মাগুরায় কাত্যায়নী উৎসবে জনস্রোত

আপডেট: 08:24:17 10/11/2016



img

শিমুল হাসান, মাগুরা : জনস্রোত নেমেছে মাগুরার রাস্তায় রাস্তায়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত এমনকী শেষ রাত, মানুষের কমতি নেই।
মাগুরা শহরের একপ্রান্তে সাতদোহাপাড়া, অপর প্রান্ত তিন কিলোমিটার দূরে বাটিকাডাঙ্গা। গোটা এলাকার অলিগলি কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শুধুই মানুষের মিছিল। এ মণ্ডপ থেকে ও মণ্ডপে ছুটছে মানুষ। মানুষের ক্লান্তিহীন এ মিছিল আনন্দের। এ মিছিল উৎসবের। এ মিছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। এ মিছিলে ভেদাভেদ নেই হিন্দু-মুসলিম বা বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের।
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী পূজা উপলক্ষে গত মঙ্গল ও বুধবার ছোট্ট শহর মাগুরা যেন মানুষের ঢেউয়ে উপচে পড়ছিলো। সারাদেশের মানুষের পাশাপাশি ভারত থেকেও অসংখ্য দর্শনার্থী এসেছিলেন মাগুরায়।
জেলা সমন্বিত কাত্যায়নী পূজা কমিটির আহ্বায়ক পঙ্কজ কুণ্ডু জানান, সারাদেশে দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাম্বলীদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও মাগুরায় এর ব্যতিক্রম। দুর্গাপূজার ঠিক এক মাস পরে একই তিথিতে ব্যাপক আয়োজনে পাঁচ দিন ধরে অনুষ্ঠিত কাত্যায়নী পূজা মাগুরার হিন্দুদের সবচে’ বড় উৎসব।দিনে দিনে যা জেলার সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
কাত্যায়নী উৎসব মাগুরা জেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে মজবুত করেছে বলে দাবি করেন পঙ্কজ কুণ্ডু।
৭০ বছর ধরে জেলার সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যা প্রচলন করেছিলেন মাগুরা শহরতলীর পারনান্দুয়ালী গ্রামের সতীশ মাঝি।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব কুণ্ডু জানান, এ বছর মাগুরা পৌর এলাকায় ১৪টিসহ জেলায় ৮৪টি মণ্ডপে কাত্যায়নী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৬ নভেম্বর শুরু হয়ে এ পূজা শেষ হচ্ছে ১০ নভেম্বর রাতে।
নতুন বাজার ছানাবাবু বটতলা পূজা কমিটির নেতা ও সদর উপজেলা পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পার্থসারথী বিশ্বাস জানান, তারা ধর্মীয় কাহিনি অবলম্বনে প্রতিমা ও গেট-প্যান্ডেল নির্মাণ করেছেন। বর্ণিল অলোকসজ্জা, ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের নানা ডিসপ্লে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এ বছর যেমন আয়োজনের ব্যাপকতা বেড়েছে। তেমনি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সারাদেশ এমনকী ভারত থেকে লাখ লাখ দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছে। শুধু হিন্দু নয় শহরের প্রায় প্রতিটি মুসলিম বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনেরা আগমন ঘটেছে।
তিনি জানান, গত মঙ্গলবার অষ্টমী ও বুধবার নবমীর রাতে শহরে মানুষের ঢল ঠেকাতে ভলেনটিয়ার, আনসার, পুলিশ হিমশিম খেয়েছেন। কয়েকটি পূজামণ্ডপ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে একস্থানে অবস্থান করে রীতিমতো যুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। ভিড়ের চাপে অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়েছেন।
দেবীরানী নামে এক গৃহবধূ জানান, তিনি ফেনীর মেয়ে। বিয়ে হয়েছে চট্টগ্রামে। স্বামীর সঙ্গে সোমবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে কাত্যায়নী পূজা দেখতে মাগুরা এসেছেন। তিনি পূজার আয়োজন দেখে, বিশেষ করে মানুষের ঢল দেখে অভিভূত হয়েছেন জানিয়ে বলেন, ‘গোটা বিষয় আমি এতো এনজয় করেছি, যা সারা জীবনে ভুলতে পারবো না।’
খুলনার ডুমুরিয়ার উপজেলার সাইফুল ও সঞ্জয় নামে দুই যুবক জানান, তাদের এলাকা থেকে এক সঙ্গে পাঁচটি বাস ভরে লোক এসেছে মাগুরায় কাত্যায়নী পূজা দেখতে।
সাতক্ষীরার জেলার কালিগঞ্জের মুন্সিগঞ্জ এলাকার মনোজিৎ ও জয়নাল নামে দুই ব্যাক্তি জানান, তারা প্রায় একশ’ জন গাড়ি রিজার্ভ করে এসেছেন। এদের মধ্যে হিন্দু ছাড়াও মুসলিমও রয়েছেন।
ঝিনাইদহের কাজল বসু জানান, সস্ত্রীক মাগুরায় কাত্যায়নী পূজা দেখতে এসেছেন। ভীড়ের কারণে তিনি মাত্র দুটি মন্দিরে ঘুরেছেন। নতুনবাজার বটতলা মন্দিরের হনুমানের হাতের উপর পাহাড়সদৃশ গেট-প্যান্ডেল ও জামরুলতলা মাটির প্রতিমার ডিসপ্লের মাধ্যমে অসূর নিধন চমৎকার লেগেছে।
তিনি জানান, মাগুরার পূজার এ আয়োজন ভারতের বড়-বড় পূজাকে হার মানিয়েছে।
মাগুরার পুলিশ সুপার মুনিবুর রহমান রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া গোটা এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে।
বুধবার রাতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর মাগুরায় কাত্যায়নী পূজা দেখতে এসে বলেন, ‘আমি ব্যাপক আয়োজন ও মানুষের ঢল দেখে অভিভূত হয়েছি।’

আরও পড়ুন