সময় মেজর মঞ্জুর তার বাহিনীকে নিয়ে ১৫ ডিসেম্বর ও ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সারাদিন ধরে বিভিন্ন দিক থেকে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ করে পাক বাহিনীকে শিরোমণিতে ঘিরে ফেলেন। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও হায়াত খান তা না মেনে তার বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডো দলের প্রবল বিক্রমের মুখে পড়েন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন সেই ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট এবং চার সহস্রাধিক সৈন্য। ওই রাত থেকেই মেজর মঞ্জুরের নেতৃত্বে শুরু হয় সর্বাত্মক সন্মুখ সমর। সারারাত ধরে চলা যুদ্ধে প্রবল ক্ষয়ক্ষতির মুখে এক পর্যায়ে ১৭ ডিসেম্বর ভোরে পর্যুদস্ত পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন বিজয়ী মিত্রবাহিনী-মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শিরোমণি নসু খানের ইটভাটার কাছে পরাজিত পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করেন। ১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেলা দেড়টায় সার্কিট হাউস মাঠে লিখিত আত্মসমর্পণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এ সময় মিত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং, আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর ও নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল, পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের বেল্ট ও ব্যাজ খুলে নিয়ে আত্মসমর্পণের প্রমাণাদিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘ব্যাটল অফ শিরোমণি’ নামে খ্যাত। এখন এ যুদ্ধের কাহিনি সিলেবাস আকারে আন্তর্জাতিক মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে পড়ানো হচ্ছে।
শিরোমণি বাজার ও এর উল্টো দিকে বিসিক শিল্পনগরী ঘিরে কমবেশি চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এমন কোনো গাছ বা ভবন ছিল না যা অক্ষত ছিল। প্রতিটি গাছ ও ভবনে শত শত গুলি ও শেলের আঘাতের চিহ্ন ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত দেখা গেছে। আজো কিছু তাল গাছ এবং পুরনো বড় গাছে সে আঘাতের সাক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ওইসব গাছ-পালা ও ঘরবাড়ি দেখে মানুষ শিরোমণি যুদ্ধের ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পারতেন।
উল্লেখ্য, অফিসিয়ালি ১৭ ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত দিবস হলেও ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত খালিশপুর, শিপইয়ার্ড ও লবণচরা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পলাতক পাক সেনাদের আটক করা হয়।
দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শিরোমণির সন্মুখ যুদ্ধ খুবই উল্লেখযোগ্য। ওই যুদ্ধের স্মরণে বর্তমান সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গিলেতলা সেনানিবাসের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালের ৪ আগস্ট খুলনা-যশোর রোডের গা-ঘেঁষে গিলেতলায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এটি নির্মাণে ৫৩ লাখ টাকা খরচ হয়।
খুলনার শিরোমণি সন্মুখ যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও খানজাহান আলী থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার স ম রেজওয়ান আলী বলেন, ‘যেখানে মূল যুদ্ধ ও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেই স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। হয়েছে সেনানিবাসের সামনে। আমরা চাই, স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধক্ষেত্র এই শিরোমণিতেই একটা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।’
যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওই যুদ্ধে হতাহত মিত্রসেনার সঠিক হিসেব জানা নেই। তবে যুদ্ধে শতাধিক সেনা নিহত হয়েছিলেন।’

আরও পড়ুন