ভোটের বার্তা আর মামলার ফয়সালা

আপডেট: 02:59:02 24/12/2017



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : চায়ের দোকান থেকে রাজনীতির অন্দরমহল। সর্বত্র আলোচনায় ইস্যু এখন দুটি ‘কী’। বৃহস্পতিবার হয়ে যাওয়া রসিক নির্বাচন ভোটের রাজনীতির জন্য কী বার্তা নিয়ে এসেছে- সে হিসাব মেলাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। আলোচনায় রয়েছে আরেকটি ‘কী’ও। সেটি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা প্রসঙ্গে। এ মামলায় ‘কী’ হবে এখন সেদিকেই দৃষ্টি রাজনীতির তাবৎ খেলোয়াড়ের। কারণ সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়ে যেতে পারে।
এরশাদের উত্থানের পর থেকে রংপুরের রাজনীতির হিসেব সবসময়ই আলাদা ছিল। এই স্বৈরশাসকের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সারা দেশের মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু রংপুরে তিনি বরাবরই ছিলেন অজেয়। গত কয়েক বছরে অবশ্য সে প্রবণতা বেশ কমে আসছিল। জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এসব এলাকায় প্রভাব বাড়ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এরশাদ ম্যাজিক উধাও হয়ে যাওয়ার লক্ষণও ছিল স্পষ্ট। কিন্তু শেষ বয়সে এসে রংপুরে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ালেন এরশাদ। তার মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীকে। ভোটের আগেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে জোয়ার এসেছিল। কিন্তু ভোটের বিশাল ব্যবধান অনেককে বিস্মিত করেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন অবশ্য প্রশংসা কুড়িয়েছে। পুরো নির্বাচনেই তেমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এখন প্রশ্ন ওঠেছে, এ নির্বাচনে ভোটের হিসেবনিকেশ জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বিস্তার করবে কি-না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায় সবাই একমত যে, বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে রংপুরের ভোটের হিসেব মেলানো ঠিক হবে না। যদিও সার্বিকভাবে রংপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোট কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আবার জাতীয় পার্টির পাশাপাশি বিএনপির ভোটও গত নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে।
এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রায় এক যুগ ধরেই আদালতে যাওয়া-আসার মধ্যে রয়েছেন। জরুরি অবস্থার সময় তাকে কারাভোগও করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো মামলাতেই এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয়নি। এই প্রথম খালেদা জিয়ার একটি মামলা একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বড় কোনো ব্যতিক্রম না ঘটলে চলতি মাসেই এ মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হবে। এরপর সহসাই ঘোষিত হতে পারে রায়। খালেদা জিয়ার এ মামলা ঘিরে এরইমধ্যে রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তার আদালতে হাজিরাকে ঘিরে শোডাউনের চেষ্টা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। লাঠিপেটা আর গ্রেফতারেরও শিকার হচ্ছেন তারা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী হবে এ মামলার রায়? সাজার রায় হলে খালেদা জিয়াকে কি কারাগারে যেতে হবে? কাশিমপুরে ধোঁয়ামোছার গুজব এরইমধ্যে চাউর হয়েছে। এ মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়া কি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন? নিম্ন আদালতে রায়ের পরপরই কেউ নির্বাচনে অযোগ্য হন কি-না এ নিয়ে অবশ্য আইনি বিতর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকেই দুটি মত। আইন বিশেষজ্ঞদের একদল মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঘোষিত রায়ই চূড়ান্ত। আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার আগে নির্বাচনে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়টি আসবে না। অন্যদিকে, আরেক দল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নিম্ন আদালতের রায়ের পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যাবেন। তবে রায় উচ্চ আদালতে স্থগিত হলে ওই ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা থাকবে না।
বিএনপি কি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে, অথবা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে, সে আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে এখন এ আলোচনাও হচ্ছে- দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে রায় গেলে বিএনপি কী করবে। তার অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্বওবা থাকবে কার হাতে। এ আলোচনাও অবশ্য রয়েছে, রায় বিরুদ্ধে গেলেও খালেদা জিয়াকে হয়তো কারাগারে যেতে হবে না। হাইকোর্টে জামিন চাওয়ার সুযোগ থাকবে তার সামনে। সে যাই হোক, খালেদা জিয়া যদি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম না থাকেন সেক্ষেত্রে বিএনপিকে নেতৃত্ব সংকটও মোকাবিলা করতে হবে। কারণ দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমানের সহসাই দেশে ফেরার সুযোগ বা সম্ভাবনা কোনোটাই নেই। যদিও বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, ওই পরিস্থিতিতেও দলে নেতৃত্বের কোনো সংকট হবে না।
রসিক নির্বাচন ঘিরে চলমান আলোচনা হয়তো স্থায়ী হবে না। সামনে আরো বেশ কয়েকটি সিটি নির্বাচন রয়েছে। দ্রুতই সেদিকে চলে যাবে নির্বাচনী রাজনীতির আলোচনা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার মামলা ঘিরে চলমান হিসেবের সহসাই মীমাংসা হবে না। রায় যাই হোক না কেন এর প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
[মানবজমিনের বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন