মাশরাফির নেতৃত্বেই উজ্জীবিত বাংলাদেশ

আপডেট: 11:46:53 23/07/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ১৪৬ বলে সেঞ্চুরি, ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের মন্থরতম। দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬০ বল খেলার রেকর্ড, কিন্তু রান মাত্র ১৩০। তবু তামিম ইকবালের অচেনা ইনিংসই হয়ে উঠল মহামূল্য। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে তার দুইশ রানের জুটি গড়ে দিল জয়ের ভিত। মাশরাফি বিন মুর্তজার বোলিং আর নেতৃত্ব দেখাল পথের দিশা। টেস্ট সিরিজের গুমোট হাওয়া সরিয়ে বাংলাদেশ পেল স্বস্তির জয়।
দারুণ জয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ানডে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ক্যারিবিয়ানদের ৪৮ রানে হারিয়ে এগিয়ে গেল তিন ম্যাচের সিরিজে।
ধীরগতিতে শুরুর পর শেষটা দারুণ করে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে তুলেছিল ৪ উইকেটে ২৭৯ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নবম উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল ৪১ ওভারেই। সেখান থেকে অভাবনীয়ভাবে ৫০ ওভার খেলে ফেলে শেষ জুটি। তাতে কমেছে ব্যবধান। করতে পারে তারা ২৩১ রান।
বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১০ ওয়ানডে সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁয়েছেন তামিম। অষ্টম সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও সাকিব আউট হয়েছেন তিন রান দূরে।
দুজন মিলে গড়েছেন ২০৭ রানের জুটি। দ্বিতীয় উইকেটে বাংলাদেশের যা সর্বোচ্চ, সব জুটি মিলিয়ে মাত্র দ্বিতীয় দ্বিশতক জুটি।
আড়াইশর আশেপাশের সম্ভাব্য স্কোরকে ২৮০ রানের কাছে নিয়ে যায় মুশফিকুর রহিমের শেষের ঝড়।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে তিন সিনিয়রের আলোর পর বোলিংয়ে আরেক সিনিয়রের ঝলকানি। স্ত্রীর অসুস্থতায় যাওয়ার আগে সপ্তাহ দুয়েক বল হাতে নেননি যিনি, সফরে যাওয়া নিয়েই ছিল শঙ্কা, সেই মাশরাফি নিলেন ৪ উইকেট। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সপ্তমবার।
নেতৃত্বে যথারীতি ছিলেন অনুপ্রেরণাদায়ী। দলের শরীরী ভাষায়ই এদিন ফুটে উঠেছে জয়ের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা।
ম্যাচের শুরুটায় যদিও দানা বাঁধছিল নানা সংশয়। সাকিব ও তামিমের ব্যাটিংয়ের ধরন জন্ম দিচ্ছিল প্রশ্নের। তবে নিজেদের করণীয়টা দ্রুত বুঝে ফেলেছিলেন দুজন। উইকেটের চরিত্র বুঝেই বদলে ফেলেন নিজেদের ব্যাটিংয়ের চরিত্র।
প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামের উইকেট ছিল খানিকটা মন্থর। কখনো উইকেট ছিল দুই রকম গতির। শট খেলা কঠিন। ভারি আউটফিল্ডে বল গেছে থমকে। তামিম-সাকিব সাবধানী ছিলেন দল শুরুতে উইকেট হারানোর কারণেও।
প্রস্তুতি ম্যাচে শূন্য রান করার পরও এনামুল হক সুযোগ পান ইনিংস শুরু করার। কিন্তু রোববারও ফেরেন শূন্যতেই। জেসন হোল্ডারের অনেক বাইরের বল অযথা ডিফেন্স করতে গিয়ে ক্যাচ দেন স্লিপে।
পঞ্চম ওভারে নামা বৃষ্টি খেলা বন্ধ রাখে মিনিট বিশেক। এরপর খেলা শুরু হলেও বাংলাদেশের রান যায় থমকে। ৮ ওভারে রান ছিল ১৬। তামিম ও সাকিবের মতো দু্জন ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকার পরও তখনো আসেনি কোনো বাউন্ডারি!
সেই খরা কাটে নবম ওভারে। আন্দ্রে রাসেলকে কাভার ড্রাইভে ম্যাচের প্রথম বাউন্ডারি মারেন তামিম। খরার পর যেন প্রবল বর্ষণ। সেই ওভারেই বাউন্ডারি আরো দুটি! ওভারে তিন বাউন্ডারিতে ফাঁসটা আলগা হয় একটু। সময় নিয়ে ইনিংস গড়ার সুযোগ পান দুজন। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে রানের গতিও।
তামিম ফিফটি স্পর্শ করেন ৮৭ বলে। দ্বিতীয় ওভারে উইকেটে যাওয়া সাকিব প্রথম চারের দেখা পান ১৭তম ওভারে। তবে সাকিবের ব্যাটই তুলনামূলকভাবে সচল ছিল বেশি। ফিফটি করেন ৬৮ বলে।
ফিফটির পর রান বাড়াতে খুব একটা সমস্যা হয়নি দুজনের। তবে গোল বাধে তখনই, যখন ঝড় তোলার সময়। দলের ইনিংস গড়াল শেষ ১০ ওভারে, দুজনই সুবাস পাচ্ছিলেন সেঞ্চুরির। নিরাপদ ব্যাটিংয়ে মাইলফলকে পৌঁছানোর তাড়নায় বলি হতে থাকল দলের রান বাড়ানোর তাড়া।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য দলের চাওয়ার কথা ভেবেই নিজের উইকেট বিলিয়ে এসেছেন সাকিব। দেবেন্দ্র বিশুকে স্লগ সুইপ খেলে আউট হয়েছেন ১২১ বলে ৯৭ রান করে। তামিম এক-দুই করে খেলেই পূরণ করেন সেঞ্চুরি।
দুজনকেই কৃতজ্ঞ থাকতে হবে ক্যারিবিয়ান ফিল্ডারদের প্রতি। ১৭ ও ১৮ রানে জীবন পেয়েছেন তামিম। ১৫ রানে জীবন পাওয়া সাকিব আবার বেঁচেছেন ৮৪ রানে।
চারে নেমে সাব্বির রহমান আউট হয়েছেন আম্পায়ারের ভুলে। মাঠের আম্পায়ার সরাসরিই স্টাম্পিংয়ের সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন। রিপ্লেতে দেখা যায় আউট ছিলেন না সাব্বির। তিনি রিভিউও নেননি।
তবে সাব্বিরের সেই আউট শাপেবর হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জন্য। গিয়েই ঝড় তোলেন মুশফিক। তামিমের ব্যাটেও অবশেষে দেখা যায় স্ফুলিঙ্গ। ২০ বলে ৫৪ রানের জুটি গড়েন দুজন।
নিজের প্রথম ৭ ওভারে ১৩ রান দিয়েছিলেন জেসন হোল্ডার। ৪৯তম ওভারে তার বোলিংয়েই মুশফিক নেন ২২ রান। আন্দ্রে রাসেলের করা শেষ ওভারে আসে আরো ২১ রান।
১১ বলে ৩০ রান করে মুশফিক আউট শেষ ওভারে। ১০ চার ও ৩ ছক্কায় ১৩০ রানে অপরাজিত তামিম।
মাহমুদউল্লাহর শেষ বলে বাউন্ডারিতে শেষ হয় ইনিংস। বাংলাদেশ তখন দারুণ উজ্জীবিত। সেটির প্রতিফলন দলের বোলিং আর মাঠে পদচারণায়।
রান তাড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়ন্ত সূচনা এনে দিতে পারতেন দুই বিস্ফোরক ওপেনার। কিন্তু নতুন বলে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ক্রিস গেইল ও এভিন লুইসকে দমিয়ে রাখেন মাশরাফি ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
খুব বেশি বোলিং অনুশীলন করতে পারেননি বলে যাওয়ার আগে আক্ষেপ করেছিলেন মাশরাফি। ক্যারিবিয়ায় গিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচেও বল করতে পারেননি। কিন্তু ম্যাচে সেসবের প্রভাবই নেই। দুর্দান্ত লাইন-লেংথ, দারুণ সব কাটার আর গতি বৈচিত্র্যে ভোগান দুই ওপেনারকেই।
দলকে প্রথম উইকেট এনে দেন অধিনায়কই। রানের জন্য হাঁসফাঁস করে উইকেট দিয়ে ফেরেন ২৯ বলে ১৭ রান করা লুইস।
৬ ওভারের প্রথম স্পেলে মাশরাফি দেন ১৮ রান। নিজেকে বদলে বল তুলে দেন রুবেল হোসেনের হাতে। প্রথম বলেই এলবিডব্লিউ শেই হোপ।
মোসাদ্দেক হোসেনের স্পেলটিও বাড়িয়ে তোলে ক্যারিবিয়ানদের চাপ। ৭ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ২২ রান।
গেইল তখনো টিকে। চেষ্টা করছিলেন ঠান্ডা মাথায় বড় ইনিংস খেলতে। দ্রুত কয়েকটি সিঙ্গেল নিয়েছেন, জায়গায় বল পেয়ে ছক্কা মেরেছেন দুটি।
এই দুর্ভাবনার দেয়াল বাংলাদেশ ভাঙতে পারে প্রতিপক্ষের উপহারে। শিমরন হেটমায়ারের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট গেইল। ফেরেন ৬০ বলে ৪০ করে।
সেই হেটমায়ারই পরে ফিফটি করে আশা দেখিয়েছিলেন দলকে। নতুন স্পেলে ফিরেই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে থামান মুস্তাফিজ। পরের বলেই দুর্দান্ত ডেলিভারিতে ফিরিয়ে দেন বিপজ্জনক রোভম্যান পাওয়েলকে।
আরেকপাশ থেকে আরেকটি দারুণ স্পেলে ক্যারিবিয়ানদের আশা শেষ করে দেন মাশরাফি। তুলে নেন জেসন হোল্ডার, আন্দ্রে রাসেল ও অ্যাশলি নার্সের উইকেট।
ম্যাচ তখন শেষের অপেক্ষায়। বাংলাদেশের সামনে শতরানের ব্যবধানে জয়ের হাতছানি। কিন্তু শেষ উইকেটে আলজারি জোসেফ ও দেবেন্দ্র বিশু দীর্ঘায়িত করেন বাংলাদেশের অপেক্ষা। ৫৯ রানের জুটিতে কমান ব্যবধান।
শেষের বিরক্তিটুকুই যা একটু ছড়াল হতাশা। তবে সেটুকু বাদ দিলে, টেস্ট সিরিজের দুঃস্বপ্নের পর এমন জয়ও স্বপ্নময়!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৭৯/৪ (তামিম ১৩০*, এনামুল ০, সাকিব ৯৭, সাব্বির ৩, মুশফিক ৩০, মাহমুদউল্লাহ ৪*; রাসেল ১/৬২, হোল্ডার ১/৪৭, জোসেফ ০/৫৭, নার্স ০/৩৯, বিশু ২/৫২, জেসন ০/১৫)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ৫০ ওভারে ২৩১/৯ (গেইল ৪০, লুইস ১৭, হোপ ৬, হেটমায়ার ৫২, জেসন ১০, হোল্ডার ১৭, পাওয়েল ০, রাসেল ১৩, নার্স ৭, বিশু ২৯*, জোসেফ ২৯*; মাশরাফি ৪/৩৭, মিরাজ ১/৩৭, রুবেল ১/৫২, মোসাদ্দেক ০/২২, মুস্তাফিজ ২/৩৫, সাকিব ০/৪৩)
ফল : বাংলাদেশ ৪৮ রানে জয়ী
সিরিজ : ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে
ম্যান অব দা ম্যাচ : তামিম ইকবাল
সূত্র : বিডিনিউজ