মণিরামপুরে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক মালিক গ্রেফতার

আপডেট: 06:16:21 14/04/2019



img

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি : মণিরামপুরে মনোয়ারা ক্লিনিক নামে একটি বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে সন্তান প্রসব করতে এসে ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় মৃত প্রসূতি শামসুন্নাহারের স্বামী আসাদুজ্জামান বাদী হয়ে দশজনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলার সূত্র ধরে শনিবার রাতে পুলিশ ক্লিনিকের মালিক কথিত সার্জিকাল চিকিৎসক আব্দুল হাইকে গ্রেফতার করেছে।
আটক আব্দুল হাই উপজেলার জামজামি গ্রামের মৃত আফসার আলী বিশ্বাসের ছেলে। তিনি নিজে ডাক্তার না হলেও ‘সার্জিকাল ডাক্তার’ পরিচয়ে বহুদিন ধরে রোগীর স্বজনদের ধোঁকা দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, অভয়নগরের নওয়াপাড়া এলাকার সুব্রত মহলদার, উপজেলার কাজির গ্রামের শরিফুল ইসলাম, সুবলকাঠি গ্রামের সাইফুল ইসলাম, জয়পুরের মোন্তাজ হোসেন, স্বরুপদহ গ্রামের তানিয়া সুলতানা হালিমা, হাসাডাঙ্গার নাসিমা খাতুন, যশোর সদর উপজেলার সিরাজসিংহ গ্রামের দীপা খাতুন, রামনগরের মঞ্জুয়ারা খাতুন এবং আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন।
এদিকে, ডাক্তার গ্রেফতার হওয়ার খবরে ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন স্বজনরা। গ্রেফতার আতঙ্কে অন্য আসামিরা ক্লিনিক ছেড়ে পালিয়েছেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, জয়পুর গ্রামের আসাদুজ্জামানের স্ত্রী শামসুন্নাহারের বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) রাতে প্রসব বেদনা ওঠে। তখন তাকে মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে অবস্থিত মনোয়ারা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। বাইরে থেকে ডাক্তার আনার নামে সাড়ে ১১ হাজার টাকা চুক্তিতে সিজারের কথা বলে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই রোগীকে ভর্তি করান। কিন্তুকোনো ডাক্তার আসেননি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেই অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে শামসুন্নাহারের অপারেশন করেন। প্রসূতি একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেন। আব্দুল হাইয়ের সহযোগীরা সেই নবজাতককে এনে বাবা আসাদুজ্জামানের কোলে দেন। আসাদুজ্জামান তার স্ত্রীর কথা জানতে চাইলে ‘রোগী ভালো আছে’ বলে জানান কথিত ডাক্তার। কিছুক্ষণ পর মালিক আব্দুল হাই জানান, প্রসূতির অবস্থা খারাপ তাকে খুলনায় নিতে হবে। ঘণ্টা দেড়েক পরে আবার তারা জানান, খুলনায় না রোগীকে এই মুহূর্তে যশোর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। পরে ডাক্তারের কথামতো রাত সাড়ে তিনটার দিকে আসাদুজ্জামান ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সে স্ত্রীকে নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্সে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেও ছিলেন।
আসাদুজ্জামানের অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর সময় ভেতরে আলো বন্ধ করা ছিল। তিনি আলো জ্বালাতে বললে রোগীর ক্ষতি হবে বলে জানান ডাক্তার। অ্যাম্বুলেন্স কিছুদূর গেলে আসাদুজ্জামানের দুই পা জড়িয়ে ধরেন আব্দুল হাই। হাই তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বলেন, যদি রোগী মারা যান তাহলে তিনি (আসাদুজ্জামান) যেন কাউকে কিছু না জানান। তিনি নবজাতকের যাবতীয় দায়িত্ব নেবেন এবং আসাদুজ্জামানকে ক্লিনিকে চাকরি দেবেন। অ্যাম্বুলেন্স কুয়াদা বাজার পার হলে ভেতরে আলো জ্বালানো হয়। তখন প্রসূতি শামসুন্নাহার মারা গেছেন।
এদিকে, মণিরামপুর বাজারের ঘর মালিক বোরহান উদ্দিন জাকির বলেন, দুই-তিন বছর আগে আব্দুল হাই তার ঘর ভাড়া নিয়ে প্রথমে ‘মনোয়ারা ক্লিনিক’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। তখন হাকোবা গ্রামের এক রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনরা ক্লিনিক ভাঙতে আসেন। পরে তিনি খবর নিয়ে জানতে পারেন, বিভিন্ন সময়ে ক্লিনিকে পাঁচ-সাতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এসব জেনে বোরহান উদ্দিন ক্লিনিকটি উঠিয়ে দেন। পরে মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে ঘর ভাড়া নিয়ে ক্লিনিক চালু করেন আব্দুল হাই। গত বছর ওই ক্লিনিকে উপজেলার কামালপুর গ্রামের সোনিয়া নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তখন মালিক আব্দুল হাই নবজাতকের দায়িত্ব নেবেন বলে রোগীর স্বজনদের হাত-পা জড়িয়ে ধরে রক্ষা পান। কিন্তু পরে আর তিনি সেই নবজাতকের খবর নেননি বলে অভিযোগ।
মণিরামপুর থানার ইনসপেক্টর (সার্বিক) সহিদুল ইসলাম বলেন, আসাদুজ্জামানের অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার রাতে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাইকে আটক করা হয়েছে। পরে অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। রোববার সকালে ১৫ জনকে আসামি করে থানায় হত্যাসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রেকর্ড হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শুভ্রারানী দেবনাথ বলেন, সম্প্রতি মনোয়ারা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ভুয়া ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করানোর বিষয়ে ইউএনওর দপ্তরে একটি অভিযোগ পড়ে। আবার ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে পারেন। এসব অভিযোগে শনিবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত হয়। তদন্তে তিনি জানতে পারেন, মালিক আব্দুল হাই নিজে ডাক্তার না হয়েও রোগীর অপারেশন করান। তাছাড়া সুব্রত নামে এক ইউনানি চিকিৎসককে এমবিবিএস ডাক্তার সাজিয়ে ক্লিনিকে রোগীদের অপারেশন করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে রোববারে (১৫ এপ্রিল) ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন