ব্রি ২৮, ৬৩-তে সর্বনাশ

আপডেট: 06:49:50 12/04/2018



img
img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : প্রান্তিক চাষি মুক্তার হোসেন। বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামে। চলতি বোরো মৌসুমে অন্যের জমি লিজ নিয়ে ১৬ কাঠা জমিতে ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছিলেন। ধার দেনা করে পরিচর্যা করা ধানে শীষও বের হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন আগে জমিতে গিয়ে দেখেন দু’একটা শীষের গোড়ায় পচন ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই তিন দিনের মাথায় জমির সব ধানের শীষ পচে শুকিয়ে চিটে হয়ে যায়। ফলে ১৬ কাঠা জমিতে এবার এক কেজি ধানও ঘরে উঠবে না তার।
একইভাবে কালীগঞ্জ উপজেলার বলরামপুর গ্রামের জাহিদ হোসেন নামে এক কৃষক ছয় বিঘা জমিতে চাষ করেছিলেন নতুন জাতের ব্রি-৬৩ ধান। মঙ্গলবার সকালে তার ধান ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায় প্রায় অর্ধেক ধানের শীষ পচে শুকিয়ে গেছে।
উল্লিখিত এই দুই জাতের ধান চাষ করা কৃষকদের এবার সোনালি স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছে। তবে কালীগঞ্জ কৃষি অফিস দাবি করছে, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এ পর্যন্ত ৩০ বিঘার মতো ধান ছত্রাকজনিত রোগে নষ্ট হয়েছে।
চলতি বছর তাদের মতো কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষকের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-২৮ ও নতুন জাতের ব্রি-৬৩ ধানে এই ছত্রাকজনিত নেক ব্লাস্ট রোগের মড়ক দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা ও কৃষকরা এখনি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ১৮ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে ইরি ধানের চাষ হয়েছে। এরমধ্যে তিন হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে ব্রি-২৮ এবং এক হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে নতুন জাতের ব্রি-৬৩ জাতের ধান।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তারা সময় মতো ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিলে এমন ক্ষতি হতো না। অনেক কৃষকের অভিযোগ, তারা কৃষি কর্মকর্তাদের চেনেনই না।
অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, এবার আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় আগে থেকে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, মসজিদে ও লোকসমাগম হয়, এমন স্থানে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ছত্রাক প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাসের কারণে ধানক্ষেতে এই মড়ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই রোগের ফলে ধানের শীষের গোড়ার সংযুক্ত স্থানে ছত্রাকের আক্রমণে কালচে বাদামি দাগ তৈরি হচ্ছে। ফলে ধান গাছ থেকে খাবার শীষে পৌঁছাতে পারছে না। যে কারণে ধানের শীষ শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। এই রোগ বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে বাজারে পাওয়া যায় এমন ওষুধ ট্রপার, এমিস্টার টপ, দিফা-৭৫ এবং ন্যাটিভো-৭৫ অনুমোদিত মাত্রায় পানির সঙ্গে মিশিয়ে বিকেলে ৫ থেকে ৭ দিনের ব্যবধানে দুই বার স্প্রে করলেই এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
উপজেলার বলরামপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, আমি এবছর ছয় বিঘা জমিতে ব্রি-৬৩ জাতের ধান চাষ করেছিলাম। ধান মাঠের সবার থেকে ভালো হয়েছিল। সম্প্রতি ধানের শীষ বের হওয়া শেষ হয়েছে। এখনো পাক ধরা শুরু করেছে।
‘এরমধ্যে গত কয়েকদিন আগে মাঠে গিয়ে দেখি বেশ কিছু ধানের শীষে পচন ধরে শুকিয়ে গেছে। কিছু কিছু জমিতে অর্ধেক ধানের শীষ শুকিয়ে গেছে। এরপর কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পর নতুন করে আর পচন ধরেনি।’
উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক সুমন হোসেন বলেন, ‘চলতি বছর আমি সাড়ে চার বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। এরমধ্যে ব্রি-২৮ ধান ছিল তিন বিঘা। গত এক সপ্তাহ আগে ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টি হয়েছিল। তখন মাঠে গিয়ে দেখি ধানের শীষে পচন ধরেছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দুই দিনের মাথায় তিন বিঘা জমিতে অর্ধেকের বেশি ধানের শীষ পচন ধরেছে। এরপর ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পর পচন আর বাড়েনি।’
একই গ্রামের দুদু মিয়া, তারিফ হোসেন, মুকুল সাহা ও আজহার আলীসহ সব কৃষকের ব্রি-২৮ ও ৬৩ ধানের এই মড়ক দেখা দিয়েছে।
উপজেলার বড়ঘিঘাটি গ্রামের আব্দুল মমিন বলেন, ‘ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগে আমার প্রায় এক বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।’
উপজেলার পাতবিলা গ্রামের রেজাউল ইসলাম বললেন, ‘কয়েকদিন আগে আমার আট কাঠা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।’
সুন্দরপুর গ্রামের কৃষক শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েকদিন আগে ঝড় বাতাস হয়েছিল। পরের দিন মাঠে যেয়ে দেখি বেশ কিছু ধানের শীষে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। আমি দেরি না করে ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পর এখন কোনো সমস্যা নেই।’
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, দিনে গরম আর রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া এই ব্লাস্ট ছড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, মসজিদ ও লোকসমাগমের স্থানে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ছত্রাক প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন যাচ্ছে বলে এই কর্মকর্তা দাবি করেন।

আরও পড়ুন