বয়স কম দায়িত্ব বেশি

আপডেট: 02:36:19 28/04/2018



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে ছোট বোন আঁখি (২)। সেবা-যত্ন করছে বড় বোন আলো (৯)। মা বাজারে কাজ করতে গেছেন। দোকানে দোকানে পানি দেওয়া আর দুই বাসায় ঝিয়ের কাজ শেষে ফিরবেন আঁখি আর আলোর মা। মা না আসা পর্যন্ত ছোট বোন আঁখিকে দেখা-শোনার দায়িত্ব আলোর। তাদের বাবা মারা গেছেস অনেক আগেই। তিন বোন আর মায়ের সংসারে ওদের। তিন বোনের বড় আলো। বয়স তেমন না হলেও পরিস্থিতির কারণে দায়িত্ব নিতে শিখেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কঠিন জীবন তাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা হয় এই দুই বোনের সঙ্গে। দায়িত্বরত চিকিৎসক শম্পা মোদক জানান,  অসুস্থ শিশুটির অব বেশস্থা এখন ভালো। আশা করা যায়, দ্রæতই সুস্থ হয়ে যাবে শিশুটি।
ডাক্তার শম্পা জানান, বৃহস্পতিবার (২৬ এপ্রিল) রাতে পেটে ব্যথা শুরু হলে আঁখিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঙ্গে হাসপাতালে আসে তার বড় বোন আলো।
আলো জানায়, এক বছর আগে তার বাবা আলম শেখ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর সংসারের হাল ধরেন তার মা। বাসাবাড়িতে কাজ করেন তিনি। এছাড়া বাজারে দশটি দোকানে তিন বেলা পানি সরবরাহও করতে হয় তাকে। এতে যা আয় হয় তা দিয়েই চলে সংসার চলে।
আলো জানায়, সে ও তার আরেক বোন আরিফা (৮) দুইজনেই উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তারা যখন স্কুলে থাকে, তখন মা ছোট বোন আঁখিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেন। স্কুল ছুটি হলে তারা দুইজন আঁখিকে দেখভাল করে।
‘মা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করে। পড়াশুনা করে একদিন ডাক্তার হবো। বাবার মতো আর কাউকে অসুখে মরতে দেবো না’- বলে আলো।
আলোর মা নাজমা কাজ শেষে হাসপাতালে এলে কথা হয় তার সঙ্গেও। তিনি জানান, কালীগঞ্জ পশু হাসপাতালপাড়ায় মাসিক ৩৫০ টাকা চুক্তিতে এক খণ্ড জমি ভাড়া নিয়ে কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি একটি খুপড়ি ঘরে তিন মেয়ে আলো, আরিফা ও আঁখিকে নিয়ে থাকেন। প্রায় ১৪ বছর আগে কুষ্টিয়ার রাহিনীপাড়ার আলম শেখের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। স্বামী পুরনো কাগজ কেনা-বেচার ব্যবসা করতেন। হঠাৎ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে গত বছর রোজার সময় মারা যান।
তিনি বলেন, ‘স্বামীর  মৃত্যুর পর জীবন-জীবিকার সন্ধানে প্রথমে উপজেলা পরিষদের কয়েকজনের রান্নার কাজ শুরু করি। কিন্তু সেখান থেকে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার চলছিল না। পরে স্থানীয় বাজারের কয়েকটি দোকানে পানি সরবরাহের কাজ নিই। এতে মাসে ৩-৪ হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকায় কোনো রকমে চলে যায় সংসার।’
‘মেয়ে দুটো পড়তে চায়। তাই তাদের স্কুলে পাঠাই। কিন্তু কতো দিন তাদের পড়াতে পারবো তা কে জানে?’ হতাশা নিয়ে বলেন বিধবা নাজমা খাতুন।
নাজমার বাবার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার গান্না গ্রামে। বাবা-মা দুইজনই জীবিত আছেন। তাদের আর্থিক অবস্থাও শোচনীয়।