মানবিক উৎকর্ষ সাধনে অবারিত সুযোগ

আপডেট: 11:08:51 01/06/2018



img

এম মোহাম্মদ : পক্ষকাল পেরিয়ে যাচ্ছে পবিত্র রমজানের। অতিক্রান্ত হচ্ছে মাগফেরাতের পাঁচ পাঁচটি রোজা।
প্রতিবছর রমজান মানুষের দুয়ারে মানবিক উৎকর্ষ সাধনের এক অবারিত সুযোগ এনে দেয়। সাম্যবাদের দীক্ষা সামাজিকভাবে প্রতিজনের ভেতরে প্রতিস্থাপিত হয়। এখানে প্রজার জন্য এক রকম, রাজার জন্য আরেক রকম রোজা পালন করতে হবে, এমন নির্দেশনা নয়। সুবহে সাদেক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজাদার মাত্র পানাহার বর্জন করে সিয়াম পালন করে। সামাজিক শৃঙ্খলা প্রণয়নে অনুপম মওকা তৈরি হয় এখানে। এ সুযোগ সবার কাজে লাগানো প্রয়োজন। বিশ্বের সব জাতি যখন তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে ব্যস্ত, তখন আমাদের ভূমিকা কী? আমরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে জাতীয় স্বার্থের মূলে কুঠারাঘাত করছি। আমরা পরস্পর ক্ষুদ্র বিষয়ে দ্বন্দ্ব ও কলহে লিপ্ত হচ্ছি। খুন, সন্ত্রাস, ঘুষ, কালোবাজার, চোরাকারবার ও পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষক্রিয়া সঞ্চারিত করছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সমাজ থেকে ক্রমশ সুকুমার বৃত্তি, মূল্যবোধ ও মানবতাবোধ নির্বাসিত হচ্ছে।
সমাজের এ অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বাঁচার কোনো উপায়ই কি নেই? আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি সমাজের এ নৈরাজ্যের মূল কারণ কী? সমাজের এ দুষ্ট গ্যাংগ্রিন দূর করে কি মানুষের জন্য সুস্থ সমাজ ও সুশীল সমাজ গঠন করা যায় না? মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত আল-কুরআনের প্রদর্শিত জীবনবোধ এবং মহানবীর (সা.) প্রদর্শিত সহজ-সরল নিশ্চিত সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ও স্খলিত।
মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি জাগতিক কাজের সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত নিখুঁত নির্দেশিকা মানুষের জীবন উপযোগী করে বলে দেওয়া হয়েছে। পাপ-পুণ্য, হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ, নৈতিক-অনৈতিক, মায়া-মমতা, সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, শান্তি-শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মানবতা ও মূল্যবোধ ইত্যাদির সঠিক অনুশীলন ও প্রায়োগিক কৌশল আল-কুরআন এবং আল-হাদিসে বিশদভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। বস্তুত অপরাধ প্রবণতার অন্যতম উৎস মানুষের সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে নিহিত আর সে বোধ মানুষের অভ্যন্তরীণ অপরাধ প্রবণতার মানসিক প্রবৃত্তিজাত।
ইসলামি বিধান মানেই শান্তির বিধান, আল্লাহ্‌র হুকুমতে আত্মসমর্পণের বিধান। এ বিধানে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। জনকল্যাণ, জননিরাপত্তা, মানব মর্যাদা সেখানে পূর্ণস্বীকৃত। এ বিধানে বান্দার তাকওয়ার প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আর তাকওয়ার সর্ববিধ আয়োজন শিক্ষা ও জ্ঞাননির্ভর। মানবাধিকার, ইনসানিয়াত ও হারাম-হালাল, সীমিত সংযত জীবন-যাপনই তাকওয়ার মূল উদ্দেশ্য। মানুষের অহঙ্কার, আত্মাভিমান সে বিধানে নিষিদ্ধ। চরিত্র গঠন ও নৈতিকতা বজায় রাখাই বিধিসম্মত। শিষ্টের পালন, দুষ্টের দমন; ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিলোপ সাধন; হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ধারণ করে সত্য প্রতিষ্ঠা এবং অসত্যের বিনাশ সাধন এ বিধানের অন্যতম অমোঘ উপাদান।
ছোট-বড়, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এ বিধানে নেই। সমাজের অক্ষম, অসহায় এতিমদের সাহায্য করা, দুখী ও মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করা, সহনশীলতা, বিনয়-নম্রতা, ধৈর্য ও শিষ্টাচারের অনুশীলন এ নীতির আদর্শ। পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য, সংহতি ও শৃঙ্খলাবোধ, অত্যাচার, জুলুম এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এ সমাজের বিধানের অবশ্য কর্তব্য। মিথ্যাচার, পরচর্চা, গিবত, চুরি, মজুতদারি, কালোবাজারি, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, ব্যভিচার ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন এ জীবনধারার অন্যতম অবশ্য পালনীয় বিধান। বান্দা নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে; আমানতের খেয়ানত করবে না ও ওয়াদা খেলাফ করবে না। অর্থনীতি ও সমাজজীবনে সবার সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। স্বদেশ ও বিশ্বমাবতার কল্য্যাণে জ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি, মেধা ও শক্তি ব্যয় করবে। বিশ্বাসঘাতকতা পরিহার করবে। হাতে, মুখে, কাজে ও আচরণে অপরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।
মহানবী (সা.) যুগ যুগ ধরে বিবাদ-কলহে লিপ্ত, গোত্রে গোত্রে বিভক্ত, পরস্পর যুদ্ধরত অজ্ঞ বেদুঈনদের অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান দিয়েছিলেন। তিনি এক দুর্ধর্ষ উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে সুসংহত, সুশৃঙ্খল, কর্মমুখী, সৎ, সুখী আদর্শ জাতিতে পরিবর্তিত করেছিলেন। তার জীবনের আদর্শ, নীতি, আচরণ, ভূমিকা, কর্ম ও ত্যাগের মহিমায় এবং সর্বোত্তম নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি এ কাজে সমর্থ হয়েছিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ও মহানবী (সা.) প্রদর্শিত পথই মানবতার মুক্তির একমাত্র উপায়। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা Complete code of life প্রদান করে এবং তার প্রেরিত রাসুলের (সা.) জীবনে বাস্তবায়িত করে তাই দেখিয়ে দিয়েছেন। এর বাস্তবায়নেই সুশীল সমাজ গঠনের সাফল্য নিহিত।
আল-কুরআনুল করিমে বিধৃত এবং আল-হাদিসে বিবৃত মুমিন ও মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় বিধানগুলোর মধ্যে সিয়াম সাধনা অন্যতম। এর মধ্যে আমাদের বর্তমান সমাজের যাবতীয় গলদ দূর করে ভবিষ্যৎ সুশীল সমাজ গঠনের যে সব উপাদান রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
ইসলাম যে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার দুটি সালাত ও সিয়াম। আর জাকাত ও সাদকা প্রদান এবং হজব্রত পালন এ দুটি হলো হক্কুল ইবাদ। বান্দা প্রথমে বিশ্বাস করবে, ইমান আনবে, তারপর বাকি চারটির অনুশীলন বা আমল করবে। আপনি যদি বিশ্বাসই না করেন, ইমানই না আনেন, তবে এসব করা-না করার নির্দেশ আপনার ওপর বর্তায় না।
স্রষ্টা ও প্রতিপালকের প্রতি সৃষ্টির হক আদায়ের পরিপ্রেক্ষিতই সালাত ও সিয়াম অবশ্য পালনীয় বা ‘ফরজ’রূপে স্বীকৃত হয়েছে। আর কুরআনে ‘আকিমিস সালাতা’ বলে সালাত প্রতিষ্ঠার জন্য বহুবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ সালাত মুত্তাকি হওয়ার পথে অবশ্য পালনীয় সহায়ক। জাগতিক জীবনে সালাত কী প্রয়োজন সাধন করে? সালাত মানুষকে মুত্তাকি ও মুমিন হওয়ার অর্থাৎ প্রকৃত মুসলিম তথা সত্যিকার মানুষ হওয়ার পথ পরিষ্কার করে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘ইন্নাস্ সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ে ওয়াল মুনকার’। অর্থাৎ সালাত নিশ্চয় অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। সঙ্গে সঙ্গে সিয়াম মানুষকে মানুষ হতে মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। যাবতীয় পশুত্বকে বিষর্জন দিতে সে উৎসাহ যোগায়। তাকওয়ার ভিত্তিতে সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়।

আরও পড়ুন