মণিরামপুরে ভিখারিদের জন্য তৈরি দোকানগুলো ফাঁকা

আপডেট: 02:54:59 13/02/2018



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরে ভিখারিদের জন্য তৈরি দোকানঘরগুলো কাজে আসছে না।
উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাট-বাজারে ৫-৬টি করে দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছিল ইট ও টিন দিয়ে। কিন্তু ভিক্ষুকদের মাঝে সেগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আবার কোনো কোনো এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ না দেওয়ায় সেখানে দোকান পেতে বসতে পারছেন না ভিক্ষুকরা।
ফলে আগে যারা ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন তারা সেই পেশা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেননি। আর সরকারের ভিক্ষুকমুক্ত মণিরামপুর ঘোষণার কার্যক্রমও কার্যত সফলতা পায়নি। খুবএকটা কাজে আসেনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের দেওয়া প্রায় সাড়ে নয় লাখ টাকা।
উপজেলাজুড়ে ভিক্ষুকদের জন্য কোথায়, কয়টি দোকানঘর তৈরি করা হয়েছে এবং এগুলো তৈরিতে কত টাকা খরচ হয়েছে তার কোনো হিসেবও ইউএনও দপ্তরে পাওয়া যায়নি। দুইদিন ধরে হেঁটে এই তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের সহকারী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এসব কাজ তৎকালীন ইউএনও স্যার নিজেই করতেন। ফলে আমার কাছে পুরোপুরি তথ্য নেই। ইঞ্জিনিয়ার অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’
এই ব্যপারে জানতে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার আবু সুফিয়ানকে রিং করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
সম্প্রতি উপজেলার হেলাঞ্চি ও পাড়দীয়া বাজারে গিয়ে ভিক্ষুকদের জন্য তৈরি দোকানগুলো খালি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দোকানের মালিক না থাকায় আশপাশের কোনো কোনো দোকানিকে সেগুলো ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এদিকে উপজেলার সিলেমপুর বাজারে ভিক্ষুকের জন্য বরাদ্দ একটি দোকান বেদখল হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি প্রভাবশালীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন দোকানটি দখল করে আছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
চলতি মাসের প্রথম দিন উপজেলার হেলাঞ্চি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের মাঝ বরাবর সরকারি জমিতে ইটের পোতা এবং টিনের বেড়া ও চালা দিয়ে তৈরি করা পাঁচটি ঘর খালি পড়ে আছে। ঘরগুলো আকারে ক্ষুদ্র এবং সামনের অংশ ফাঁকা। দোকানগুলোর মধ্যে একটি দখল নিয়ে চেয়ার টেবিল রেখেছেন পাশের মিষ্টির দোকানি ইকবাল। আর সামনের জায়গা তিনি জ্বালানি শুকানোর কাজে ব্যবহার করছেন। জানতে চাইলে ইকবাল বলেন, ‘শুনেছি, এগুলো ফকিরদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত কাউকে ঘরগুলোতে উঠতে দেখিনি। খালি পড়ে থাকায় আমি একটাতে জিনিসপত্র রেখেছি।’
খেদাপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘শুধু হেলাঞ্চি গ্রামেই প্রায় দশজন ভিক্ষুক আছে। আজ পর্যন্ত কাউকে কোনো দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তারা সবাই এখনো ভিক্ষা করছে।’
সোমবার দুপুরে পাড়দীয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ভিখারিদের জন্য তৈরি করা চারটি দোকানঘর খালি পড়ে আছে। ঘরগুলোর পাশের দোকানদার আকরাম হোসেন একটি দখলে নিয়ে সার বিক্রি করছেন। আর মোতালেব নামে এক ব্যক্তি একটি দখলে নিয়েছেন। প্রতি হাটবারে তিনি সেখানে বসে তরকারি বিক্রি করছেন বলে স্থানীয়রা জানালেন। বাকি দুটি ঘর খালি রয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউনুস আলী বলেন, ‘ঘরগুলো তৈরির সময় আমাদের কারো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। তৎকালীন ইউএনও নিজেই সব করেছেন। আমার ওয়ার্ডে ১৬ জন ভিক্ষুক আছে। জানা মতে, তাদের কাউকে দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সবাই এখনো ভিক্ষা করে যাচ্ছে।’
উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম আহাদ আলী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের কালারহাট বাজারে সরকারিভাবে তৈরি পাঁচটি ঘর খালি পড়ে আছে।’
খানপুর ইউনিয়নের ভরতপুর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সঞ্জয় রাহা বলেন, ‘ইউনিয়নের সিলেমপুর বাজারে ভিক্ষুকদের জন্য ছয়টি ঘর তৈরি করা হয়েছে। একটি ঘরের দখল নিয়ে দ্ব›দ্ব চলছে। বাকি পাঁচটি খালি পড়ে আছে।’
খুলনা বিভাগকে ভিক্ষুকমুক্ত করার কর্মসূচির অংশ হিসেবে মণিরামপুরের ৫৫৮ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের লক্ষে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মণিরামপুর উপজেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের একদিনের বেতনভাতা ‘কেটে নেওয়া’ হয়েছিল। একইসঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে সহায়তা নিয়ে মোট নয় লাখ ৩৫ হাজার ৯৪৫ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তার মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ভিক্ষুকদের জন্য দোকান তৈরি ও তাদের মাঝে ছাগল বিতরণসহ আনুষঙ্গিক কাজে আট লাখ ৮৪ হাজার ৭১০ টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে কার্যত এই টাকা খরচ তেমন কোনো কাজে আসেনি বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা। পুনর্বাসনের আগে উপজেলায় যতজন ভিখারি ভিক্ষাবৃত্তি করতেন এখনো তারাই একই কাজ করে চলেছেন। উপজেলার হাট-বাজারসহ আবাসিক এলাকায় নিয়মিত হাত পাতছেন তারা।
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘কীভাবে মণিরামপুর উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করা যায় সেই বিষয়ে মনিটরিং চলছে। দ্রæত এই ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন