মাগুরা শিক্ষা অফিসের দুই কর্তার অবাধ ঘুষবাণিজ্য

আপডেট: 09:32:53 29/05/2018



img

মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। এই দুই কর্মকর্তা হলেন, জেলা শিক্ষা অফিসার রণজিৎকুমার মজুমদার ও ইনসপেক্টর এসএম মাজেদুর রহমান।
অভিযোগ, এই দুই কর্মকর্তা প্রায় প্রতিদিন স্কুল-মাদরাসা পরিদর্শনের নামে হাজার-হাজার টাকা ঘুষ নিচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষক এমপিওভুক্তি ও স্কুল-মাদরাসার ভবন নির্মাণের তদবির করার নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
মহম্মদপুর উপজেলার পাল্লা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৈয়দ শওকত আলী অভিযোগ করেন, ৪-৫ মাস আগে বিদ্যালয় পরিদর্শক মাজেদুর রহমান তাদের স্কুলে আসেন মাদকবিরোধী সমাবেশে। সমাবেশ শেষে বিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে আপ্যায়নকালে শিক্ষকদের মাঝে তিনি নিজেকে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পরিচয় দেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ খালি থাকায় সহকারী শিক্ষক জাকির হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। চলে যাওয়ার সময় মাজেদুর রহমানকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দেন জাকির হোসেন।
মহম্মদপুরের ধোয়াইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি জেলা শিক্ষা অফিসার রনজিৎ মজুমদার ও স্কুল পরিদর্শক মাজেদুর রহমান তার স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় স্কুলের পক্ষ থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক ওলিয়ার রহমান তাদের আড়াই হাজার টাকা ‘সম্মানী’ দেন।
সদরের দক্ষিণ মির্জাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসার ও স্কুল পরিদর্শক দুইবার তার স্কুল পরিদর্শনে আসেন। স্কুলের বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি ও গ্যারেজ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ এনে দেওয়ার নামে দুই বারে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাদের।
মহম্মদপুরের ঘোষপুর গ্রামের অভিভাবক আজাদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঘোষপুর রিজিয়া রুবিয়া দাখিল মাদরাসার সভাপতি ও ম্যানেজিং কমিটি জাল নিবন্ধন সনদের মাধ্যমে আব্দুল ওহাব মিলন নামে একজনকে প্যাটার্নবহির্ভূতভাবে চতুর্থ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। দাখিল মাদরাসায় চতুর্থ শিক্ষক নিয়োগের কোনো সুয়োগ নেই। এ অনিয়মের সুযোগে অবৈধ এমপিওভুক্ত ওই শিক্ষকের কাছ থেকে জেলা শিক্ষা অফিসার প্রতিমাসে মাসোহারা নিয়ে থাকেন।
জেলা শিক্ষা অফিসার ও স্কুল ইনসপেক্টরের নামে এ ধরনের কমপক্ষে আরো অন্তত ৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
তবে অভিযুক্ত স্কুল পরিদর্শক মাজেদুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, ‘আমি জেলা শিক্ষা অফিসারের আজ্ঞাবহ। তিনি যে স্কুল-মাদরাসায় সাথে নিয়ে যান, সেখানেই যাই। টাকা-পয়সা শিক্ষা অফিসার মূলত তার ড্রাইভারের মাধ্যমে ম্যানেজ করেন। সব টাকা ড্রাইভার গ্রহণ করেন।’
স্কুল-মাদরাসা থেকে নেওয়া কোনো টাকা তিনি নেন না বলে দাবি করেন স্কুল পরিদর্শক মাজেদুর।
তবে জেলা শিক্ষা অফিসারের ড্রাইভার মো. শাহিদুল ইসলাম দুর্নীতির জন্য সরাসরি পরিদর্শক মাজেদুর রহমানকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা অফিসার রণজিৎ কুমার মজুমদার ও পরিদর্শক এসএম মাজেদুর রহমান স্যার প্রতিমাসে কমপক্ষে ৪০টি স্কুল-মাদরাসা পরিদর্শন করেন। সব কিছুই মাজেদ স্যার ম্যানেজ করেন। তিনি স্কুল-মাদরাসা পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বড় স্যারের সম্মান রাখার জন্য টাকা দেওয়ার কথা বলেন। তবে এটা সত্য কোনো স্যারই সরাসরি টাকা নেন না। ড্রাইভারের (আমার) হাতে টাকা দিতে বলেন। স্যারের পূর্ব নির্দেশে আমিই সব টাকা নিই। তবে গাড়িতে উঠেই বড় স্যার আমার কাছ থেকে সব টাকা নিয়ে নেন। পরে এ টাকা থেকে মাজেদ স্যারকে ভাগ দেন। আমাকেও মাঝে মধ্যে দুই-একশ টাকা বকশিস দেন।’
তিনি বলেন, ‘মাসে স্কুল পরিদর্শন থেকে দুই স্যার গড়ে ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন। এছাড়া স্কুলের বিল্ডিং এনে দেওয়া ও শিক্ষক এমপিওভুক্তির জন্য বড় স্যার মোটা অংকের ঘুষ নেন। তার সব অনৈতিক কাজের সঙ্গী স্কুল পরিদর্শক মাজেদ স্যার।’
জেলা শিক্ষা অফিসার রনজিৎকুমার মজুমদার দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে বক্তব্য চাইলে মাগুরা জেলা প্রশাসক আতিকুর রহমান বলেন, জেলা শিক্ষা কমকর্তা রণজিৎকুমার মজুমদার ও পরিদর্শক মাজেদুর রহমান বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে অর্থ নিচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন