মার্কিন নির্বাচনের আদ্যোপান্ত

আপডেট: 02:11:17 08/11/2016



img

সাজেদুল হক ও নাজমুল আহসান : দিনটি ছিল অন্যরকম। ২০ জুলাই ১৯৬৯। প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং। বদলে যায় সভ্যতার ইতিহাস। পৃথিবীর মানুষকে চাঁদ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি সেই নীল আর্মস্ট্রংকে অনেকেই বলে থাকেন ‘অনিচ্ছুক মার্কিন নায়ক।’ কারণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। চন্দ্র বিজয় অভিযান নিয়েও খুব বেশি কথা শোনা যায়নি তার কাছ থেকে। মার্কিনিদের চন্দ্র বিজয় অভিযান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। রয়েছে রাজনীতিও।
মার্কিনিদের নিয়ে সারা দুনিয়াতেই কৌতূহল। নানা গসিপ। অনেক কারণ। সবচেয়ে বড় কারণ দুনিয়াব্যাপী তাদের ‘রাজত্ব’। রাজত্ব কথাটিতে হয়তো অনেকেই আপত্তি তুলতে পারেন। কারণ রাজতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের যোজন যোজন দূরত্ব। স্নায়ুযুদ্ধের পর বহুদিন ধরে বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল শেষ কথা। এখন সে যুগে কিছুটা ভাটার টান। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুপার পাওয়ার। সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোট আজ। অন্যসব কিছু ছাপিয়ে যথারীতি এ নির্বাচনও পেয়েছে বৈশ্বিক রূপ। দুনিয়ার কোথায় আলোচনায় নেই এ নির্বাচন নিয়ে? পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ দৃষ্টি রাখছেন এই নির্বাচনের দিকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে হতে চলছেন বিশ্ব মুরব্বি? কে জিতবেন? হিলারি না ট্রাম্প। যেই জিতুন না কেন তৈরি হবে এক নতুন ইতিহাস। হিলারি যদি প্রেসিডেন্ট হন তবে তিনি যে শুধু প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট হবেন তাই নয়। নতুন একটি অধ্যায়েরও জন্ম হবে এতে। একই বিছানায় দুই মার্কিন প্রেসিডেন্ট- তৈরি হবে এমন দৃশ্যপট। হিলারির স্বামী বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট ছিলেন সে কথা হয়তো না মনে করে দিলেও চলবে। অন্যদিকে, ইতিহাসের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন ডনাল্ড ট্রাম্পও। প্রেসিডেন্ট হলে তিনি হবেন হোয়াইট হাউসের প্রথম বাসিন্দা, যিনি এক কৃষাঙ্গ পরিবারের ছেড়ে যাওয়া ভবনে উঠবেন; যাদের প্রতি তিনি পোষণ করেন ঘৃণা।
গণতন্ত্রের মহত্তম উৎসব। সেই উৎসবের প্রিভিউ লিখতে গিয়ে নিল আর্মস্ট্রংকে কেন টেনে আনা হলো সে প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনেই আসতে পারে। কারণ তো একটা আছেই। শুধু রাজনীতি নয়, দুনিয়ার অন্যান্য ময়দানেও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বের আসনে। কিন্তু একটা দিক থেকে মার্কিনিদের খোটা শুনতে হয়েছে অনেকের। এমনকী আমরা, বাংলাদেশের মানুষ আজ থেকে দুই যুগেরও বেশি সময় আগে যা করেছি যুক্তরাষ্ট্র আড়াইশ’ বছরের ইতিহাসে তা করতে পারেনি।  আজও কোনো নারী সরকার প্রধান নির্বাচিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।
এবার কি ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে। বদল হবে ইতিহাসের গতিধারার। নাকি ডেমোক্রেটদের কাছে পরপর দুইবার হারের বদলা নেবেন রিপাবলিকানরা। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। ঘড়ির কাঁটার দিকে দৃষ্টি সবার। জানতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। তবে এবারের নির্বাচনটি নানা দিক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিনব। কদর্যও বটে। মুখোমুখি লড়াইয়ে দুই বিপরীত ধারার রাজনীতিবিদ। যাদের কেন্দ্র করে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্র। যা সমকালীন অতীতে কখনো দেখা যায়নি। একদিকে হিলারি ক্লিনটন। ক্যারিয়ার রাজনীতিবিদ। সাবেক ফার্স্টলেডি। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্যদিকে, ডনাল্ড ট্রাম্প। যার উত্থান আকস্মিক। মূলত ব্যবসায়ী। রিয়েলিটি শো তারকা। কেইবা ভাবতে পেরেছিলেন, ট্রাম্প কোনোদিন হোয়াইট হাউসের এতোটা কাছাকাছি থাকবেন।
মার্কিনিরা ক্রিকেট পছন্দ করেন না। টেস্ট ক্রিকেট তো নয়ই। কিন্তু এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ময়দান বারবার টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজে হাজির হয়েছে। ভোটের রং বদল হয়েছে বারবার। ভোটের আগ মুহূর্তেও ঘটছে নাটকীয়তা। নানা হিসাব। অদ্ভুত সব সমীকরণ। পরিস্থিতি বদল হয়েছে বহুবার। দুটি প্রধান ইস্যু গোলবার সরিয়ে নিয়েছে। সেক্স এবং ই-মেইল। সংবাদমাধ্যমের প্রায় পুরোটাই হিলারির পক্ষে ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমের ইতিহাস বদলে দেয়া জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বসে ছিলেন না। তার কারিশমা তিনি দেখাতে থাকেন। হিলারির ই-মেইল ফাঁসের দিকেই যেন তার সব মনোযোগ। যদিও অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে, মার্কিন মিডিয়ায় একের পর এক ফাঁস হতে থাকে ট্রাম্পের যৌন কেলেঙ্কারির খবর। নারীদের সম্পর্কে তার মন্তব্য বিস্ময় তৈরি করে সারা দুনিয়াতেই। এক পর্যায়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে নক-আউটই মনে হচ্ছিল তাকে। কিন্তু হঠাৎই আসরে নেমে পড়েন এফবিআই প্রধান জেমস কমি। হিলারির ই-মেইল তদন্ত নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে তার লেখা একটা ঝাঁপসা চিঠি পরিস্থিতি বদলে দেয় নাটকীয়ভাবে। প্রবল বিক্রমে খেলায় ফিরে আসেন ট্রাম্প। তবে নির্বাচনের দুদিন আগে আবার সেই কমির চিঠি। এবার তিনি জানালেন, হিলারির বহুল আলোচিত নতুন চিঠিগুলোতে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখন এ চিঠি কি আবার হিলারিকে বাজিমাত করতে সহায়তা করবে, নাকি ভোটারদের প্রভাবিত হওয়ার সময় এরইমধ্যে চলে গেছে? তারা কি নিয়ত করে ফেলেছেন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের খেলায় নানা হিসাব। সর্বশেষ জনমত জরিপগুলো সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও বেশির ভাগ জরিপ বলছে, হিলারি এগিয়ে। তবে নীরব ভোট এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন কোনো কোনো পর্যবেক্ষক। আচ্ছা, হিলারি জিতলে তিনিই কি প্রথম মার্কিন নারী প্রেসিডেন্ট হবেন? প্রশ্নটা এ ভূমে একটু নতুন। একটি কথা নিশ্চিন্তে বলা হয়, হিলারি যদি জেতেন তিনি হবেন প্রথম নির্বাচিত নারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে প্রেসিডেন্টের আসনে বসা প্রথম নারী হবেন কি-না তা নিয়ে হালকা বিতর্ক রয়েছে। হ্যাজেলগ্রোভ তার লেখা, ‘ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট: দ্য সিক্রেট প্রেসিডেন্সি অব এডিথ উইলসন’ বইতে অন্তত ভিন্ন দাবিই করেছেন। ঘটনা প্রায় একশ’ বছর আগের। ১৯১৯ সাল। প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যান। এরপর দীর্ঘ ১৭ মাস ফার্স্টলেডি এডিথ উইলসনই কার্যত প্রেসিডেন্টের কার্যাবলী সম্পাদন করেন।
বহুল আলোচিত এ ভোটে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের রানিংমেট হিসেবে রয়েছেন ভার্জিনিয়ার সিনেটর ও সাবেক গভর্নর টিম কেইন। আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্প রানিংমেট বানিয়েছেন পেনসিলভানিয়ার গভর্নর মাইক পেন্সকে। এ দুই প্রার্থীর বাইরে লিবার্টেরিয়ান দলের প্রার্থী হয়েছেন সাবেক গভর্নর গ্যারি জনসন ও গ্রিন পার্টির প্রার্থী জিল স্টেইন। তারা গত নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন। ওইবার ভালো না করলেও, এবারের বিভক্তিপূর্ণ নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে কিছু সমর্থন পেয়েছেন এই দু’জন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ জন সদস্য এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ সদস্যও নির্বাচিত হচ্ছেন আজ। ভোটাভুটি হচ্ছে স্থানীয় ও রাজ্যভিত্তিক কিছু কর্মকর্তা নির্বাচনেও। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের দীর্ঘদিনের বড় ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে রিপাবলিকানরা। তবে সিনেট নির্বাচনে দু’দলের অবস্থা হাড্ডাহাড্ডি। আগামী বছরের ২০ জানুয়ারি জয়ী প্রার্থী শপথ নেবেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট বনে যাবেন। এ বছর নির্বাচনে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন প্রায় ১৪ কোটি ৬৩ লাখ ভোটার।

পেছন ফিরে দেখা
এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো উভয় প্রার্থীর নানা ধরনের কেলেঙ্কারি। একবার একজনের কেলেঙ্কারি প্রকাশ হলে, ভোটাররা তার দিকে ঝুঁকে পড়েন। অন্যবার আরেকজনের দিকে। বিতর্ক, উত্তেজনা, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় আর তীব্র নাটকীয়তায় ঠাসা এ নির্বাচনে যিনিই জিতবেন, তার ঘাড়েই বিভক্ত জাতিকে এক করার দায়িত্ব বর্তাবে। দু’প্রার্থীই আমেরিকায় পরিচিত মুখ। হিলারির রয়েছে চার দশকের রাজনীতির ইতিহাস। তবে দেশজুড়ে পরিচিতি পান ফার্স্টলেডি হিসেবে। বিল ক্লিনটন নিজের শাসনামলে ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া, যৌন কেলেঙ্কারি আর অভিশংসন প্রক্রিয়ার কারণে পাদপ্রদীপের অতিরিক্ত আলো ভোগ করেছেন তিনি। আর এ সময় ফার্স্টলেডি হিসেবে হিলারির ভূমিকা ছিল আলোচনার আরেক বড় বিষয়। এছাড়া, ফার্স্টলেডি থাকাকালে কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। হোয়াইট হাউস ছাড়ার পরও আলোচনার বাইরে ছিলেন না। নিউ ইয়র্ক থেকে সিনেট নির্বাচন আর পরে প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব- এক মুহূর্তের জন্যও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরেনি ক্লিনটন পরিবার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নারী আন্দোলনের অন্যতম বড় ব্যক্তিত্ব। শিশুদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য অনেক কাজ আছে তার। একজন নারী প্রথম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবেন, এমন স্বপ্ন তাকে ঘিরেই প্রথম দেখেছে অনেক মার্কিনি। একই শহর নিউ ইয়র্কে এই সময়টায় ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাবমূর্তি ছিল অনেকটা প্লেবয়সুলভ। নারী সংক্রান্ত ইস্যুতে সবসময় এ বিলিয়নিয়ার ছিলেন আলোচনায়। পাশাপাশি জনপ্রিয় নানা রিয়েলিটি শো আর সুন্দরী প্রতিযোগিতার বদৌলতে গণমাধ্যমে ছিল তার সরব উপস্থিতি। অর্থকড়ি, বিলাসিতা, নারী, মিডিয়া- সব মিলিয়ে ভালোই নামডাক তার।
২০০৮ সালে হিলারির ব্যর্থ চেষ্টার পর, ২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক দল থেকে তার প্রার্থিতা একরকম নিশ্চিতই ছিল। রিপাবলিকানরা বিষয়টি আরো বেশি জানতো। তাই এবার আগ থেকেই আঁটঘাট বেঁধে নামেন দলটির নেতারা। হিলারির তখন একমাত্র দুর্বলতা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিহত হওয়ার ঘটনা। এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলা হয়। ধীরে ধীরে ডানপন্থী ভোটারদের কাছে তার ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হয়। অথচ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে যাওয়ার সময় তাকে সমর্থন দিয়েছিল ৬৫ শতাংশের মতো মানুষ। কিছুদিন পরই আবিষ্কৃত হয়, তিনি ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভার ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কাজ চালিয়েছেন। এমনটা অনেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীই করেছিলেন। কিন্তু কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো এর আগে আর প্রেসিডেন্ট হতে চাননি। তাই হিলারির ইস্যুতেই বেশি বিতর্কের জন্ম হয়। অভিযোগ উঠে, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হারিয়ে ফেলার। এক পর্যায়ে ই-মেইল প্রকাশ করার চাপ দেয়া হয় রক্ষণশীল শিবির থেকে। এক বিচারকের নির্দেশ মোতাবেক সেগুলো প্রকাশও করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফলে আকস্মিক হিলারির বিরুদ্ধে অনেক অস্ত্র হাতে পেয়ে যায় প্রতিপক্ষ। প্রশ্ন ওঠে, ক্লিনটন পরিবারের দাতব্য সংস্থা ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও। এ ফাউন্ডেশনে অনুদান দিয়ে অনেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে। প্রাইমারি নির্বাচনে আকস্মিকভাবে ভালো করতে শুরু করেন 'বামপন্থী' বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি অভিযোগ করেন, ধনপতিদের পক্ষে কাজ করছেন হিলারি। বিশেষ করে ওয়ালস্ট্রিটের টাকা নিয়ে তাদের স্বার্থরক্ষার অভিযোগ ওঠে। বক্তৃতা দিয়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হঠাৎ দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় উইকিলিকস। সংস্থাটির প্রধান জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ প্রথম ফাঁস করেন ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রীয় কমিটির (ডিএনসি) কিছু ই-মেইল। এতে দেখা যায়, হিলারির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে ডিএনসি, যা করার এখতিয়ার তাদের নেই। ততদিনে হেরে গেছেন বার্নি, সমর্থন জানিয়েছেন হিলারির প্রতি। কিন্তু পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ডিএনসির চেয়ারম্যান। এরপর উইকিলিকস ফাঁস করে হিলারি শিবিরের চেয়ারম্যান জন পডেস্টার ই-মেইল। সেখানে ওয়ালস্ট্রিট ব্যাংকারদের প্রতি দেয়া হিলারির বিশেষ বক্তৃতার বিষয়বস্তু, যা হিলারি প্রকাশ করতে চাননি।
অপরদিকে ট্রাম্পের উত্থান বরং বিস্ময়কর। রিয়েলিটি শো তারকা থেকে তার রাজনীতিতে পদার্পণ মূলত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্ম তারিখ নিয়ে এক বিতর্কের সূত্র ধরে। এর আগেও অবশ্য তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলেন বিভিন্ন অখ্যাত দলের হয়ে, কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। এবার তিনি দাবি করেন, বারাক ওবামা কেনিয়ায় জন্ম নিয়েছেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি ওবামার প্রতিপক্ষ মিট রমনিকে সমর্থন প্রদান করেন। এক পর্যায়ে ওবামা আমেরিকায় জন্ম নেননি দাবি করে একটা আন্দোলনের জন্ম নেয়। বার্থার নামে ওই বর্ণবাদী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন ট্রাম্প। এবার তিনি নিজেই যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন, তখন অনেকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু গণমাধ্যম তাকে বিশেষ কাভারেজ দেয় ভিন্ন কারণে। প্রথমত, আগে থেকেই তিনি মিডিয়ায় সেলিব্রেটি স্ট্যাটাস ভোগ করতেন, যা অনেক জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান প্রার্থীও পাননি। দ্বিতীয়ত, তার কথা বলার ধরন একটু ভিন্ন। তার কথায় ব্যাকরণের বালাই নেই। কেতাবি ভাষা নয়, সাধারণের মুখের ভাষাতেই তিনি বক্তৃতা দিতে থাকেন। আরো বড় বিষয় হলো, তিনি এমন সব কথা সরাসরি বলতে থাকেন, যা অতীতে কোনো রাজনীতিক বলেননি। মুখে কোনো রাখঢাক নেই। ফলে সহজেই মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়েন তিনি, যদিও তা নেতিবাচকভাবে। কিন্তু কথায় আছে, কোনো প্রচারণাই খারাপ নয়। এই নেতিবাচক পাবলিসিটির কারণেও তার পরিচিতি পৌঁছে যায় অনেকদূর। তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন, মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, মেক্সিকানদের ধর্ষক ও অপরাধী বলে আখ্যা দেয়া ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এমন সংবেদনশীল কথা সরাসরি কোনো প্রার্থীই কোনোদিন বলেননি। বিবেকবান মানুষ প্রতিবাদ করেছে বটে। কিন্তু একসময় ডানপন্থী ভোটাররা সমর্থন জানাতে থাকেন ট্রাম্পকে।
কিন্তু নেতিবাচকতা মেনে নেয়ারও বোধ হয় একটা সীমা আছে। মিডিয়াতে আসতে থাকে, কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে তিনি বর্ণবাদী আচরণ করেছেন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য করেছেন, নারীদের সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন, মুসলমান ও সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে তীব্র বিদ্বেষ লালন করেন। তিনি মনে করেন, অপরাধীদের পরিবারসহ মেরে ফেলা উচিত। তাদেরকে নির্যাতন করা উচিত। তার সরকারি কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পররাষ্ট্রনীতির বেলায় যেখানে হিলারি বিশেষজ্ঞের পর্যায়ে, সেখানে তার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। রাশিয়ার পক্ষে আকারে ইঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করেন একাধিকবার। অভিযোগ ওঠে, বিলিয়নিয়ার হওয়া সত্ত্বেও আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তিনি আয়কর দেননি। প্রমাণ মেলে অন্তত এক বছর তিনি এক টাকাও আয়কর দেননি। এসব নিয়ে খোদ রিপাবলিকান দলের অনেকে তার পক্ষাবলম্বন করতে অস্বীকার করেন। হিলারি শিবিরও চেপে ধরে। তবে ট্রাম্পের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারতো ওয়াশিংটন পোস্টের একটি রিপোর্ট। সেখানে দেখা যায়, ২০০৫ সালে এক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার ফাঁকে নারীদের প্রতি অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কথোপকথন চালান তিনি। প্রতিক্রিয়ায় তিনি ক্ষমা চান। তবে পাল্টা আক্রমণ করে দাবি করেন, তিনি তো মুখে বলেছেন, হিলারির স্বামী বিল ক্লিনটন এগুলো কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। এরপর প্রায় ১৭ জন নারী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন ট্রাম্প তাদের প্রতি যৌন নিপীড়ন চালিয়েছেন। ট্রাম্পের পিঠ তখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। সারা দেশে ভোটাররা তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ঠিক এমন সময় এফবিআই প্রধান জেমস কমি বোমা ফাটান। তিনি বলেন, তার সংস্থা হিলারির ই-মেইল নিয়ে আবার তদন্ত করছে! নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তাতে প্রভাব ফেলতে পারে এ ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে এফবিআই। আবার প্রতিযোগিতায় ফিরে আসেন ট্রাম্প। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। মঙ্গলবার অবশ্য এফবিআই জানিয়েছে, তারা এ ই-মেইল পরীক্ষা করে হিলারির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার মতো কিছু খুঁজে পায়নি। ক্ষতি তো কিছুটা হয়েছেই হিলারির। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে আগে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

জনমত জরিপ
নির্বাচনের ঠিক আগে কয়েকটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান তাদের সর্বশেষ জরিপ প্রকাশ করেছে। এনবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের চূড়ান্ত জরিপে জাতীয়ভাবে হিলারি ৪ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসির ট্র্যাকিং পোলে হিলারি এগিয়ে আছেন ৫ পয়েন্টে।

সামনের চ্যালেঞ্জ
নানা কারণে এবারের নির্বাচন আমেরিকা তো বটেই, সারা বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে রীতিমতো ছড়ি ঘুরিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক বছরে ওই প্রভাব প্রতিপত্তি যেন কিছুটা ফ্যাকাসে। হয়তো এ কারণেই ট্রাম্প নিজের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের মটো বানিয়েছিলেন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’। মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র বিরুদ্ধে অভিযান এখনো পূর্ণ সফলতা লাভ করেনি। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে ঝামেলা আরো জট পেকেছে। জড়িত হয়ে গেছে রাশিয়াও। অর্থনৈতিকভাবে চীন ক্রমেই আবছা করে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রকে। দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে চীনকে পিছু হটাতে পারেনি দেশটি। দীর্ঘদিনের মিত্র ফিলিপাইন চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির জেরে নাখোশ ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো।
ট্রাম্প জিতলে, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে। ট্রাম্প প্রচলিত রাশিয়াবিরোধী অবস্থানে নেই। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুতে আগ্রহী। এমনকী তার মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অনেক বড় নেতা। আর সিরিয়ায় রাশিয়া ও আসাদ বাহিনী ভালো কাজই করছে। হিলারির কঠোর পররাষ্ট্রনীতি বেশ সুবিদিত। দেশের ভেতরেও রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্টে এখন উদারপন্থী ও রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যা সমান। ফলে দু’দলই চাইছে নিজেদের ভাবাদর্শের একজন বিচারপতি নিয়োগ দিতে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, আয় বৈষম্য, আয়কর নীতি- ইত্যাদি ইস্যুতে সামনের প্রেসিডেন্টের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ।

যেভাবে নির্বাচিত হন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট
মোট ভোটের হিসাবে বা সরাসরি জনগণের ভোটে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে জনসংখ্যার অনুপাতে ইলেক্টোরাল ভোট রয়েছে। যেমন, সবচেয়ে বড় অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ৫৫টি ইলেক্টোরাল ভোট। কিন্তু অল্প জনসংখ্যার ওয়াশিংটন ডিসি ও ওয়াওমিং অঙ্গরাজ্যের প্রত্যেকটির রয়েছে ৩টি করে ভোট। এভাবে মোট ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি মিলে মোট ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮টি। নির্বাচনে জিততে হলে এগুলোর অর্ধেকের চেয়ে একটি বেশি অর্থাৎ ২৭০টি ভোট জিততে হবে একজন প্রার্থীকে। দৃশ্যত, আমেরিকানরা সরাসরি প্রেসিডেন্টকে নন, বরং প্রত্যেক রাজ্যের নির্ধারিত ইলেকটরদের ভোট দিয়ে থাকেন। রাজ্য কর্মকর্তা বা জ্যেষ্ঠ দলীয় নেতাদেরই সাধারণত ইলেকটর বানানো হয়। তবে তাদের নাম ব্যালটে থাকে না। থাকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নাম। মেইন ও নেব্রাস্কা ব্যতিত বাকি সকল রাজ্যে ‘উইনার টেকস অল’ পদ্ধতি প্রচলিত। অর্থাৎ, যে প্রার্থী রাজ্যের বেশির ভাগ ভোট পাবেন, তার ঘরেই পড়বে রাজ্যটির জন্য নির্ধারিত সকল ইলেক্টোরাল ভোট।

চাবিকাঠি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে
নির্বাচনে জয়ের চাবিকাঠি হলো যত বেশি সম্ভব ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ বা ‘সুইং স্টেট’গুলোতে জয় পাওয়া। গত কয়েকটি নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্য একেকবার একেক দলের দিকে ঝুঁকেছে, সেগুলোকে বলা হয় সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য। এসব রাজ্যে জিতলেই নির্বাচন জেতা হয়ে যায়। কারণ, অন্যান্য অঙ্গরাজ্যগুলো অনেক বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান- যেকোনো একটি দলকে জিতিয়ে আসছে। এ ধরনের ফলে কয়েকটি সুইং স্টেটেই লুকিয়ে থাকে জয়ের চাবিকাঠি।
সুইং স্টেটে দুই দলেরই কমবেশি সমান সমর্থন থাকে। ফলে একেক মৌসুমে একেক দলের ঘরে গেছে এসব রাজ্যের সমর্থন। এ বছর ৮ থেকে ১৫টি রাজ্যকে সুইং স্টেট ধরা হচ্ছে। এসব রাজ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ফ্লোরিডা আর ওহাইয়ো- এ দুটি রাজ্যই নির্ধারণ করছে কে জিতবেন আর কে হারবেন। আমেরিকার তৃতীয় ও সপ্তম বৃহত্তম রাজ্য দুটিতে ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যা যথাক্রমে ২৯ ও ১৮টি। গত পাঁচ দশক ধরে একেকবার একেক প্রেসিডেন্টের পক্ষে গেছে এ রাজ্যগুলোর ভোট। ১৯৬০ সালের পর প্রতিবারই ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যে যিনি জিতেছেন, তিনিই হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। ফ্লোরিডার বেলায় একবার ব্যত্যয় হয়েছে। এ কারণেই এ রাজ্য দুটিতে জয়ের জন্য সর্বশক্তি ঢেলে দিচ্ছেন হিলারি ও ট্রাম্প।
রেড স্টেট বা রিপাবলিকানপন্থী বলে পরিচিত কিছু অঙ্গরাজ্য সাম্প্রতিককালে ডেমোক্রেটদের আওতায় এসে পড়েছে। এসব অঙ্গরাজ্যে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ডনাল্ড ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তাও এ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। যেমন, ২০০৮ সালে নর্থ ক্যারোলাইনায় জিতেছিলেন বারাক ওবামা। জিমি কার্টারের পর সেবারই প্রথম কোনো ডেমোক্রেটিক প্রার্থী এ অঙ্গরাজ্যটি জিতেছিলেন। ২০১২ সালে অবশ্য রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি এ রাজ্যটি পুনর্দখলে আনেন। এবার এ রাজ্যে সমানে সমান হিলারি ও ট্রাম্প। নর্থ ক্যারোলাইনা ছাড়িয়ে এবার অ্যারিজোনা, জর্জিয়া ও মিশৌরিতেও ভালো করতে চান হিলারি। কিন্তু এসব অঙ্গরাজ্য অনেকদিন ধরে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে আসছে।
বারাক ওবামা ২০০৮ ও ২০১২ সালে বেশ বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন। তিনি আইওয়া ও পেনসিলভানিয়ার মতো ঐতিহ্যগতভাবে দোদুল্যমান রাজ্য যেমন জিতেছিলেন। তেমনি জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজ্য কলোরাডো ও নেভাদায়ও জিতেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ভার্জিনিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো ঈষৎ রিপাবলিকানঘেঁষা রাজ্যও তিনি পেয়েছিলেন। হিলারি এবার কলোরাডো, পেনসিলভানিয়া ও ভার্জিনিয়ায় ভালো অবস্থানে আছেন। তবে ওবামার জেতা আইওয়া ও নেভাদায় অবস্থা হাড্ডাহাড্ডি। এছাড়া নিউ হ্যাম্পশায়ারেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ঈষৎ ডেমোক্রেটিক ঘেঁষা রাজ্যটিতে ২০০০ সাল ব্যতীত সাম্প্রতিক কালের প্রতি নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জিতেছিলেন।
উল্লিখিত মোট ১২টি সুইং স্টেট সরানো হলে বাকি থাকে ৩৮টি অঙ্গরাজ্য। এই ৩৮টিতে কে জিতবেন মোটামুটি তা নির্ধারিত। এর মধ্যে ডেমোক্রেট ঘেঁষা রাজ্যগুলো থেকে হিলারি পাবেন ২২৬টি ইলেক্টোরাল ভোট। আর মোটামুটি নিশ্চিত রিপাবলিকান ঘেঁষা রাজ্যগুলো থেকে ট্রাম্প পাবেন ১৫৪টি। অর্থাৎ নির্বাচনে জিততে হলে হিলারির তুলনায় ট্রাম্পকে বেশি সুইং স্টেট জিততে হবে। কলোরাডো, পেনসিলভানিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও ভার্জিনিয়ায় জেতার সম্ভাবনা বেশি হিলারির। আর তা হলে, তিনি পাবেন ২৭২টি ভোট, যা জয়ের জন্য যথেষ্ট। অপরদিকে ট্রাম্পের বেলায় সমীকরণটা একটু কঠিন। তাকে শুধু রিপাবলিকান ঘেঁষা সব রাজ্য জিতলেই চলবে না। ১২টি সুইং স্টেটের মধ্যে ফ্লোরিডা, ওহাইয়ো ও নর্থ ক্যারোলাইনাসহ কমপক্ষে আটটি এবং হিলারির মোটামুটি নিশ্চিত করায়ত্তে থাকা চারটি রাজ্যের একটিতে জয় পেতেই হবে।
এমন পরিস্থিতি হয়তো বোঝেন ট্রাম্পও। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের খবর, শেষ মুহূর্তে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। এমনকী জয়ের জন্য তিনি টার্গেট করেছেন দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্রেট-অধ্যুষিত রাজ্যগুলোও। কিছুটা একই কৌশল হিলারিরও। দোদুল্যমান রাজ্য নেভাদা ছাড়াও রিপাবলিকান ঘেঁষা অ্যারিজোনাও শেষ মুহূর্তে আয়ত্তে নিতে চাইছেন তিনি।

আগাম ভোট
এদিকে ইতিমধ্যে ৩৮টি অঙ্গরাজ্যে চার কোটিরও বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এসব ভোটার উপস্থিতি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হিলারিই এগিয়ে অনেকখানি। ২০০৮ ও ২০১২ সালের অনুপাতে এবার কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার উপস্থিতি কম। তবে আকস্মিক বেড়ে গেছে লাতিনো ভোটারদের উপস্থিতি, যারা ঐতিহ্যগতভাবেই ডেমোক্রেট ঘেঁষা। আর হিলারি ক্লিনটন বিশেষভাবে এ গোষ্ঠীর মাঝে জনপ্রিয়। কিন্তু রিপাবলিকান সমর্থক গোষ্ঠী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের উপস্থিতি তেমন বাড়েনি। আগাম ভোটাভুটিতে লাতিন ভোটারদের ভোট দেয়ার হার ২০০৮ ও ২০১২ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি! হিলারির জন্য আরো সুখবর হলো, শুক্রবার প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের চেয়ে কমপক্ষে দশ লাখ বেশি ডেমোক্রেট আগাম ভোট দিয়ে দিয়েছেন।
এপি জানিয়েছে, কিছু অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোট দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। টেক্সাস, জর্জিয়া, ইন্ডিয়ানা ও অরিগনের মতো রাজ্যগুলোতে এবার রেকর্ড সংখ্যক মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য জর্জিয়ায় এর দরুন হিলারি উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ম্যারিল্যান্ড, মিনেসোটা ও টেনিসিতে আগাম ভোট ২০১২ সালের মাত্রা পার করেছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় আগাম ভোটাভুটিতে কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে হিলারি। এ রাজ্যে হিলারি জিতলে ট্রাম্পের জয়ের আশা কার্যত শেষ।
সূত্র : মানবজমিন