ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার

আপডেট: 02:22:48 06/12/2017



img
img
img

মৌসূমী নিলু, নড়াইল : সেই খরস্রোতা চিত্রা নদী আর নেই। নড়াইল শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীর দু’কূল চিত্র বা ছবির মতো সাজানো আর সুন্দর ছিল বলেই এই নদীর নাম হয়েছে এই চিত্রা।
সময়ের ফেরে নদীর পারে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। দূষণের করাল গ্রাস আর স্রোতের গতিপথে বাধা দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করায় কোথাও কোথাও নৌকা চলার মতো নাব্যও হারিয়েছে চিত্রা। কিন্তু সময়ের সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছে চিত্রা পাড়ের সংগ্রামী জেলেরা; যাদের অনেকেই আজো ভোঁদড় ব্যবহার করে মাছ ধরেন।
চিত্রা পাড়ের নড়াইল জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ভোগরা, রতডাঙ্গা, পঙ্কবিলাস আর গোয়ালবাড়ির জেলেদের মধ্যে ভোঁদড়ের ব্যবহার বেশি। প্রাকৃতিকভাবে নড়াইল ছাড়াও খুলনা, সিলেট এবং পাবর্ত্য অঞ্চলে ভোঁদড় পাওয়া যায়। বাংলাদেশে মোট তিন প্রজাতির ভোঁদড় দেখা যায়, যাদের বেশীরভাগই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। ভোঁদড় হলো উদ্বিড়াল জাতীয় জন্তুবিশেষ।
ভোঁদড়ের প্রিয় খাদ্য মাছ। তবে মাছ ছাড়াও বিভিন্ন জলজ প্রাণী শিকারে পটু এরা। বসবাস জলাশয়ের পাশে বনজঙ্গলে। জলাশয়ের গতিপথ পরিবর্তন, বনজঙ্গল ধ্বংস করে নদীর পারে বসতি নির্মাণ, কারেন্ট জালে মাছ শিকারের সময় ধরা পড়া ভোঁদড় মেরে ফেলার কারণে এই প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রাণীটিকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও স্থানীয় মানুষের নানা কুসংস্কার আর অসচেতনতার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এই ভোঁদড়। পুকুরের মাছ খেয়ে ফেলবে এই ভয়ে অনেকেই লোকালয়ের আশেপাশের ভোঁদড় মেরে ফেলতে উদ্যত হন।
পোষা ভোঁদড়ের সাহায্যে নড়াইলের অনেক জেলে এখনো মাছ শিকার করেন। প্রবীণদের মতে, ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নড়াইল এবং সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরার কাজে ভোঁদড় ব্যবহার করা হয়।
প্রভুভক্ত এই স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখতে অনেকটা বিড়ালের মতো। এই প্রাণীকে মাছ ধরতে নামানোর আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে নেওয়া হয়। প্রশিক্ষিত ভোঁদড় জাল থেকে মাছ খায় না। বরং মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে জালের দিকে নিয়ে আসে। পুকুর, বিল কিংবা খরস্রোতা নদীতে দক্ষভাবে মাছ ধরতে পারে এরা।
অক্টোবর থেকে জানুয়ারি- এই সময়ে নড়াইল, খুলনাসহ সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার জেলেরা ভোঁদড় ব্যবহার করে নদী থেকে মাছ ধরেন। মাছ ধরার জন্য জেলেরা সাধারণত দলে ভাগ হয়ে নেন। প্রতিটি দলে তিন থেকে পাঁচজন জেলে, একটি জাল এবং কম পক্ষে তিনটি ভোঁদড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিটি দলে দুটি পূর্ণবয়স্ক এবং একটি কমবয়সী ভোঁদড় থাকে। প্রশিক্ষিত বয়স্ক ভোঁদর দুটিকে সাধারণত খুঁটির সঙ্গে দড়িতে বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হয়। কমবয়সী ভোঁদড়টিকে মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে মূলত একটি ত্রিভুজাকৃতি ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। বয়স্ক ভোঁদড় দুটিকে দড়ির মাধ্যমে সময়ে সময়ে টান দিয়ে তাড়া দেওয়া হয়, ফলে এরা মাছের ঝাঁককে জালের দিকে তাড়া করে। মাছ ধরা শেষ হওয়ার পরে জাল গুটিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি দড়ি ধরে ভোঁদড়গুলোকেও নৌকায় নিয়ে আসা হয়। শিক্ষানবিশ ছোট ভোঁদড়টিকেও টোপ দিয়ে তুলে আনা হয়।
মাছ ধরে আনার পরে পুরস্কার হিসেবে ছোট ছোট মাছ ভোঁদড়দের দিয়ে দেওয়া হয়। মূলত এর মাধ্যমেই ভোঁদড়গুলো মানুষের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠে। সহজ কথায়, এভাবেই বন্য ভোঁদড় ধীরে ধীরে পোষ মানানো হয়।
নড়াইলের অনেক জেলে পরিবারের নিয়মিত সদস্য প্রাণীটি। জলাশয়গুলোতে মাছ কমে আসার ফলে বংশানুক্রমে ভোঁদড় পালন করে আসা জেলে পরিবারগুলোতে এখন বাজছে বিচ্ছেদের সুর। অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন। অনেকেই পরিবার ভোঁদড় পালনের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীর চামড়ার মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় পাচারকারী চক্র বেশ সজাগ দৃষ্টি রাখে জেলেদের উপর। জেলেদের অনেকেই তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দামে বিক্রি করে দেন ভোঁদড়।