ভারত-পাকিস্তান কি এবার সত্যিই যুদ্ধে জড়াতে পারে?

আপডেট: 02:28:21 25/02/2019



img

রঞ্জন বসু, দিল্লি : ঠিক ১০ দিন আগে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ৪০ জনেরও বেশি ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে যে প্রশ্নটা বারবার ঘুরেফিরে আসছে তা হলো—  পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সত্যিই কি এবার একটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হবে? সামরিক পথেই কি একটা এসপার-ওসপার করার রাস্তায় হাঁটবে এই দুই দেশ?
আত্মঘাতী হামলার ঠিক পর পরই এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ, যাদের মূল ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণ শিবির পাকিস্তানের মাটিতেই। তাদের পক্ষ থেকে সন্দেহভাজন হামলাকারীর আগে থেকে রেকর্ড করা একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে বিবৃতি দিতে দেরি করেনি ভারতও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেদিনই জানিয়ে দেন— এই আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে ভারতের সেনাবাহিনীকে ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হয়েছে।  ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ভারতকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, আর সে দেশের সেনাবাহিনীও জানিয়ে দেয়— তারা যুদ্ধ চায় না ঠিকই, কিন্তু ভারত আক্রমণ করলে তারা যেন ‘চমকে দেওয়ার মতো’ জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকে। 
এরইমধ্যে শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, পুলওয়ামার ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিস্থিতি অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক’ মোড় নিয়েছে এবং ভারত যে এই হামলার ‘খুব কড়া জবাব’ (ভেরি স্ট্রং রেসপন্স) দিতে চাইছে, সেটা তিনি অনুধাবন করতে পারছেন। এই স্ট্রং রেসপন্স বলতে তিনি যুদ্ধই বোঝাচ্ছেন কিনা, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনাও।
এই পটভূমিতে পুরোদস্তুর একটা যুদ্ধের সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? সামরিক সংঘাত হলেও তা কোন আকারে হতে পারে? পরমাণু যুদ্ধের কি কোনও আশঙ্কা আছে?
এসব নিয়েই বাংলা ট্রিবিউন কথা বলেছে দিল্লিতে চার জন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে,  যারা কেউ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, কেউ স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্স বা প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক। তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো:
লে. জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতা হাসনাইন
তামিলনাডুর ওয়েলিংটনে ভারতের যে ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ আছে, তার লোগোটা খুব প্রতীকী, একটা স্ক্রলের ওপর বসে থাকা প্যাঁচা। আর নিচে লেখা আছে ‘যুদ্ধম প্রজ্ঞা’, যে শব্দবন্ধটা এসেছে একটা ল্যাটিন কথা থেকে। মানেটা খুবই সহজ, যুদ্ধ করতে হবে প্রজ্ঞার সঙ্গে।
ভারতে অনেকেই এখন বলছেন, এক কোটি ৩০ লাখ সেনাকে নিয়ে গঠিত আমাদের সামরিক বাহিনী, তার পরও যুদ্ধের জন্য কেন ঝাঁপিয়ে পড়ছি না? আমি বলবো, এর চেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা কিছু হতে পারে না। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো পর্যন্ত জরিপ করছে— এখন যুদ্ধ শুরু করা উচিত কিনা। আর কাদের কাছে মতামত চাওয়া হচ্ছে? যাদের যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
আসলে এই ২০১৯ সালে এসে যুদ্ধের সংজ্ঞাটাই পুরোপুরি বদলে গেছে। রাশিয়া যেভাবে ইউক্রেনে তাদের যুদ্ধটা জিতে নিচ্ছে, সেটা হলো ‘সাইবার, সাইকোলজিকাল ও ইনফ্লুয়েন্স ওয়ারফেয়ারে’র সাহায্যে। পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে ঠিক সেই কৌশলই প্রয়োগ করতে চাইছে, আর আমার ধারণা ভারতও দীর্ঘমেয়াদে সেই পথেই হাঁটতে চাইবে।
তবে ২০১৬ সালের উরি হামলার পর ভারত যে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করেছিল, সামনে তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। কিন্তু তাতে অনেক সমস্যাও আছে। ভারত হয়তো এবারে চেষ্টা করবে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আরও ভেতরে ঢুকতে, সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে, কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে। সবগুলোতেই কোনও না কোনও ঝুঁকি আছে, কিন্তু সবদিক বিবেচনা করে ভারতীয় নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত ‘প্রজ্ঞার সঙ্গে’ একটা কঠিন সিদ্ধান্ত বোধহয় নিতেই হবে।
ধ্রুব জয়শঙ্কর (ফেলো ইন ফরেন পলিসি স্টাডিজ, ব্রুকিংস ইন্ডিয়া)   
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হলো— তাদের এখানে ডিল করতে হচ্ছে এমন এক প্রতিবেশীর সঙ্গে যারা পরমাণু শক্তিধর দেশ এবং যাদের পরমাণু অস্ত্রসম্ভার বেড়ে চলেছে উদ্বেগজনক গতিতে। তা ছাড়া পাকিস্তান বারে বারেই বুঝিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধে বিন্দুমাত্র কোণঠাসা হলে তারা পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগে এতটুকুও দ্বিধা করবে না। নিউক্লিয়ার ডেটারেন্টকে তারা এভাবেই কাজে লাগিয়ে এসেছে এত বছর ধরে।
তার পরেও মনে রাখতে হবে, ১৯৯৯ সালে দুই দেশের মধ্যে যে কার্গিল সংঘাত হয়েছিল সেটা কিন্তু ‘সাব-নিউক্লিয়ার অপশনেই সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ ততদিনে পরমাণু শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও কোনও দেশই যুদ্ধকে সেই মাত্রায় নিয়ে যায়নি। ফলে আবারও দুদেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে, তা পরমাণু সংঘাতে না-ও যেতে পারে, এমনটা বিশ্বাস করারও কিছুটা কারণ আছে।
পাশাপাশি ভারত আরও কিছু সামরিক পদক্ষেপ নিশ্চয় নেবে— যেগুলোকে বলা যেতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। যেমন, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি আমদানি করে ভারত কাশ্মীর সীমান্তে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অনেকটা সফল হয়েছে। সেগুলোর আরও সম্প্রসারণ হবে অবধারিতভাবে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতের দিক থেকে ‘সম্পূর্ণ নজিরবিহীন’ ও ‘সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত’একটা রেসপন্স যে কোনও সময় আসতে পারে। আর আমি অন্তত তাতে খুব একটা অবাক হবো না!
জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী (সাবেক ভারতীয় সেনাপ্রধান)
কাশ্মীরে যে লড়াইটা ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে সেটা কোনও প্রথাগত বা কনভেনশনাল যুদ্ধ নয়, বরং এটাকে বলা যেতে পারে ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ। এটা শুরু করেছিলেন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউল হক। মূলত একাত্তরের যুদ্ধে তাদের হেরে যাওয়ার বদলা নিতে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভারতকে সেই ছায়াযুদ্ধের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে ছায়াযুদ্ধ দিয়েই।
মানে অন্যভাবে বললে, পাকিস্তান যেভাবে এই যুদ্ধে তাদের ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’দের কাজে লাগাচ্ছে ভারতকেও সেই একই রাস্তায় হাঁটতে হবে। আমি নিশ্চিত, কনভেনশনাল যুদ্ধের পাশাপাশি এই অপশনটা নিয়ে ভারতীয় নেতৃত্বের মধ্যেও এখন সিরিয়াস ভাবনাচিন্তা শুরু করা দরকার এবং হয়তো তা এরইমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে।
মানে পাকিস্তান যেমন ভারতের মাটিতে আত্মঘাতী হামলা ঘটাচ্ছে, তেমনি ভারতও হয়তো চাইবে সেনাবাহিনী বা সরকারি এজেন্সিগুলোর বাইরের ‘এলিমেন্ট’গুলোকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের মাটিতেও একই জিনিস ঘটাতে। এতে হয়তো অনেক পশ্চিমা দেশের সমর্থন আমরা হারাবো, কিন্তু তাতে কী-ই বা এসে যায়? এই সমর্থন থেকেও তো বিশেষ লাভ হচ্ছে না, কাজেই আমার ধারণা ভারতও ইটের জবাব পাটকেল দিয়েই দিতে চাইবে।
অজয় শুক্লা (ভারতীয় সাবেক কর্নেল, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কলামনিস্ট)  
আমার ধারণা, যুদ্ধ আদৌ হবে কিনা বা হলেও কতটা ব্যাপক আকারে হবে, তা অনেকটা নির্ভর করছে পাকিস্তান এখন কিভাবে জইশ-ই-মহম্মদকে ট্যাকল করে, তার ওপর। তারা যদি সত্যিই জইশের কার্যালয় বা ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা নেয়, তাহলে কিন্তু বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
আসলে জইশের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই- এর সম্পর্কটা একটু বিচিত্র। কাশ্মীরকেন্দ্রিক অন্য যে সংগঠনটি পাকিস্তানে কার্যকলাপ চালায়, সেই লস্কর-ই-তৈয়বা কিন্তু সেনাবাহিনীর কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। লস্কর নেতারা আইএসআইয়ের নির্দেশ বিনা প্রশ্নে মেনে নেন, অথচ জৈইশের ক্ষেত্রে সে কথা একেবারেই খাটে না। ২০০৩ সালে তো জৈইশ দু-দুবার তখনকার পাকিস্তানি সেনাপ্রধান তথা সামরিক শাসক পারভেজ মোশারফের ওপর বিধ্বংসী হামলাও চালিয়েছিল।
তার পরেও এতদিন জৈইশের কার্যকলাপে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মোটামুটি চোখ বন্ধ রেখেই নীরব প্রশ্রয় দিয়েছে। কারণ, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে জৈইশের কাজকর্মে তাদের সুবিধেই হচ্ছিল। দক্ষিণ কাশ্মীরে সবচেয়ে শক্তিশালী যে জঙ্গি সংগঠন, সেই হিজবুল মুজাহিদিন আবার বিশ্বাস করে আত্মঘাতী হামলা চালানো ইসলাম বিরোধী। কাজেই কাশ্মীরে সুইসাইড অ্যাটাক চালাতে হলে জৈশ-ই ছিল পাকিস্তানের বড় ভরসা।
ফলে পুরোপুরি মতের মিল না হলেও শত্রুটা যেহেতু অভিন্ন, তাই এতদিন আইএসআই ও জৈশ-ই-মহম্মদ মোটামুটি পাশাপাশিই থেকেছে। পুলওয়ামার জেরে সেই সমীকরণে কোনও চিড় ধরে কিনা, আমার মতে সেটা ভারত-পাকিস্তান সম্ভাব্য সংঘাতের রূপরেখাটাও অনেকটা স্থির করে দেবে!    

 


 


আরও পড়ুন