মহেশপুরের গ্রামে সুদখোরদের রমরমা

আপডেট: 03:00:19 31/08/2017



img

মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : মহেশপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী লেবুতলা গ্রামের এক সুদখোরের অত্যাচারে বেশ কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সুদখোরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ গ্রামে থাকা সাধারণ মানুষ।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, লেবুতলা গ্রামের আফছার আলীর ছেলে এলাকার চিহ্নিত সুদখোর আব্দুল গনি একই গ্রামের আজিজুল ও শফিকুলকে ব্যবসা করতে সুদের বিনিময়ে দুই লাখ টাকা ধার দেন। অভিযোগ করা হচ্ছে, ওই দুই ব্যক্তি সুদের টাকা পরিশোধ করার পরও তাদের বাবার নামে থাকা একবিঘা জোর করে লিখে নিয়েছেন গনি। পরে অবশিষ্ট ভিটেবাড়ির জমি লিখে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ায় রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায় পরিবার দুটি। তখন থেকে চার বছর হলো পলাতকদের কোনো খবর নেই।
বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, দুটি আধাপাকা বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিবেশী হালিমা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শফিকুল ও আজিজুল আব্দুল গনির কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করতেন। তবে তারা গনিকে প্রতিমাসে সুদের টাকা দিতেন নিয়মিত। পরে দেনার দায়ে শফিকুল দুই মেয়ে ও এক ছেলে আর আজিজুল দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে চার বছর আগে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। গ্রামে থেকে যান তাদের বাবা-মা।
এলাকাবাসী জানান, গনিসহ কয়েকব্যক্তি তাদের বাবার কাছ থেকে একবিঘা জমি লিখে নেওয়ার পর ভিটেবাড়িও লিখে নিতে জুলুম শুরু করেন। বাধ্য হয়ে তাদের বাবা-মাও বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করে এলাকার আব্দুল গনির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জুলুম অত্যাচারের অভিযোগ আনেন।
তারা জানান, প্রায় এক বছর আগে মাঠিলা গ্রামের জনৈক সিরাজুলকে নিমগাছে বেঁধে সুদের টাকা আদায় করেছেন আব্দুল গনি। মাঠিলা গ্রামের হবকুলের ছেলে রাজ্জাককে সুদের টাকার জন্য অপহরণ করে ১৫ দিন আটকে রাখেন গনি। পরে গনি তার তিন বিঘা জমি জোর করে রেজিস্ট্রি করে নেন।
লেবুতলার একটি সরকারি জলাশয়কে (বিল) কেন্দ্র করে এলাকায় মাইকে প্রচার করে মৃত ইলিয়াস আলী মল্লিকের ছেলে মিজানুর রহমানের কাছে গনি ও তার সাঙ্গাতরা দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আব্দুল গনি সরকারি দলের সমর্থক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করতে সাহস পাননি।
নির্যাতিত আরেক ব্যক্তি এলাকার মতেহার মণ্ডল। তিনি বাড়ি ছেড়ে ছয় কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে পালিয়ে আছেন সপরিবারে। পরে সেখানে গিয়ে স্বামীস্ত্রীকে পাওয়া যায়। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মতেহার মণ্ডলের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী ছেলেদের সাথে আলাদা। ছেলেরা দেনা করার কারণে লেবুতলা গ্রামের আব্দুল গনি, রশিদরা আমাদের একবিঘা জমি দখলে নিয়েছে। আমার ছেলেরা সাত লাখ টাকা দেওয়ার পরও তারা আরো টাকা দাবি করে। ভিটের জমি গনির নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। তাই ওদের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসে অন্যের জমিতে থাকছি। ওখানে থাকলে আমাদের মেরে ফেলতে পারে।’
যোগাযোগ করা হলে আব্দুল গনি সুদের কারবারের কথা স্বীকার করেন। তবে কাউকে এলাকা থেকে বিতাড়নের কথা অস্বীকার করেন তিনি।
গনি বলেন, ‘আমি সুদ খাই। তারা আমার কাছ থেকে সুদে দুই লাখ টাকা নিয়েছিল। আমার মতো আরো অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দিতে না পারার কারণে তারা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।’
সিরাজ নামে এক ব্যক্তির ওপর জুলুমের বিষয় উত্থাপন করলে গনি বলেন, ‘তার কাছ থেকে সুদের টাকা আদায় হয়ে গেছে।’
রাজ্জাক নামে একজনকে অপহরণ করে ১৫ দিন আটকে রেখে তিন বিঘা জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে গনির ভাষ্য, ‘তাকে অপহরণ করা হয়নি। তবে তিন বিঘা জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।’
মসজিদের মাইকে মিজানুরের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটি সরকারি বিলকে কেন্দ্র করে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে গ্রামের ঈদগাহ সংস্কারের জন্য।’
অন্য এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি তো একা সুদ খাই না। এই গ্রামের আব্দুর রশিদ, আব্দুর রহিম, শরিফুল, মনি, ফজর আলী, ইদ্রিস, আবু কালাম, আশাদুল, নাজিম, বিপুলসহ আরো অনেকে সুদের কারবার করে।’
যাদবপুর ইউনিয়নের লেবুতলা ও মাঠিলা গ্রামের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, ‘কারো কারো কাছে সুদের কারবারিরা টাকা পাবে বলে শুনেছি। তবে কেউ বাড়িছাড়া কিনা আমার জানা নেই।’

আরও পড়ুন