মণিরামপুর সরকারি স্কুলে ফল বিপর্যয়ের কারণ

আপডেট: 07:14:08 09/05/2018



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা ও গুটি কয়েক শিক্ষকের অর্থলিপ্সার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পিছিয়ে পড়েছে মণিরামপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৩ জন; ফেল করেছে বিজ্ঞানের দুই পরীক্ষার্থী। অথচ গত বছর ৬৯ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৬ জন।
এবারের ফলাফলে দারুণ ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। স্কুলে ক্লাস না হওয়ায় এবং শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়ায় ফলাফলের এই দুরবস্থা বলে মনে করছেন তারা। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দাবি, এবারের ব্যাচ ভালো না থাকায় ফলাফল খারাপ হয়েছে।
প্রতিবছরই উপজেলার বিভিন্ন স্কুল থেকে প্রাথমিক সমাপনী পাস করে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে ৬০ থেকে ৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় এই স্কুলে। অনেক শিক্ষার্থীর ছোট বয়স থেকে ইচ্ছা থাকে পাইলট স্কুলে পড়ার। আবার অভিভাবদেরও প্রথম পছন্দের স্কুল এটি।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বুকভরা আশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে শিকার হয় শিক্ষকদের অর্থলিপ্সার। বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই দিয়েই তারা শুরু করেন কোচিং বাণিজ্য। স্কুলে ক্লাস শুরু হতে দেরি হলেও বছরের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় কোচিং ক্লাস। অনেক অভিভাবক প্রথম দিকে তার সন্তানকে স্কুলে কোচিং করতে পাঠাতে চান না। পরে শিক্ষকদের নানামুখী হুমকির মুখে তারা সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হন। ফলে, এক সময় প্রতিষ্ঠানটির বেশ সুনাম থাকলেও এসব কারণে তা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্কুলের কার্তিক, প্রণয়, পরিমল, মাসুদ ও আমিনুর এই পাঁচ শিক্ষকের কাছে জিম্মি স্কুলের পাঁচটি শ্রেণির তিনশতাধিক শিক্ষার্থী। মাসে ৬০০ টাকা দিয়ে তারা এইসব শিক্ষকের কাছে পড়তে বাধ্য হয়। যারা পড়তে না চায় তাদেরকে ফেল করিয়ে দেওয়া এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। যে সব শিক্ষক কোচিং করান তারা ঠিকমতো ক্লাসে আসেন না। এছাড়া এসব শিক্ষক পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র ধরিয়ে দেন বলেও অভিযোগ।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ‘বিশেষ কারণে’ এসব দেখেও না দেখার ভান করেন। তার নিজেরও দুর্বলতা রয়েছে। প্রধান শিক্ষক মনিরা খাতুনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো হাজির না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ফলাফল খারাপ হওয়া কয়েকজন পরীক্ষার্থী জানায়, তাদের স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। সকাল হলেই শিক্ষার্থীরা স্কুলে শিক্ষকদের কাছে কোচিংয়ে ছোটে। পরীক্ষার আগে কোচিং শিক্ষকরা প্রশ্ন দিয়ে দিতেন। এই শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশায় ছিল। কয়েকটা পরীক্ষার প্রশ্ন তারা হাতে পেয়েছিলও। কিন্তু পরীক্ষার হলে বিতরণ করা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে তা মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, তার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে ছিল। এই মেধাবী ছেলে আস্তে আস্তে নষ্ট হয়েছে। স্কুলেতো ক্লাস হতো না ঠিকমতো। আর প্রধান শিক্ষক মনিরা খাতুনতো ঠিকমতো স্কুলে আসেনই না। শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের কারণে মাসে ৬০০ টাকা করে গুনতে হয়েছে। যা হওয়ার তাই হয়েছে। ছেলের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি।
জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মনিরা খাতুন বলেন, ‘ক্লাস হয় না- একথা একেবারেই ভুল। স্যারেদের কোচিং করানো কোনো বিষয় না। এবারের ব্যাচ ভালো ছিল না। তারা কথা শুনতো না। ঠিকমতো স্কুলে আসত না। এই কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে।’
পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে ঠিকমতো আসি না- একথা আপনাকে কে বলেছে? মাঝে অসুস্থ ছিলাম বলে তিনমাস ছুটি নিয়েছিলাম।’
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘ফলাফল ওই স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে জানায়নি। এতো ভালো শিক্ষার্থীদের ফলাফল এমন হতে পারে না। এটা নিঃসন্দেহে খারাপ।’
তিনি বলেন, ‘হেড মিস্ট্রেসইতো ঠিকমতো থাকেন না। বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি কথা শোনেন না।’
বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান ইউএনও।

আরও পড়ুন