ভারতে পাট রপ্তানিতে ফের বাধা

আপডেট: 02:01:09 11/01/2017



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : ভারত পাটজাত পণ্যদ্রব্য আমদানির ওপর বেশ কিছু জুটমিলের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশ থেকে পাটের তৈরি জিনিসপত্র ভারতে রফতানি হুমকির মুখে পড়েছে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাটজাতদ্রব্য রফতানি অনেকাংশে কমে গেছে।
ভারত সরকার বাংলাদেশি পাটজাত পণ্যে নতুন করে উচ্চ হারে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করার পর এর বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। নতুন করে শুল্ক আরোপের আগের এলসির পণ্য ভারতে যাচ্ছে। নতুন কোনো পণ্য যাচ্ছে না। ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাটজাত পণ্য রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এদিকে ভারতে ঢোকার অপেক্ষায় বেনাপোল চেকপোস্টে আটকে পড়েছে কয়েকটি রপ্তনি পণ্যবাহী ট্রাক। তবে এ পথে কাঁচা পাটসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি স্বাভাবিক রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসেবে, বাংলাদেশ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৯১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছে। এর ২০ শতাংশ গেছে ভারতে; যা সেখানকার বাজারের প্রায় ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশি উৎপাদকরা পাট রপ্তানিতে দশ শতাংশ নগদ সহায়তা পাওয়ায় ভারতীয় পাট মার খাচ্ছে বলে অভিযোগ এনে দেশটির অ্যান্টি-ডাম্পিং অ্যান্ড অ্যালাইড ডিউটিজ (ডিজিএডি) অধিদপ্তর গত অক্টোবরে বাংলাদেশ ও নেপালের পাটজাত পণ্যে প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতে গত ৫ জানুয়ারি ভারতের রাজস্ব বিভাগ অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের গেজেট প্রকাশ করে। সেখানে ৪৩টি জুট মিলের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। এর মধ্যে ১৮টি নেপালের ও ২৫টি বাংলাদেশি জুটমিল রয়েছে।
গেজেটে বলা হয়, বাংলাদেশের কোনো জুটমিল ভারতে পাটসুতা, চট ও বস্তা রপ্তানি করতে চাইলে প্রতি মেট্রিক টনে ২০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ৬০০ থেকে ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। আগে মাত্র শতকারা চার ভাগ শুল্ক ছিল এসব পণ্যে। যেটা রিফান্ড নিতেন ভারতীয় আমদানিকারকরা।
ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি কমে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর ভারতে প্রায় দুই লাখ টন পাটসুতা, বস্তা ও চট রফতানি করে আসছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে পাটসুতার পরিমাণ দেড় লাখ টনের বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতোদিন তারা ৮০০ থেকে ৯০০ ডলারে প্রতি টন পাটসুতা রপ্তানি করে আসছিলেন। এর সঙ্গে নতুন হারে শুল্ক যোগ হলে যে দাম দাঁড়াবে তাতে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার ডেমরা এলাকার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের প্রতিনিধি বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, গত সপ্তাহে তাদের প্রতিষ্ঠানের ২৯ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্যের একটি চালান রপ্তানি করতে শুল্ক পরিশোধ করতে হয়েছে ৮৫ হাজার রুপি। বর্তমানে ওই একই পরিমাণ পণ্য রপ্তানিতে এন্ট্রি ডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে তিন লাখ ৭০ হাজার রুপি। এতে এখন আর কোনোভাবেই নতুন চালান রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। আগে এলসি করা ছিল এমন কিছু পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। দ্রুত বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
খুলনার এমএম জুট ফাইবারস, মুন ইন্টারন্যাশনাল জুটমিলস, প্রবাল শিপিং লাইন্সসহ অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আগে খোলা ঋণপত্র অনুযায়ী পণ্য বেনাপোলে আসার পর ভারতীয় কাস্টমস আটকে দেয়। আগের ঋণপত্র দেখে সেগুলো নিয়ে নেন তারা। নতুন করে আর কোনো পণ্য তারা গ্রহণ করছেন না।
মুন ইন্টারন্যাশনাল জুটমিলসের প্রতিনিধি জাহান আলী জানান, এই হারে শুল্ক দিয়ে আগের মূল্যে পণ্য পাঠালে ৬০ টন পাটসুতায় তাদের লোকসান হবে ২০ লাখ টাকা।
প্রবাল শিপিংলাইন্সের প্রতিনিধি মহসিন আলী বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক পাটকল ভারতে রপ্তানির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। উচ্চ হারে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের ফলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
বেনাপোল কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। আর এ পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত। সেই বাজারে পাঁচ বছরের জন্য এই শুল্ক আরোপ করা হলো। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেনাপোল বন্দর দিয়ে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত ভারতে রপ্তানি হয়েছে ১০৬ ট্রাক। এর মধ্যে রোববার দশ ট্রাক, সোমবার ১৬ ট্রাক ও মঙ্গলবার দশ ট্রাক পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস কার্গো শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা (সুপার) আব্দুস ছামাদ জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তারাই বিষয়টি দেখছেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আগে যেখানে প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শ ট্রাক পাটজাত পণ্য ভারতে যেত, সেখানে নতুন শুল্কের গেজেট প্রকাশের পর পাটপণ্য রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।’
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের পাট কমিশন ‘বাংলাদেশ থেকে প্রতি চালান পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানির আগে কমিশন থেকে এনওসি (অনুমতিপত্র) নিতে হবে’- নতুন করে এই প্রজ্ঞাপন জারি করে পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
তার আগে ২০১২ সালের ৪ মে ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি মূল্য আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের অজুহাতে চার শতাংশ কাউন্টারভেলিং শুল্ক আরোপ করে পাট ও পাটের তৈরি জিনিসপত্র ভারতে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পাট পণ্যের ওপরে হঠাৎ করে ১৫ ভাগ প্রতিযোগী শুল্ক (কাউন্টার ভেলিং ডিউটি) আরোপ করায় বেনাপোল দিয়ে পাট পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৬ সালে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাসায়নিক পরীক্ষার নামে পাটের তৈরি চট ও সুতলি ভারতে রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার।
এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তুলা, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, সুপারি, গম, আটা, ময়দা ও চিনি আমদানি-রপ্তানির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে ভারত।