মামুন আজাদের তিনটি অনুগল্প

আপডেট: 09:36:52 19/06/2017



img

তলোয়ার গাছ

অনেক আগে দেশটা ছিল সোনায় মোড়া। সোনার গাছ, সোনার ফল দিব্যি ভিতরে শাঁসালো আঁশ। মানুষের জটিল মনস্তাত্তিক সমীকরণে দেশবাসী বেশ সুখে ছিল।
হঠাৎ সোনার লোভে হাজার হাজার জাহাজ এলো সাত-সমুদ্দর পাড় থেকে। পাল তোলা জাহাজে সাদা ইঁদুর। ইঁদুরগুলো এদেশের মাটির স্পর্শে মানুষের মতো হয়ে গেলো। এদিকে এদেশের মানুষগুলো যেহেতু পলি মাটির তৈরি তাই বেশ সহজ সরল। ধূর্ত ইঁদুররূপী মানুষগুলো খুব সহজেই ভাতের জায়গায় ব্রেড, পানির জায়গায় চা কিংবা ওয়াইন আর
মহাদেবের সিদ্ধি দিয়ে বশ করলো এদেশ। সোনার দেশকে ওরা মুড়ে দিলো রুপা দিয়ে। তারপর এদেশ থেকে সব সোনা জাহাজ ভর্তি করে নিয়ে গেলো। পলি মাটির মানুষগুলো আস্তে আস্তে এঁটেল মাটির মতো শক্ত হয়ে গেলো। শক্ত এঁটেল মাটির ঢেলার গুতোয় সাদা মানুষগুলো ইঁদুর হয়ে পালালো নতুন বানানো উড়োজাহাজে ।

এরপর আসলো খচ্চরের দল। সাধারণ খচ্চরের চেয়ে বুদ্ধিমান আর ধূর্ত। জলপাই রঙের খচ্চরগুলো এদেশের সহজ মানুষগুলোকে বোকা বানালো ঘোড়ার ডিম দেখিয়ে। ডিমের ভেতরে ‘সম্রাট শাহজাহানের কোহিনূর’ আছে বলে লোভ দেখালো ওরা। প্রতিটা ডিমে একটা করে হীরা, সে এক তেলেসমাতি কারবার! কিন্তু মাত্র দু-যুগ পেরোতেই এঁটেল মাটির মানুষের এঁটেল ঢেলায় ভেঙে গেলো ডিমগুলো। কী আশ্চর্য! ডিমের ভেতরে ‘কোহিনূর’ তো দূরের কথা, কুসুমও নেই। রাগে ক্ষোভে এঁটেল মাটির মানুষ থেকে ওরা হয়ে গেলো কংক্রিটের মানুষ। কংক্রিটের আঘাতে দাঁত ভাঙার ভয়ে খচ্চরগুলো পালালো লেজ গুটিয়ে। সাদা ইঁদুরের মতো খচ্চরগুলোও এদেশে থেকে রুপাগুলো চুরি করলো। রুপার স্থানে ওরা রেখে গেলো তামা!

কংক্রিটের মানুষগুলো তাতেই খুশি। খচ্চরগুলো তো গেছে! তারপর থেকে এদেশের মানুষগুলো সব কংক্রিটের আর মাটিগুলো সব তামার। তামার মাটিতে তামার গাছ, তামার ফসল, তামার ফল। ফলগুলো আগের মতো সুস্বাদু না। তারপরও সহজ সরল মানুষগুলোর দিন কাটতে লাগলো সোনার স্বপ্নে।

অনেকদিন পর এক বাজিকর আসলেন কংক্রিটের দেশে তামার দেশে। তার অদ্ভুত ভোজবাজির খবর খুব দ্রুত রটে গেলো ডিজিটাল নিয়মে।

বিভিন্ন গন্ধ, বর্ণ, আকার সমস্যার লোক আসতে লাগলো জাদু দেখার মোহে। অন্ধ আসলো ছাগলের ম্যাঁ ম্যাঁ ডাক শুনতে শুনতে। বধির আসলো গাধার পেছন পেছন, বাতের রোগী আসলো বেয়ারিং গাড়িতে শ্যালো ইঞ্জিন লাগিয়ে। জ্বিনে ধরা নায়িকা আসলো হাসতে হাসতে। নতুন ওয়েলকাম টিউনের জন্য নায়িকার অদ্ভুত হাসি রের্কড করতে পিছে পিছে আসলো নতুন আসা মোবাইল কোম্পানির সিইও। হাজার পাওয়ারের চশমা পরে নায়ক আসলো খেলনা পিস্তল নিয়ে। সাদা টুপি পরা মৌলভি পকেটে পাথর নিয়ে। পৈতা পরা বামুন, এমবিএ পড়া ছাত্র, গরুর মাংস রান্নায় ওস্তাদ গৃহিণী, নোবেল পাওয়া কবি, মেডেল বোঝাই বুদ্ধিজীবীসহ আরো অনেকে আসলো বাজিকরের তেলেসমতি কারবার দেখতে।

বাজিকর সবার চোখে চশমা এঁকে দিলো! কী আশ্চার্য! কংক্রিটের মানুষগুলো দেখলো তাদের দেহ আবার সহজ সরল পলি মাটির হয়ে গেছে, তাদের দেশ আবারো হয়ে গেছে স্বর্ণের।

বেশ কিছুদিন কাটলো স্বপ্নের ঘোরে।

হঠাৎ বাজিকরের বোগলের তলায় থাকা বাদুড়গুলো দিনের বেলা স্বপ্ন দেখলো ওদের। পরদিন রটে গেলো সারাদেশ। আসামি ধরা পড়েছে। এক জোড়া যুবক-যুবতী জাদুর চশমা চোখে দেয়নি, সেটা প্রথম মাত্রার অপরাধ। গাছের তলায় বসে ওরা আলাপ করছে গাছের রঙ নিয়ে, মাটির রঙ নিয়ে! কী স্পর্ধা! অক্টোপাসকে ডাকা হলো, গ্রেফতার হলো যুবক-যুবতী। অপরাধ পঞ্চম মাত্রার। বাজিকর আসলেন, ডাকা হলো ঘুঘরো পোকাদের, মাটির তলা থেকে বের করা হলো স্বপ্নে পাওয়া কিতাব। মহামান্য কিতাব খুললেন। সমবেত জনতার রের্কড করা সমর্থনে লাইভ অনুষ্ঠানে অপরাধীদের মারা হলো। ওদের কবর দেওয়া হলো শহরের সবচে’ মনোমুগ্ধকর পার্কে। যাতে সবাই দেখে শেখে অবাধ্যতার শাস্তি।

কিছুদিন পর অবাক করা ঘটনা ঘটলো, কবর দুটো থেকে জন্ম নিলো আশ্চর্য এক গাছ। গাছ থেকে বের হলো সুগন্ধি ফুল আর ফুল থেকে অবাক করা ফল। ফলগুলো ইস্পাতের ঠিক তলোয়ারের মতো তিক্ষè ধার! বাজিকর যতোই গাছটা কেটে ফেলে ততোই ‘হাইড্রা’র মতো ডাবল হয়ে জন্মায়। বিস্মিত বাজিকর তার সকল পোষা কুকুর, শিয়াল, বাদুড়, পেঁচা এমনকি আগুনমুখো ড্রাগন রাখলো গাছটির পাহারায়।
তবে সবাইকে আতঙ্কিত করে প্রতি রাতে চুরি হতে লাগলো ইস্পাতের তলোয়ার।




ছায়ার পেছনে

আরো একটি ফাইল এন্ট্রি হলো থানায়। ‘ফেসবুক’ থেকে চোখ নামালেন ডিউটিরত অফিসার। নির্দিষ্ট ফোল্ডার থেকে ‘উপর’ থেকে আসা সফটওয়্যারে কপি পেস্টে শুধু নাম চেঞ্জ করে প্রিন্ট দিলেন কাগজে। তল্পিবাহক সাংবাদিক নিজের বখরাসহ পেটমোটা খামটি পেল থানা থেকে। ছবিওয়ালা চকচকে নোটগুলো গুনে গুনে পকেটে পুরলেন তিনি। পরদিন সংবাদপত্রে নির্ধারিত খুন হয়ে গেল উত্তেজিত জনতার পিটুনি।
যেদিন মহাসড়কের পাশে পাওয়া গেল নিখোঁজ কাশেমের লাশ, বাড়িতে শুরু হলো মাতম। কাশেমের অবুঝ মেয়েটি বুঝলো না কিছু। শুধু বাড়ির উঠানে কাঁচা পুঁতলো একটা বারুদের গাছ ।
নরেনের লাশ যেদিন ভাসলো পৌরসভার পুকুরে, বুকের বাম পাশে কালচে গুলির দাগ। বাড়িতে শুরু হলো মাতম। শুধু নরেনের ছোট্ট ভাইটি মুষ্টিবদ্ধ হাতে তাকালো আকাশের পানে। আর কাঁচা পুঁতলো একটা বারুদের গাছ।

ফজরের নামাজ শেষে আর বাড়ি ফিরলো না সুলেমান মিঞা। দিন শেষে পাওয়া গেল বুটের দাগওয়ালা সফেদ টুপি। বাড়িতে শুরু হলো মাতম। চোখের পানিতে ছোট বোনটি বাড়ির উঠানে কাঁচা পুঁতলো একটা বারুদের গাছ ।
 
হোস্টেলের ছাত্র রমেশ, প্রেসের মালিক মুহিত, মুদির দোকানদার গাফ্ফার শেখরা যেদিন গুম হলো, বাড়িতে বাড়িতে শুরু হলো মার্শিয়া আর পোতা হলো শ’য়ে শ’য়ে বারুদের গাছ ।

নির্ধারিত সময়ে ঈশানকোণে মেঘ হলো আগুন রঙে, তুমুল বর্ষায় ভেসে গেল জমিন।
উর্বর পলিতে ‘জাদুর শিমে’র মতো বারুদ গাছগুলো বড় হলো নিমিষে তারপর নেশায় বুদ হওয়া শোষকের চোখে ধুলা দিয়ে বারুদ গাছ থেকে বারুদগুলো জমা হলো উঁইয়ের ঢিঁবির মতো ।
দূরে ঢং ঢং করে বাজলো গির্জার ঘণ্টা, ভেসে এলো মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজ, মসজিদের সুমধুর আজানের ধ্বনিতে জেগে উঠল সবাই, যারা ঘুমিয়ে ছিল।
দীর্ঘ ছায়া দূর থেকে আস্তে আস্তে ছোট হলো, দৃশ্যমান মানুষটির হাতে মশাল। যার জন্য অপেক্ষায় ছিল জনতা।




সোসাইটি

“নেহি খায়েঙ্গা”
“খালো বেটা, খা-লো...”
আয়েশা চেষ্টা করে তার পাঁচ বছরের ছেলেকে খাওয়াতে।
‘হিন্দি সিরিয়াল’ আর ‘ডরিমন’ দেখে সে আর তার বাচ্চা ছেলেটা হিন্দি বেশ ভালোই শিখেছে।
ওদিকে রাত্রে ‘টক শো’ দিনে পত্রিকায় ঝড় ওঠে, ‘ডরিমন’ বন্ধ করতে হবে, বিজাতীয় ভাষা রুখতে হবে।
বন্ধ হলো ‘ডরিমন’!
আয়েশার ছেলে হিন্দি ভুলে গেছে...
এখন সে গায় ‘জীবন মানে জি বাংলা’...
‘সোসাইটিতে আয়েশার সম্মান বাড়ে।