মণিরামপুরে কুমড়ার বড়ি তৈরির ধুম

আপডেট: 02:30:22 28/11/2017



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : কুমড়ার বড়ি। যশোর অঞ্চলের একটি সুস্বাদু ও পরিচিত খাবার। বিভিন্ন সবজির সঙ্গে এটি রান্না করে খাওয়ার প্রচলন বহু আগের।
শীত মৌসুম এলেই যশোর অঞ্চলের কুমড়ার বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়। গ্রামের অনেক গৃহবধূ নিজেদের খাওয়ার জন্য বাড়িতে এটা তৈরি করে থাকেন। আবার অনেকে এটাকে জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়ে সংসার চালান। মণিরামপুরের এমন কিছু পরিবার আছে, যারা সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য শীতকালে বড়ি তৈরি করেন। অন্য সময়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ নানা কাজ করে সংসার চালান।
পৌর এলাকার হাকোবা কুণ্ডুপাড়া। শীত এলেই এই পাড়ার বাসিন্দারা বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বছরে কার্তিক থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত পাঁচ মাস চলে বড়ি তৈরির কাজ।
সোমবার সকালে সরেজমিন হাকোবা কুণ্ডুপাড়ায় গেলে নারী-পুরুষদের বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। বাড়ি থেকে বড়ি তৈরির উপাদান গোছগাছ করে এনে মাঠে বসে সকালের মিষ্টি রোদে বড়ি তৈরি করছেন তারা।
পাড়ায় ঢুকতেই দেখা মেলে দম্পতি শ্যামল কুণ্ডু ও নমিতা কুণ্ডুর সঙ্গে। তারা দুইজনে বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত।
এসময় কথা হয় শ্যামল কুণ্ডুর সঙ্গে। তিনি মণিরামপুর বাজারের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘শীতের প্রথম থেকে বড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়। বড়ি তৈরিতে ডালের সাথে চালকুমড়া ব্যবহার করতে পারলে ভালো হয়। অনেক সময় ডালের সাথে কচু ও ফুলকপি ব্যবহার করি।’
প্রতি কেজি কুমড়ার বড়ির খুচরা দাম ২০০ টাকা। আর কচু বা ফুলকপির বড়ি কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা। এক কেজি বড়ি বিক্রি করতে পারলে পঞ্চাশ টাকা লাভ থাকে বলে জানান শ্যামল কুণ্ডু।
শ্যামল কুণ্ডুর স্ত্রী নমিতা কুণ্ডু বলেন, ‘ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত দুইজনে মিলে পাঁচ কেজি বড়ি তৈরি করা যায়। তিন দিন পর বড়ি শুকিয়ে খাওয়ার উপযোগী হয়।’
একই মাঠে বড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত বলয় কুণ্ডু ও তার স্ত্রী। বলয় কুণ্ডু বলেন, ‘এ কাজ তো বেশি দিন করা যায় না। এক মাস আগে ধরে শুরু করেছি। সামনে আর হয়তো দুই মাস করা যাবে।’
বলয় কুণ্ডুও একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ব্যবসার ফাঁকে এই কাজ করে বাড়তি আয় করেন তিনি। সকাল হলেই স্ত্রীর সঙ্গে একজনকে ভাড়ায় নিয়ে হাজির হন বাড়ির পাশের মাঠে। প্রতিদিন ১০-১২ কেজি করে বড়ি বসান।
বলয় কুণ্ডু বলেন, ‘কুমড়ার বড়ি তৈরি করে বাজারে নিয়ে ১২০ টাকা করে পাইকারি বিক্রি করি। তাতে কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা লাভ থাকে।’
বলয় কুণ্ডুর পাশে বড়ি তৈরির উপাদান প্রস্তুত করতে ব্যস্ত গৃহবধূ জয়ন্তী কুণ্ডু। তিনি বলেন, ‘একাই দিনে ৮-১০ কেজি বড়ি বসানো যায়। ১৫ বছর ধরে এই কাজ করছি।’
এই কাজে তারা কোনো ঋণ পান না বলে জানান।
বড়ি তৈরির কাজ কত দিন ধরে করছেন?- এমন প্রশ্নে শ্যামল কুণ্ডু বলেন, ‘ডালের বড়ি তৈরি আমাদের পুরনো পেশা। একসময় পাড়ার প্রায় সব পরিবার বড়ি তৈরি করে বাড়তি আয় করতেন। এখন অনেকে এই কাজ বাদ দিয়েছে। আগে ঢেঁকিতে ডাল কুটে বড়ি তৈরি করতে হতো। এখন ডাল কুটার মেশিন বের হওয়ায় অনেকে বাড়িতে বসে নিজেদের পরিবারের চাহিদামতো বড়ি তৈরি করেন। ফলে বাজারের বড়ির চাহিদা কমেছে। আগে ব্যাপারিরা এসে বড়ি কিনে নিয়ে যেত। এখন ব্যাপারিরা আর আসে না।’
তবে পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই পাড়ার প্রায় ২০ ঘর পরিবার এখনো বড়ি তৈরির কাজ করে চলেছেন বলে জানান শ্যামল কুণ্ডু।