ভ্রমণ : সাতক্ষীরার সাংবাদিকদের কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন

আপডেট: 03:27:00 18/11/2016



img

আবুল কাসেম

চান্দের গাড়ি যখন সাঁ সাঁ করে ভয়ঙ্কর স্বপ্নীল আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তায় চলছিল, রোমাঞ্চ আর থ্রিলিংয়ের মহড়া চলছিল শরীরজুড়ে। পাহাড়ি রাস্তার মোড়গুলোর কোথাও কোথাও ১৮০ ডিগ্রি টার্ন। মাঝে মাঝে নিজের সাহসের ব্যারোমিটার পরীক্ষার জন্য জিপের গ্লাস দিয়ে নীচের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ততক্ষণে হলিউড-বলিউডের সিনেমার মতো জিপগুলো পাহাড় থেকে পাল্টি খেতে খেতে ভেতরে থাকা মানুষগুলোর ইহলীলা সাঙ্গ হওয়ার কল্পনায় শিরদাড়া খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া পাহাড়ি রাস্তার সবখানে সেফটি ওয়াল নেই। শেষমেশ সিদ্ধান্তই নিলাম, নিচের দিকে কম তাকানোই ভালো। শিলিগুড়ির ঝালাপাহাড় ক্যান্টনমেন্ট থেকে রহস্য আর রোমাঞ্চের দার্জিলিং শুরু। যার শেষ হয়েছে ৯০ কিলোমিটার দূরে টাইগার হিলের কাঞ্চনজঙ্ঘার নিকটে।
সমতলভূমি থেকে সাত হাজার ফুট উচ্চতার শৈলশহর দার্জিলিং। ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকৃষ্ট করবার সব উপাদানে সমৃদ্ধ একটি স্বাস্থ্যকর শহর। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইংরেজ সেনা অফিসার লয়েডের পরিকল্পনায় পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে চোখ ধাঁধানো এশহর। পাহাড়, মেঘ আর সবুজের সমারোহ, অন্যদিকে গুর্খাদের বৈচিত্র্যময় জীবন দার্জিলিংকে দিয়েছে পর্যটন জেলার সুনাম। মাঝে মাঝে লেকের স্বচ্ছ পানি দেখে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করবে সবার। তাছাড়া মেঘের ওপর এতবড় একটা শহর দেখে ঘোর কাটবে না অতি সহজে। অসংখ্য ঘরবাড়ি। জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। প্রধান ভাষা নেপালি। পাহাড়ের মাঝে বসতি। নীচ থেকে উপরের বাড়িগুলোকে ক্ষুদ্র দেখায়। অনুরূপ ওপর থেকে নীচের বাড়িগুলোকেও ছোট ছোট দেখায়। তবে রাতের দার্জিলিং এক অনন্য শোভায় শোভিত।
সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির দশ সদস্য বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা গৌতম ঘোষের আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম ভারত ভ্রমণে। পরে জেনেছি, আমাদের ভারত ভ্রমণের খবরটি বাংলানিউজ, পত্রদূত, সুবর্ণভূমিসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে এসেছে। নভেম্বরের চার তারিখ শুক্রবার দুপুরের দিকে প্রেসক্লাব থেকে সহকর্মী সদস্যরা আমাদেরকে বিদায় দিলেন। ভোমরা ইমিগ্রেশন পার হয়ে বশিরহাট থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় রওনা হলাম। স্টেশনে সত্তরোর্ধ্ব এক সিনিয়র সিটিজেনের সমতলভূমি থেকে বেশ নীচ দিয়ে যাওয়া ট্রেনলাইন পার হয়ে ওপারে যাওয়ার দৃঢ়তা বেশ মুগ্ধ করল। তাছাড়া ট্রেনে প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের সংরক্ষিত সিটে সক্ষম মানুষের না বসার দৃশ্য সৌজন্যমূলক আচরণের পরিচায়ক। কলকাতা থেকে গ্রিনলাইন ভলভোতে করে সোজা শিলিগুড়ির উদ্দেশে যাত্রা। উদ্দেশ দার্জিলিং। রাতে নদীয়ার কৃষ্ণনগরের একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে নেওয়া হলো। রেস্টুরেন্টে বালতিভর্তি ভাত, হাতে বাটি নিয়ে পরিবেশনের দৃশ্য বিরক্তির সৃষ্টি করল। বাসে রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম প্রায় সবাই। ঘুম ভাঙল বাংলাদেশের জন্য মরণবাঁধ খ্যাত ফারাক্কায়। পরিবেশবিদদের নেতিবাচক মনোভাব সত্ত্বেও কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষায় রাশিয়ার সহায়তায় ভারত সরকার মুর্শিদাবাদের মনোহরপুরে গঙ্গা নদীর ওপর এটি নির্মাণ করে। এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর পরে ১৯৭৫ সালে বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়। এর গেটের সংখ্যা ১০৯টি। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য ফারাক্কা বাঁধের কুখ্যাতি সর্বজনবিদিত। শুকনো মৌসুমে পানি আটকে এবং বর্ষা মৌসুমে গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যকে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে অতীতেও অনেক আন্দোলন হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা ফারাক্কার কারণেই দিনে দিনে বিস্তীর্ণ বালুকাময় চরের নীচে খালে পরিণত হতে চলেছে। বাস চলছেতো চলছেই। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ফারাক্কা বাঁধ পাড়ি দেওয়াতো কয়েক মুহূর্তের কাজ নয়। বাঁধ পাহারার জন্য দু’পাশেই বসানো হয়েছে নিরাপত্তা প্রহরী।
শনিবার সকালে শিলিগুড়ি পৌঁছুলাম। শিলিগুড়ির আগেই উত্তর দিনাজপুর। বাংলাদেশের দিনাজপুরের ঠিক উল্টোদিকে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের অবস্থান। সে হিসেবে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দার্জিলিংয়ে গেলে প্রায় আড়াইশ’ কিমি দূরত্ব কমবে। আর তেতুলিয়া থেকে দার্জিলিং আরো কাছে। বুড়িমারি সীমান্ত দিয়েও যাওয়া যেতে পারে।
শিলিগুড়ি থেকে জিপে (টাটা সুমো) করে রওনা হলাম ৭৭ কিমি দূরে স্বপ্নপুরী দার্জিলিংয়ে। ঝালাপাহাড় ক্যান্টনমেন্ট থেকেই মূলত দার্জিলিং শুরু। কারসেং এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে নেওয়া হলো। ভেজিটেবল মোমো এখানে বেশ জনপ্রিয় একটি নাস্তার উপকরণ। পাহাড়ি বাঁধাকপি টাইপের সবজিসম্বলিত রোল টাইপের মোমো খেতেও বেশ সুস্বাদু। মাংসের মোমোও পাওয়া যায়। নেপালিদের প্রিয় একটি খাবার।
পুঞ্জিভূত মেঘের কণা আর পাহাড়ি আস্তরণ ভেদ করে জিপ ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল। এক পর্যায়ে গাড়ি থামল সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা উপন্যাসখ্যাত মল নিকটবর্তী এলাকায়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। হোটেলে উঠেই বেডে শরীর এলিয়ে দিলাম। বিকেলে দল বেঁধে সবাই ঘুরতে বের হলাম।
১৮টি আকর্ষণীয় স্পট রয়েছে এখানে। এর মধ্যে ‘পদ্মজা নাইডু হিমালয়্যান জুওলজিক্যাল পার্ক’ অন্যতম। লাল পান্ডা, নীল ভেড়া, সাইবেরীয় বাঘ ও তুষার পাহাড়ি চিতা পার্কটিকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। একেবারে চূড়ায় জাদুঘর। এখানেই আস্ত হিমালয়টিকে গ্লাসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অরুণাচল থেকে শুরু আর শেষ হয়েছে কাশ্মিরে। কাচের মধ্যে বালির ঢিবি করে হিমালয় পাহাড়ের অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে।
রাতে গেলাম জাপানি টেম্পলে। পরে জেনেছি পিস প্যাগোডাই জাপানি টেম্পল। মহাত্মা গান্ধির ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচিত জাপানি সাধু নিকিতাসু এই বৌদ্ধ মন্দিরটা নির্মাণ করেছিলেন। চারপাশে লম্বা লম্বা পাইনগাছে ঘেরা আর আলো-আঁধারীর মধ্যে অদ্ভুত শব্দে ঢাক বাজানো ভয়মিশ্রিত আবেদন সৃষ্টি করবে, সন্দেহ নেই। এর পাশেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দার্জিলিং অফিস। হোটেলে ফেরার আগে সহকর্মীদের অনুরোধে একটি জায়গায় সবাই থেমে গেলাম। চমকে উঠলাম। নিস্তব্ধ দার্জিলিং এই রাতে মেতেছে অন্য খেলায়। বিশাল তারকারাজির সুউচ্চ আকাশসদৃশ বিন্দু বিন্দু আলো ঝলমলে আস্তরণ ক্লান্ত চোখকেও বেঁধে রেখেছে অপলক গাঁথুনিতে। আর নীচের দিকটা যেন আরো মোহনীয়। এসব কিন্তু দূর-দিগন্তের পাহাড়ঘেঁষা ঘরবাড়িরই প্রতিচ্ছবি।
দার্জিলিং ঘুমিয়ে যায় রাতের প্রথম প্রহরে। হয়ত টাইগার হিলে ভোররাতে হাজার হাজার পর্যটক সূর্যোদয় দেখবে বলে। ক্লান্ত শরীরে অত ভোরে উঠবার ইচ্ছে ছিল না। সহকর্মীদের পীড়াপীড়িতে রাজি হলাম। জিপ ভাড়া করাই ছিল। রোববার ভোর রাতে জিপে উঠতেই মনে পড়ে গেল লতাজির সেই বিখ্যাত গানের কলি- ‘‘টাইগার হিল থেকে সূর্য দেখা ভীষণ মজার’’। ওই ভোরেই পরিচ্ছন্নকর্মীদের তৎপরতা দেখে মনে হলো, এরা দায়িত্ব পালনে খুবই তৎপর। তাদের কারণেই ছিমছাম পরিপাটি দার্জিলিং। গ্লাসের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে পাইন গাছের সারি প্রহরা দিচ্ছে তাদের প্রিয় জন্মভূমিকে। আকাশ জুড়ে তারাগুলো তখনো বাগানে ফোটা সদ্য ফুলের মতো মোহনীয় করে রেখেছিল চারপাশ। ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল আলোর আভা। কুয়াশাঘন আঁধার ভেদ করে ক্রমাগত কুসুমঘেরা আলোর মায়ায় আচ্ছন্ন আমরা। শুনেছি, আকাশ সারাক্ষণ মেঘলা থাকায় সূর্যোদয় দেখাটা ভাগ্যের ব্যাপার। প্রায় খাড়া পাহাড়ের মাঝ বরাবর পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। আমাদের অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। শুনেছি, এত উচ্চতায় বাতাসের চাপ কম থাকায় নাক-মুখ দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। কিছুক্ষণ পরেই উঠে গেলাম সাত হাজার ৬০০ ফুট উঁচুতে টাইগার হিলে। পাহাড়ি রাস্তার দু’পাশে বাঁশগাছ দেখলাম। দাঁড়ালাম হিল টাওয়ারের উত্তর প্রান্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার বেশ নিকটে। ততক্ষণে জনসাধারণে গিজগিজ করছে পুরো টাওয়ার। পূর্বদিকে সূর্যোদয় আর উত্তর-পূর্ব কোণে মোহনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দেখার উত্তেজনায় কথা ফুটছিল না মুখ থেকে। সূর্য ততক্ষণে আরো রঙ ছড়িয়েছে। কমলা থেকে লাল আভায় রূপান্তরিত হয়ে দ্যুতি ছড়াতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসল খেলা শুরু হলো। আড়মোড়া ভেঙে আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে জঙ্ঘাদেবী। কুয়াশাচ্ছন্ন চাদরে ঢাকা লজ্জা ভেঙে জেগে উঠছে সে তার বিশালত্ব নিয়ে। জঙ্ঘাদেবীর কাছে কেউ ভিড়তে পারেনি আজো। তার রূপে যেন কেউ ছারখার না হয়, সেজন্য হয়ত সে দূর থেকেই তাকে দেখে সন্তুষ্ট থাকতে বলে সবাইকে। ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে পরিবর্তনে অভ্যস্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিছুক্ষণ আগেই দেখলাম রঙিন আভায় নিজেকে মেলতে শুরু করেছে সে। এখন একী! বিধবা বেশে সাদা শাড়ি পরে সে জানান দিচ্ছে, তোমাদেরকে ফিরতে হবে। এরই মধ্যে মেঘের রাজ্যে হাািরয়ে যেতে শুরু করেছে অপরূপা জঙ্ঘা। চারপাশে ততক্ষণে মেঘের খেলা শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই বিশালত্বের কাছে নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল।
টাইগার হিল থেকে হোটেলে ফেরার পথে হিমালয় রেলওয়ে গার্ডেনে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি। গার্ডেনটি ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভূক্ত। এখানে বেশ কিছু হলিউড-বলিউডের সিনেমার অংশবিশেষ চিত্রায়িত হয়েছে। সিনেমার কিছু স্থির চিত্র ফলকের ওপর সেঁটে দেওয়া হয়েছে।
দার্জিলিংয়ে সবার আইন মেনে চলার প্রবণতা আমাকে বেশ মুগ্ধ করল। প্রকাশ্যে ধূমপান এখানে নিষিদ্ধ। তবে ওয়াইন পানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। গুরুতো (আব্দুল ওয়াজেদ কচি) সর্বক্ষণ একটা কথা আওড়াচ্ছিলেন আর মজা করছিলেন ‘২০০ টাকা ফাইন আর দুই ঘণ্টা মে আন্ধা’। প্রকাশ্যে ধূমপান করতে না পেরে আমাদের কতিপয় সদস্য পাহাড়ের ঢাল দিয়ে নিচের দিকে নেমে এক রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়াতেই দোকানি এমন কথা বলেছিলেন। তার সরল অর্থ হলো, ধূমপান করলে ২০০ টাকা জরিমানা আর দুই ঘণ্টা পুলিশ কাস্টডিতে থাকতে হবে।
উদ্দেশ্য ছিল দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে স্পট এন্ট্রি ভিসার মাধ্যমে নেপালে প্রবেশ করার। হোটেল থেকে গুছিয়ে আবারো জিপে করে নেপাল সীমান্তের মিরিখের উদ্দেশে যাত্রা। শহর ছেড়ে আসার আগে হিন্দি সিনেমার মাস্টার ড্যান্সার নামে পরিচত গোবিন্দের দু’তলা ছিমছাম বাংলো চোখে পড়ল। চালক বললেন, তার স্ত্রী নেপালি। এখানে প্রায়ই আসেন তিনি। জিপে ডিজেল ভরার সময় জানা গেল, এখানে ডিজেলের দাম পাঁচ টাকা বেশি। ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা লিটার, আর পেট্রল ৭১ টাকা।
ঠিকানাতে যাত্রাবিরতি। মিরিকগামী ভারতীয় রাস্তার ঠিক উত্তর পাশে এক চিলতে নেপালি ভূখ-। নিচের দিকে তাকাতেই অপার বিস্ময়ে চোখে পড়ল নেপালের পাহাড়ি জনপদ। চিত্রপটে আঁকা দক্ষ চিত্রকরের কারুকাজ। সবাই নেমে পড়লাম নেপালি জনপদে পা রাখার আনন্দ উপভোগ করতে। চাইনিজ এক প্রেমিক যুগল মশগুল ছিল নিজস্বী (সেলফি) তুলতে। হিমালয়ের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ছবি তুলতে কে না চায়! আমিও ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবে বাদ সাধলো ওই প্রেমিক যুগল। ছবি তুলতে গেলে তারাও থাকছিল ফ্রেমে। উপায় না দেখে তাদেরকে ফ্রেমে রেখেই ছবি তুললাম। মিরিকে যাওয়ার আগে পশুপতি সীমান্তে গাড়ি থামল। ভারতীয়রা হরহামেশাই নেপালে ঢুকছে। ইমিগ্রেশনে তাদের জন্য আইডি কার্ডই যথেষ্ট। আমরা নেপালে যাব, এমন প্রস্তাব রাখতেই ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা বললেন, ঢাকার গুলশান হামলার পর নেপালে বাংলাদেশি প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মিরিকে লাঞ্চ সেরে সোজা শিলিগুড়ি। রাস্তার ধারে লেবু আর চা-বাগানের ছড়াছড়ি দেখে মুগ্ধ হলাম।
রাতে গ্রিনলাইন পরিবহনে করে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে গেল। ৬০০ কিমি পথ সড়কপথে পাড়ি দেওয়াতো মুহূর্তের কাজ নয়। ১০, সদর স্ট্রিটের হোটেল ডিপ্লোম্যাটে সিট বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন আগে থেকেই ওই হোটেলে অবস্থানরত ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় যাওয়া সাতক্ষীরার এ্যাভেল ভাই। হোটেলে ঢুকতেই রাস্তার ডান হাতে চোখে পড়ল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। শিলালিপিতে লেখা রয়েছে, কবি গুরু এবাড়িতে বসেই রচনা করেছিলেন তার কালজয়ী কবিতা ‘নির্ঝরের নির্ভাবনা’। বিকেলে সবাই বের হলাম কিংবদন্তি চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাথে দেখা করতে।
গৌতম ঘোষ এপার বাংলারই কৃতী সন্তান। ফরিদপুরে তার জন্ম। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ পরিচালক ‘শঙ্খচিল’ নির্মাণে সাতক্ষীরায় এসেছিলেন। দেবহাটার ইছামতি নদীর তীরে সিনেমাটির শুটিংকালে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিলেন প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও অর্থ সম্পাদক ফারুক মাহবুবুর রহমান। সেই থেকেই সখ্য। তার নিমন্ত্রণপত্রের বদৌলতে আমরা সবাই দ্রুত ভিসা পেয়ে যাই। সোমবার সন্ধ্যায় কলকাতার নন্দনে তার সাথে দেখা হয়। মিটিংয়ের ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি আমাদেরকে অনেক সময় দিয়েছিলেন। এর আগে টালিগঞ্জে (টেকনিসিয়ানস স্টুডিও) ‘রাঁধা’ সিরিয়ালের শুটিং দেখা হলো। সিরিয়ালের অভিনেতা বধিদা ও অভিনেত্রী ডলিদি’র সাথে ছবি তোলাও হলো। আউটডোরে সিনেমার শ্যুটিং বেড়ে যাওয়ায় বাংলা ছবির কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রিকে চোখে পড়েনি। রাতেই সিদ্ধান্ত হলো, মঙ্গলবার দীঘাতে যেতে হবে।
দীঘা পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র সমুদ্রসৈকত। কলকাতা থেকে ১৮৭ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণে ৭-৮ কিমি দীর্ঘ সমুদ্রতট। পই পই করে খুঁজেও রুটি না পেয়ে পকোড়া ও এগরোল দিয়ে নাস্তা সারা হলো দীঘা যাত্রা পথেই। যাওয়ার পথে আমাদের বহনকারী গাড়ি চালক সগির মিঞা জানালেন ওই রাজ্যের রাজনীতির হালচাল। তার মতে, রাজ্যের ক্ষমতায় থেকে যাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী মুসলমানদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মুসলিম তরুণ-তরুণীদের চাকরি হচ্ছে। গ্রামে গ্রামে রাস্তা করে দিচ্ছে রাজ্য সরকার। অন্যান্য যেকোন সময়ের তুলনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় আছে। মসজিদের ইমামদের ২ হাজার ৫শ’ টাকা ও মুয়াজ্জিনদের এক হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করে মুসলমানদের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন চিরকুমারী এ নেত্রী। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হাজার বছরে গড়ে উঠা একটি জাতির সভ্যতা ও ইমেজ নিমিষেই ধ্বংস করে দেয়। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যার যার অবস্থানে থেকে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলে সে জাতির অগ্রগতি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
মেদিনীপুর জেলা উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৮০ কিমি বিস্তৃত। দীঘা পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। আমার বিশ্বাস, সমুদ্রের বিশালতা আর পাহাড়ের গম্ভীরতা প্রত্যেকের মনে আধ্যাত্মিক দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়। সৈকতের ছাউনিতে বসে পড়লাম। কক্সবাজারে যেমন টাকা দিতে হয়, এখানে শুধু ডাব খেয়েই ছাউনিটার অধিকার নেওয়া যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে শুনতে পেলাম সাগরের গর্জন। এখানেও রূপসী বাংলার রূপ ধরা পড়ে অন্যভাবে। বিশাল জলরাশি আছড়ে আছড়ে মুখ লুকাচ্ছে বালুর আঁচলে। আমি নরম বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ভয়াল রূপ দেখতে লাগলাম। ঘোড়ায় চড়ে উত্তাল সমুদ্রের সাথে পাল্লা দেওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে জাগলেও সেটা আর হয়ে ওঠেনি। সাগরের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য সমুদ্রস্নানের মাধ্যমে নিজেকে সঁপে দিলাম সমুদ্রদেবীর কাছে। বিদেশে এসেছি, মনেই হয়নি। এটাওতো বঙ্গোপসাগরের সৈকত। বিশাল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালির চর আর থোকা থোকা ঝাউবন প্রকৃতি প্রেমিকদের কাছে টানবে, সন্দেহ নেই। তাছাড়া কলকাতা থেকে দীঘায় যাওয়ার পথে সবুজ ক্ষেত, মেঠো পথ আর দূরের ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম মনকে প্রফুল্ল করবে। একই উপসাগরের তীরে হলেও কক্সবাজার আর দীঘার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ল। মেয়েদের সমুদ্রস্নানের ভেজা শরীর দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে না কেউ। একারণে খুবই সাবলীলভাবে ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন বয়সী মেয়েরা স্বল্পবসনে সমুদ্রস্নানে তৃপ্ত হচ্ছে।
বুধবার সকাল হতেই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। ঘোজাডাঙ্গা এলাকায় এসে গেছি। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে সরোয়ার ভাইয়ের একটি কথা মনে পড়তেই হাসি সম্বরণ করতে পারলাম না। যাওয়ার দিন ভোমরা পার হয়ে ঘোজাডাঙ্গায় পা রাখতেই তিনি রাস্তার ধারে কয়েকটি শালিক পাখি দেখে বললেন, ‘এই শালিক, তোদের পাসপোর্ট আছে তো? যদি না থাকে এক ইঞ্চিও বাংলাদেশে ঢুকবি না।’ কথাটি হাস্যরসের হলেও এভাবেই ভাবতে ইচ্ছে করে, পর্যটনের জন্য আমরা চাই ‘‘টোটাল ওয়ার্ল্ড উইদাউট বর্ডার’’।

লেখক : সাংবাদিক