মসজিদ নির্মাণ কাজে তারা সবাই ‘স্বেচ্ছাশ্রমিক’

আপডেট: 01:23:58 30/07/2018



img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ’- ফজরের নামাজ শেষে ইমাম সাহেব সালাম ফেরালেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা নেই পাইকগাছার কপিলমুণি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদের মুসল্লিদের। মসজিদ থেকে বেরিয়ে যুবক কিংবা বৃদ্ধ সব বয়সীরা ঝুড়ি-কোদাল হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন কপোতাক্ষ তীরবর্তী বাইপাস সড়কের দিকে; দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ কাজের শুরু হয়েছে যেখানে।
তখনো নির্মাণ কাজের মূল শ্রমিকদের কর্মস্থলে আসতে কয়েক ঘণ্টা বাকি। কিন্তু কাজ শুরু করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিছু অপেশাদার ‘শ্রমিক’। যেখানে বয়স কিংবা মর্যাদার কোনো ভেদাভেদ নেই। এক আল্লাহর সন্তুষ্টি আর দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন লালন করে তারা মিলেছেন এক কাতারে। এটা মসজিদের মাটি ভরাট কাজের চিত্র। প্রত্যেকের অগোছালো কাজের মাঝেও রয়েছে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে মুসল্লিদের ঐক্যবদ্ধ স্বেচ্ছাশ্রমের দৃষ্টিনন্দন চিত্র ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে যায় প্রাতঃকালীন পথচারীদের চলা। কেননা, শুধু নামাজ নয়, নামাজের ঘরের জন্য আজ ওরা ঝুড়ি-কোদাল হাতে কাজ করছেন। জনপ্রতিনিধি, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষরা রয়েছেন সেখানে। আলেম-ওলামা আর হাজিরা তাদেরকে এ কাজে যুগিয়েছেন অসীম প্রেরণা। ব্যয়বহুল অসাধ্য সাধনে অনুপ্রেরণায় আত্মবিশ্বাসই যেন আজ ওদের মূল পুঁজি।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ। হজরত পীর জাফর আউলিয়ার স্মৃতিঘেরা কপিলমুণি। ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষের তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ কপিলমুণিতে তখনো মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। মুসলিম সস্প্রদায়ের হাতেগোনা বসতি। তাও আবার দক্ষিণ জনপদের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে। সঙ্গত কারণেই এখানে তখনো মুয়াজ্জিনের মধুর কণ্ঠে ভেসে আসে না আজানের ধ্বনি। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে দূর-দুরান্ত থেকে আসা মুসলমানদের নামাজ আদায় করতে হতো তাদেরই পানসী নৌকাতে।
খরস্রোতা কপোতাক্ষে নোঙর ফেলেছে সারি সারি পানসী নৌকা। সূর্যের হেলে পড়া দিক বিবেচনায় পানসী নৌকার ওপর নামাজে দাঁড়িয়েছেন গুটিকয়েক ‘হাটুরে’। তড়িঘড়ি ওজু সেরে জামাতে শরিক হতে জনপদের নিকটবর্তী দু’একজন বাসিন্দার ব্যস্ততা হয়তো চোখে পড়তো। তাদেরই একজন আলহাজ মো. এরফান আলী মোড়ল (৯২)। প্রত্যুষে প্রাণের টানে তিনিও এসেছিলেন কপিলমুণি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদের পুনঃনির্মাণে স্বেচ্ছাশ্রমে মুসল্লিদের উৎসাহ দিতে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি নিজের অজান্তেই নাম লেখান শ্রমিকদের কাতারে। আর এতেই সংশ্লিষ্টদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে তুঙ্গে ওঠে।
বয়োবৃদ্ধ আলহাজ মো. এরফান আলী মোড়ল জানান, সেদিন মাত্র এক টাকা সেলামি দিয়ে আধুনিক কপিলমুণির প্রতিষ্ঠাতা রায় সাহেব বিনোদবিহারী সাধুর ছেলে গোষ্ঠবিহারী সাধুর কাছ থেকে কপোতাক্ষ পাড়ে জমি কিনে এখানে মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন আলহাজ কাদের বক্স মুন্সী ও গাজী হারান উল্লাহরা (হারান গাজী)। বাঁশের খুঁটি, হোগলা পাতার বেড়া আর গোলপাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি হয় গুরুত্বপূর্ণ এই মোকামের প্রথম মসজিদ। প্রতিষ্ঠার পর সেদিন প্রথম জুমার নামাজের ইমামতি করেছিলেন মুন্সী জসিম উদ্দিন। নগর শ্রীরামপুরের কপিল উদ্দিন সরদারের পর মাত্র আট টাকা বেতনে গোলাবাটির জহর আলী বিশ্বাস ‘আসসালাতু খয়রুম মিনান নাউম’ ধ্বনিতে ঘুম ভাঙাতেন জনপদের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। পরে এই ধর্মীয় কাজে যুক্ত হন আলহাজ মো. এরফান আলী মোড়ল, পরশউল্লাহ মোড়ল, শেখ আবুল হোসেন ও শেখ আবু তালেব। এরও পর মসজিদ আধুনিকায়নে এগিয়ে আসেন শেখ আমজাদুর রহমান, আলহাজ মোকছেদ আলী সরদার, আলহাজ নেছার আলী গাজী, আলহাজ ওয়াজেদ আলী হাজরাসহ এলাকার অনেকেই- জানালেন আলহাজ এরফান আলী মোড়ল।
মসজিদ কমিটির বর্তমান কোষাধ্যক্ষ শেখ আবদুল ওয়াহিদ ও এইচ এম শফিউল ইসলাম জানান, নির্মাণাধীন মসজিদটি পাঁচতলাবিশিষ্ট হবে। সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ শেষ হলে মসজিদে একসঙ্গে দেড় হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। থাকবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আধুনিক ফিটিংস। ফলে মসজিদটি হবে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। কাজ শেষ করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা।
মসজিদ কমিটির এক উপদেষ্টা জানান, সবার সহযোগিতায় দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে নির্মাণ কাজ। নির্মাণ কাজ শেষ করতে বিপুল টাকা দরকার। সে জন্য তিনি সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।
ইচ্ছুকরা কপিলমুণি বায়তুচ্ছালাম জামে মসজিদ, হিসাব নম্বর- ০২০৮১২২০০০০১১১১, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, কপিলমুণি শাখা, খুলনার মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন।