মণিরামপুরে সাড়ে আটশ পরিবারের ঈদ রাস্তায়

আপডেট: 02:48:45 01/09/2017



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের শ্যামকুড় ও চালুয়াহাটি ইউনিয়নের সাড়ে আটশ' পরিবারের পাঁচ হাজার মানুষের এবারের ঈদ কাটবে রাস্তায়। বসতবাড়িতে পানি থাকায় গত প্রায় এক মাস দশ দিন ধরে তারা রাস্তায় অস্থায়ী টংঘরে অবস্থান করছেন। এখনো পানি জমে থাকায় তাদের বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত।
দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। সাধ্যমতো চলছে কুরবানির পশু কেনাসহ ঈদ উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি। যার কোনো কিছুরই ছোঁয়া পড়েনি ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের মাঝে। শুধু রাস্তায় আশ্রয় নেওয়াদের নয়, ঈদের আনন্দ নেই উপজেলার জলাবদ্ধ আট ইউনিয়নের ছয় হাজার পরিবারে।
এসব এলাকায় যাদের কুরবানির সামর্থ্য ছিল, আগের বছরগুলোতেও যারা পশু কুরবানি করেছেন, তাদের অনেকেই এবার অপারগ। আবার অনেকে কুরবানির জন্য আগে থেকে কিনে রাখা পশু বেচে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
গতবছরও একইভাবে জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় ঈদ করতে হয়েছিল এসব এলাকার মানুষকে। সেই সময় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ত্রাণ, কুরবানির মাংস, নতুন পোশাক নিয়ে জলাবদ্ধদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এবার তেমন কিছু জুটছে না তাদের ভাগ্যে।
উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের নাগোরঘোপ এলাকায় মহাসড়কের পাশে স্বামী-সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গৃহবধূ নারগিস।
তিনি বলেন, ‘বাড়িঘরে পানি থাকায় একমাসেরও বেশি দিন ধরে রাস্তায় আছি। স্বামী ভ্যান চালায়। যা আয় হয় তাতে সংসার চলে না। ঈদের কেনাকাটা হবে কীভাবে? নিজেরা তো দূরে থাক, ছোট্ট বাচ্চাদের জন্য তাই কিছু কিনতে পারিনি।’
নারগিসের পাশের টংঘরের আশ্রিতা রেশমি বলেন, ‘গরিব মানুষ। তবুও বাড়ি থাকলি টুকটাক কিছু জোগাড় করতি পারতাম। রাস্তায় থাইকে কি ঈদের আনন্দ হয়?’
চিনাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূ শিউলি বলেন, ‘বাড়ি পানি ওঠার সাথে সাথে আমার পা ভেঙেছে। কত মানুষ কত কিছু পায়! আমরা কিছুই পাইনে। আজ (বৃহস্পতিবার) ঈদ উপলক্ষে চাল দেচ্ছে। আমাগের নাম দুই বার লিখে নিয়ে আবার কাইটে দেছে। আজো কিছু দিইনি।’
হাসাডাঙ্গা গ্রামের খাদেম বলেন, ‘ঘরের মদ্যি থেকে পানি নাইমে গেছে। কিন্তু তাতে কী? পানি সরলিও কাদায় হাঁটাচলা করা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বাড়িতি বসবাস করা যায় না। ঈদের আনন্দ হবে কীভাবে? আমার কাছে ঈদ বলে কিছু মনে হচ্ছে না।’
নাগোরঘোপ বাজারের ডেকোরেটরের দোকান মালিক হাফেজ আব্দুল মমিন বলেন, ‘৭-৮ বিঘার একটা ঘের ছিল। ঠিক যখন মাছ ধরা পড়বে, তখন বৃষ্টির পানিতে তা ভেসে গেছে। আগে কুরবানি দিতাম। গত বছর আর এইবার পানির জন্য কুরবানি দিতে পারছি না।’
হাসাডাঙ্গা গ্রামের আবুল কাসেম বলেন, ‘কুরবানি করবো বলে চৈত্র মাসের দিকে একটা ছাগল কিনিলাম। বাড়িতে পানি থাকায় তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হইছি। কোনো বার কুরবানি মিস হয় না। এই দুই বছর পানির জন্যি পারলাম না।’
এদিকে মণিরামপুরের পানিবন্দি সব এলাকায় জলাবদ্ধ পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। গত এক সপ্তাহে অন্তত এক ফুট পানি কমেছে। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে পানি পুরোটাই সরে পড়তে পারে বলে এসব এলাকার মানুষ আশাবাদী। আবার অনেক বাড়িতে এখনো হাঁটুপানি রয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস বলছে, এবারের টানা বৃষ্টিতে ১২টি ইউনিয়নের ছয় হাজার ৭২০টি পরিবারের ৩২ হাজার ৩৯৫ ব্যক্তি পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে শ্যামকুড় ও চালুয়াহাটি ইউনিয়নের ৯৩২টি পরিবার রাস্তায়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ইতিমধ্যে ৮২টি পরিবার তাদের বসতভিটায় ফিরেছে। বাকিরা আগামী সপ্তাহখানেক পর বাড়ি ফিরতে পারবেন।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসেবে এই বছর পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। 
শ্যামকুড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘পানি কমছে। অনেক বাড়ি থেকে পানি সরে গেছে। তবে উঠানে হাঁটুকাদা থাকায় বসতবাড়িতে মানুষ কষ্টে আছে।’
এবার জলাবদ্ধতার কারণে শ্যামকুড় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি ঈদগাহে ঈদের জামাত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
মণিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইয়ারুল হক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের তিন হাজার পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে দশ কেজি করে ৩০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।’
কিন্তু এবার বিতরণ করা হয়েছে আতপ চাল; যা এই এলাকার মানুষের খাওয়ার অভ্যাস নেই।

আরও পড়ুন