ভোটের প্রচারে খালেদার অনুপস্থিতি কী প্রভাব ফেলবে

আপডেট: 02:52:34 03/12/2018



img

কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কারাভোগরত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া তিনটি মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়ে গেছে।
দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে খালেদা জিয়ার তিনটি আসনেই মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর আগে সর্বোচ্চ আদালতের এক রায়েও নিশ্চিত হয়ে যায় যে দুই বছরের বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড হওয়ায় খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
কিন্তু ভোটের মাঠে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলবে? তার অনুপস্থিতিকে কি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে বিএনপি? এসব প্রশ্ন নিয়ে কথা হয় বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মী-সমর্থক ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে।
বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হলেও তারা বলছেন, এই নির্বাচনকে আন্দোলন হিসেবে নিয়ে তারা শেষ
পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকতে চান।
বগুড়া থেকে বিএনপির একজন নেতা শিপার আল বখতিয়ার বলছিলেন, নেত্রী নির্বাচনের আগে মুক্তি পাচ্ছেন না, এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই তারা নির্বাচনী মাঠে কাজ করছেন।
তার কথায়, "আমরা তো একটু হতাশ হয়েছি। তারপরও বাইরের খালেদা জিয়ার চেয়ে জেলখানার খালেদা জিয়া এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। এই শক্তিটাই আমরা নির্বাচনে কাজে লাগাবো।"
দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরেও বিএনপির ভালো অবস্থান রয়েছে। সেখান থেকে দলটির একজন নেত্রী শামসুন্নাহার পান্না বলেছেন, নেত্রীর মুক্তির বিষয়কে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে নিয়ে তারা ভোটারদের কাছে যাবেন।
"আমরা তৃণমূলে আমাদের ম্যাডামের এই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার কারণে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। এবং নির্বাচনটা আমাদের আন্দোলনের একটা অংশ। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার অংশ হিসেবে আমরা তৃণমুলের নেতা-কর্মীরা এই নির্বাচনকে নিয়েছি," বলছেন শামসুন্নাহার পান্না।

'নেতৃত্বশূন্যতার জায়গাটা অনেকটাই পূরণ করেছে ঐক্যফ্রন্ট'
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক রিয়াজউদ্দিন আহেমদ বলছেন, এমন যে হবে তা যদিও আগেই আঁচ করেছিলেন সবাই, কিন্তু তবু এর কিছুটা প্রভাব পড়বেই।
তিনি বলছেন, "একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তো আছেই। কারণ এর আগের নির্বাচনগুলোতে তিনি বিএনপির নেত্রী হিসেবে মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু এবার যে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না, তা বিএনপির নেতৃত্ব এবং সমর্থকদের মধ্যে একরকম জানাই ছিল। এটা জেনেই কিন্তু তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে।"
"তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটের হিসেবে তেমন বড় কিছু না হলেও ইমেজের দিক থেকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব বিএনপিকে একটা দাঁড়ানোর জায়গা দিয়েছে, এবং মানুষের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, বিএনপি নেতৃত্বশূন্য নয়, তারা নির্বাচনে জিতলে দেশের জন্যে ভালো হতে পারে।"
"নেতৃত্বশূন্যতার জায়গাটা তারা অনেকটা পূরণ করেছেন বলেই আমি মনে করি," বলেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ।
বেশ কয়েকটি জেলায় বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, দলটির তৃণমূলের নেতারা ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে ভোটের প্রচারণায় কাজে লাগাতে চাইছেন। এবং তারা ভোটের মাঠ ছেড়ে দিতে রাজি নন।
বিএনপির মধ্যম সারির নেতাদের প্রতিক্রিয়াও একই রকম। দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী রুমিন ফারহানা মনে করেন, ভোটাররা তাদের বক্তব্য গ্রহণ করবে।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছিলেন, নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি তাদের দলে প্রভাব ফেললেও অন্য দিক থেকে তাদের আবেগের পাশে ভোটাররা দাঁড়াবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
"বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির একটা প্রভাব পড়বেই, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। একইসাথে এই যে অন্যায়ভাবে তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক করে রাখা হচ্ছে এবং বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীকে আটক করে রাখা- এটার একটা আবেগও সৃষ্টি হয়েছে। সারাদেশে এই আবেগের কারণেই একটা জোয়ার সৃষ্টি হবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি," বলেন মি. আলমগীর।
বিশ্লেষক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলছেন, বিএনপির নেতারা তাদের ভাষায় 'ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে' খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনার মতো আবেগপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে কর্মীদের একত্রিত করছেন।

সরকারি দল কি কোনো সুবিধা পাবে
সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের প্রশ্নের জবাবে রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি বা আওয়ামী লীগের মতো দলগুলোর মূল শক্তি হলো তৃণমূল স্তরে তাদের জন্য অকুণ্ঠ জনসমর্থন।
তার মতে, "নেত্রী থাকলে যা হয়, না থাকলেও ভোটটা একভাবেই হয়। ভোটের গাণিতিক হিসেবে কোনো পরিবর্তন হয় না।"
"খালেদা জিয়া থাকলে ভালো হতো। নেতানেত্রীদের মধ্যে উদ্দীপনা-উচ্ছ্বাস থাকতো। কিন্তু তারা একেবারে হতাশ হযে ভেঙে পড়বেন, অবস্থাটা এরকম না।"
রিয়াজউদ্দিন আহমেদের কথায়, ''সরকার হয়তো ভেবেছিল যে বিএনপি খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তছনছ হয়ে যাবে, উঠে দাঁড়াতেই পারবে না। কিন্তু সেটা বোধহয় হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে তা কিছুটা হলেও 'রিকভার' করেছে।''

প্রচারাভিযানে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির কী প্রভাব পড়বে
খালেদা জিয়া নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না, সম্ভবত প্রচারাভিযানেও অংশ নিতে পারবেন না। এ বাস্তবতায় উপদলীয় কোন্দল বা বিভক্তি ঠেকানোর জন্য তার উপস্থিতি যে ভূমিকা পালন করতো, তার কী হবে?
জবাবে রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, "বিদ্রোহী প্রার্থী, উপদলীয় কোন্দল এগুলো খালেদা জিয়া বাইরে থাকলেও হয়েছে। তাই এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।"
[বিবিসির বিশ্লেষণ]