মঈন মুনতাসীরের কবিতা : পাঠকের ত্রিকাল দর্শন

আপডেট: 09:38:13 27/01/2017



img

দিদার মুহাম্মদ

কবিতা নাকি উপলব্ধির শিল্প। বলি, জীবনে তো অনেক কবিতাই পড়েছেন, কী উপলব্ধ হলো? ‘উপলব্ধির শিল্প’- বলে পালিয়ে বেড়াবার উপায় নেই। আসলে কবিতা এক মারফতিকর্ম। কবিতার মারেফত বুঝতে গেলে তার সাগরে ডুব দিতে হয়, আজলা ভরে গায়ে ঢাললে চলে না। কবিতা উপলব্ধিজাত যাপনের আঁকিবুকি। কবিতা ত্রিকালদর্শনের সাহিত্য।
কবিতাকে শব্দের তেজারতিও বলতে পারি। প্রতিটি শব্দ একেকটা বিজ্ঞাপন, আবার একেকটা পণ্যও। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনটাই বেচে দিন বিনামূল্যে, কেননা লেনদেনটা হয় মনে মনে, বাজারটা তো মন। এই বাজার ঠিক কখন কার দখলে চলে যায় বলা কঠিন। প্রচারমুখিতার যুগে বাজার দখল কঠিন হবেই। কিন্তু যিনি কবি, তিনি বাজারের ধার ধারেন না। লিখে যান। তরুণ কবিদের জন্য স্বীকৃতি চাই কি চাই না সে দ্বন্দ্ব তো আছেই। তারপরও কবিতা প্রকাশের আনন্দ নাকি সন্তান জন্ম দেয়ার মতো। মাথায় যখন কবিতার অঙ্কুরোদগম হয়, তাকে মাথার ভেতর পেলেপুষে কাগজে, তারপর গ্রন্থে রূপদান, ব্যাপারটা আনন্দের। তা যদি হয় প্রথম কাব্য, তবে তাকে নিয়ে মাথার মধ্যে থাকে বিশেষ ও আড়ম্বর আয়োজন। কবি মঈন মুনতাসীরের প্রথম কাব্যের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে।
বছর ছয়েক আগের কথা। বইমেলা ২০১১-তে প্রকাশিত হয় ‘প্রজাপতির ডুবসাঁতার’। তরুণ কবি। নিজের প্রথম সন্তানকে পরিচিত করিয়ে দিবেন ভরা মজলিশে। আমি নিতান্তই ক্ষুদে এক কবিতাপ্রেমিক। কবি তখন স্নাতক ২য় বর্ষের ছাত্র। মোড়ক উন্মোচন করতে এসেছেন এসময়ের কবিপুরুষ আল-মাহমুদ। আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, আল-মাহমুদের হাতে আরেক আল-মাহমুদের কাব্য উন্মোচন, আল-মাহমুদের উত্তরসূরি। উৎসর্গ করে ছিলেন কবি আল-মাহমুদকে।
বয়সের ভার নিয়ে মঞ্চের চেয়ারে বসে আছেন আল-মাহমুদ। দাদার বয়সী বরেণ্য কবি মন থেকে যে বৃদ্ধ নন তা আগেই জানতাম। তাই বয়সের লম্বা পার্থক্য সত্ত্বেও ‘মাহমুদ ভাই’ বলে সবাই তাকে ডাকছিল। আল-মাহমুদ এসেছেন এই নিয়ে সবার মধ্যেই কাজ করছে রোমাঞ্চ। মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, উন্মোচিত হলে ‘প্রজাপতির ডুবসাঁতার’। উৎসর্গটা পড়লাম-
        লোক লোকান্তরে হারিয়ে যাবে সোনালি কাবিন
        কাঁধে করে বইবে মহাকাল তাঁর কালের কলস।
        নাকের নোলক নিয়ে যাবে ধানক্ষেতের সারস-
        সাধনার সিন্ধু হবে সেই কালের গর্ভে বিলীন।
        ‘আল-মাহমুদ’ তখন শোক একটি জীবন্ত ছায়া,
        বিধাতার সাথে হবে সংলাপ, মহানগর নাট্যমঞ্চে
-এতটুকু পড়ে, কী বুঝলাম তখন জানি না, হয় তো আবেগেই আমার চোখে পানি এসে গেল।
মঈন মুনতাসীর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বড় ভাই হওয়া সত্ত্বেও নতুন করে যেন তাকে বোধ করলাম। সখ্য তৈরি হল তার সাথে। তিনি থিয়েটার করতেন। তাকে থিয়েটারের জন্য পাগলের মতো কাজ করতেই দেখেছি, তখন পর্যন্ত তার অভিনয় দেখা হয়নি। একদিন কবি মঈন মুনতাসীর অভিনয় করলেন, সঙদের মধ্যে ঠিক কোন জন কবি মঈন ধরতেই পারলাম না। পরে অবশ্য পাশের জন ফিসফিস করে বলে দিল ‘ঐযে কার্তিক দা।’ একটা ধাক্কাটা খেলাম যেন। ভাল কথা, আমরা কিন্তু মঈন মুনতাসীরকে কার্তিকদা বলেই ডাকতাম, সারা ক্যাম্পাস এই নামেই চিনতো।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি বালিশের পাশে পড়ে আছে কবি মঈন মুনতাসীরের ‘পাথুরে অলংকার’ কাব্য। মলাট উল্টাতেই বেরিয়ে পড়লো ‘কেউ এলে আর ঢেউ এলে’। পড়তেই ঘোর লেগে গেল। আমি জীবনানন্দের রূপসী বাংলা থেকে মিসর-কায়রোর পথ ধরে যাযাবর আরব বেদুঈনের ক্ষণকালের আস্তানা হয়ে টাইগ্রিসে ভেসে পূর্ণচন্দ্রগ্রহণের রাতে কথক নাম্বির কিঞ্চিৎ গুমট বটতলায় এসে দাঁড়ালাম। কবি উত্তম পুরুষে রূপকথার মতো জামাল আব্দেল নাসেরের অত্যাচারের কাহিনি আর কুমারী মেয়ের উষ্ণতার বয়ান করে গেছেন যেন নাম্বির ত্রিকালদর্শী গল্প, নেপথ্যে বেহালার সুর।
কবি বাল্যকাল কাটিয়েছেন কখনো স্কুলে, দফায় দফায় অর্থাভাবে পড়ালেখা ছেড়ে বাবার সাথে মাছের ঘেরে, একসময় স্থানীয় একটা টেলিকমের দোকানে মাসিক পনেরশ’ টাকা বেতনে কাজ করে, শেষমেষ মাদ্রাসায়। মাদ্রাসায় যাওয়া-আসার পথে থানা রোডের লাইব্রেরিগুলো আপন করে নিয়েছিলো কবিকে। কিশোর কবি পড়েছিলেন জুলভার্ণ, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, মরিস বুকাইলি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, লেভ তলস্তয়, বেদ-গীতা-বাইবেল-কোরআন, হাতের কাছে যা পেয়েছেন সব। নাটকের ঝোঁক তখন থেকেই। গাছের মগডালে উঠে গলা ছেড়ে গান গাইতেন, কোনটা নিজের লেখা, কোনটা বাংলা সিনেমার; কখনো মানবপ্রেমের, কখনো ঈশ্বর প্রেমের। এভাবেই একসময় দারিদ্র্যের কষাঘাত আর জীবনের তৃষ্ণায় তৈরি হয় ‘ভালোবাসার প্রথম সংস্করণ’- ভালোবাসা বলতে তুমি বোঝ/ আমার ঠোঁটে তৃষ্ণা মেটানো চুম্বন আমিও/ চুম্বন বুঝি, তবে তা পানতা ভাতের থালায়।... ভালোবাসা বলতে তুমি বোঝ- ইচ্ছে পূরণ। আমি বুঝি- জীবনের রক্তক্ষরণ! এভাবেই তিনি ধরা খেয়ে যান কবিতার কাছে। তার কাছে কবিতা হয়ে ওঠে ‘চোরাবালি’। বলে ওঠেন কবিতা হল তাই ‘যার উপর দাঁড়ালেই ডুবে যাই। কবিতা হলো নারীর দেহের গন্ধ; যার ভেতর জন্ম নেয় ধ্রুব আসত্তি।’ কখনো তার কাছে ‘কবিতা হলো উভচর প্রাণী, যার জলে-স্থলে সমান গতি।’ কবি মনে করেন, ‘কবিতায় রয়েছে অলৌকিক শক্তি- সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় দেবদূতের মত এসে হেসে ওঠে। কবিতার রয়েছে রক্ত-মাংস-হাড় শত ইন্দ্রিয়, আর হাজার রঙের কোষসহ তেত্রিশকোটি দেবতার মত মূর্তি।’ আর তাই শেষমেষ পাঠক অজান্তেই কেমন ত্রিকালদর্শী হয়ে ওঠেন।
বুকের ব্যাসার্ধ মেপে যদি বুকের বিশালতাকে বোঝা যেত তবে হয়তো কবির বুকের যন্ত্রণাকে বুঝা যেত। অতীত- কবির কাছে ভাঁজপড়া কপালে সংকুচিত ভ্রুযুগলের নিচে আধালুপ্ত কালো তারার ভেতরে কোটি বৎসরের ইতিহাস, বর্তমান- চোখের সামনে নাকের ডগায় ঝুলন্ত মুলো আর ক্রমগড়ায়মান ভবিতব্য মানে মস্তিষ্কে নির্মিত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মায়াজাল; আর এর সমস্তটাকে যেন পুরান ঢাকার ডিসলাইনের তারের মত জগাখিচুড়ি বলিরেখা ঘিরে রেখেছে। কবি ব্যক্তিগত ট্রাইবুনাল খুলে স্ববিরোধী হয়ে নিজেদের হত্যার সংবাদ ও জাতিসত্বার গল্প বলে গেছেন। ‘গল্প শুনছি-/আমি ও আমাদের জাতিসত্বার গল্প।/ আমাদের নষ্ট জীবন থেকে/ ফিনকি ধরে বেরিয়ে আসা/ বিষাক্ত রক্তের গল্প।/ ...দুটো মৃত্যুর মতন দুটো কষ্টের কথা/ কাউকে শোনাতে পারি না/ কেউ শুনতে চাইবে না-/ আমি ও আমাদের হত্যার সংবাদ।’ কখন বা কেমন এক ‘বাহুল্য অথবা একাধিক নির্বাসনে’ কবি নেমে যাচ্ছেন নিরন্তরের গ্লানিতে, যেন ক্রমে ক্রমে গহ্বরে মুখ লুকিয়ে নিচ্ছেন শত্রুর আগমনে। কেননা, ‘স্বাধীনতা বলে কিছু নেই’ আছে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতার রদবদল’-
        মন্ত্রিসভায় বসে ‘বুনো-হাতির পাল’
        গণভবনের চারদিকে প্রখর পাহারা
        এদিকে সীমান্ত ফাঁকা! অতর্কিত হামলায়
        বন্ধুর গুলিতে হাসতে হাসতে মরে গণতন্ত্র
        পতাকা বৈঠক হয়, শান্তি আলোচনা সফল
        তারপর সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকে কিশোরী মেয়ে
        কুকুরের মত কাঁধে করে আনে
        সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী
        প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ বুকে
        আমার দেশ বারডেম হাসপাতালে শুয়ে
        ঝড়ে ভাঙা কলাগাছটির মত
        আমার দেশ আবারো পড়েছে নুয়ে
            [স্বাধীনতা বলে কিছু নেই : পাথুরে অলংকার]

কবি আত্মপরিচয় দেন-
       
        অপেক্ষা করতে জানি না-
        তাই উপেক্ষা করেছি যুদ্ধের আশঙ্কা।
        উপেক্ষা করেছি-
        বৈরী স্বদেশ; জল-পানি ভাত
            [অবিশ্বসীদের মিছিলে যাচ্ছি : পাথুরে অলংকার]
কিংবা,
        ক্ষুদিরামের মত ফাঁসিতে ঝুলতে হবে আমার
        তবু ভালোবাসার বোমাটা তার দিকে ছুড়বো
            [দেহ ও দ্রোহের কীর্তন : পাথুরে অলংকার]

অনুষঙ্গের নিরন্তর ব্যবহারে উপলব্ধির চূড়ান্তসীমায় পৌঁছে কেমন এক শিহরণ জাগানোর ক্ষমতা নিয়ে কবি লিখেছেন। শৈশবের ‘কাজলা নদী’র চঞ্চলতা প্রকাশ করেছেন এভাবে-
        আমি নৃত্য দেখেছি
        শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্টালে
        নর্তকী মেয়ের কোমরের ভাঁজে ভাঁজে।
        কিন্তু তোমার নির্মল বুকে-
        উলঙ্গ নাভির ভাঁজে যে নৃত্য দেখেছি
        তা অসংখ্য পায়রার গতিময়
        সঙ্গমকেও হার মানাতে পারে।
কবি এখানে থামলে মন্দ হতো না। কিন্তু তার কপালে স্পষ্ট হয়ে উঠলো বলিরেখা। ফলে মুহূর্তেই তিনি প্রসঙ্গকে লটকে দিলেন ভিন্নসীমায়। বললেন-
        কাজলা নদী, তুমি তো আমার মতন
        দুঃখের সাথে করেছো সন্ধি
        তুমি তো আমার মতন-
        অবক্ষয়ের কষাঘাতে বন্দি
অনুষঙ্গের আড়ম্বর ও বিপুল ব্যবহার প্রমাণ করে কবির প্রচ্ছন্ন প্রেম আছে অনুষঙ্গের প্রতি, ঝোঁক আছে এর ব্যাপক ব্যবহারে। কবিতার প্রতিটি বুননে যেন পাঠকের সাত ঘাটের জল পান করার জোগাড়।
        ...     ...     ... কাল-মহাকাল সবই ভাঙে,
        শুধু ভাঙে না পুরাতন দুর্গের প্রাচীর। হয়তো ভ্যালেনসিয়া
        উপকূলে আঘাত করে ভূ-মধ্যসাগরীয় উন্মাতাল অবাধ্য তুফান।
        হয়তো আন্ডোরা সীমান্তে ফ্রান্সের ট্রেগার; মানুষ পোড়া
        অসংখ্য গন্ধ, বণিকের জাহাজে আগুন। হয়তো টাংগের
        শক্ত হাতে বশ করতে চায় মালাগার মাটি; বাধা হয়ে
        দাঁড়িয়েছে একচ্ছত্র জলরাশি। কিংবা পর্তুগাল টলেডোর বুকে
        ঢুকিয়ে দিতে চায় উপনিবেশ যন্ত্র। উত্তর আটলেন্টিকের
        ঢেউ এসে জাগিয়ে তোলে ভিগোর পথ ধরে ঘুমন্ত স্পেন।
                [আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী : প্রজাপতির ডুবসাঁতার]
মুহূর্তেই চেতনা ছুটে যায় চেনা জগতের বাইরে। পাশ ফিরে শোয় চিন্তার গতিবিধি। পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস-ঐতিহ্য মাথার মধ্যে একমুহূর্তে বেধড়ক হানা দেয়, নিরন্তর অমানিশায় পৌঁছে যাই সিন্ধু সভ্যতার স্নানঘর থেকে এথেন্সের স্পার্টার যুদ্ধে। কিন্তু সমকাল কাল হয়ে দাঁড়ায় যেন, তৈরি হয় কবির ‘ভালবাসার দ্বিতীয় সংস্করণ’- ভালবাসা বলতে এখন বুঝি-/ শহরে জানালায় অথবা পিচঢালা রাস্তায়/ চশমার ফ্রেমে অর্ধ উলঙ্গ নারী; অসভ্য সভ্যতা।
তাই কবি এক কবি ও অনার্য পুরুষ এর প্রার্থনায় লিপ্ত-
    ‘আমাকে নিয়ে যাও মৃত্যু উপত্যকায়’ পোড়ে ক্লান্ত সাগরের তুষ
    কিছু মৃত মানুষের যাতনায় আমিও মরতে চাই; তেমনি বেহুঁশ
    আমাকে বাঁচিয়ে তোলো দেব না সোনালি অশ্রু ঘুষ
মাটির পালঙ্কে শুয়ে ‘একবার কথা বল কবি; কথা বল অনার্য পুরুষ।’
মঈন মুনতাসীরের কবিতা যেখান থেকেই পড়ি মনে হয় সেখান থেকেই শুরু। যখনই তার কবিতা সম্পর্কে লিখতে যাই তখনই মনে হয় পুরো কবিতাই তুলে দেই। ত্রিকালদর্শী কবিতার এই এক দশা। এই কবিতার বিকল্প কোন কথা থাকতে পারে না। যদিও কবিতার বিকল্প কথা বলে কোন কিছু নেই।