মিঠু শিকদার, বন্ধু আমার

আপডেট: 07:30:02 06/03/2018



img

কাজী মৃদুল

সংবাদ শিরোনাম হলেন সাংবাদিক মিঠু শিকদার। দু’দিন আগেও যে ব্যক্তি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রিপোর্ট সংগ্রহে। তার চলে যাওয়াটা ছিল অনেকটাই নিঃশব্দে। এটা তার বন্ধু ও সহকর্মী হিসাবে আমি মেনে নিতে পারছি না।
পৃথিবীতে জন্ম নিলে মরতে হবে- এটাই বিধাতার নিয়ম। আর এটা হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে। তারপরও যেন প্রিয় বন্ধুর হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। মিঠু শিকদারের মৃতদেহ দেখে এমনি ভেঙে পড়তে দেখেছি গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিনসহ তার অনেক সহকর্মীকে।
বন্ধু মিঠু শিকদারকে যেভাবে দেখেছি, স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বার বার চোখ মুছতে হচ্ছে। কম্পিউটারের কিবোর্ডের উপর কীসের টানে যেনো বার বার হাত থেমে যাচ্ছে; এগোতে পারছি না।
মিঠু শিকদার আমার সমবয়সী বন্ধু। সংবাদপত্র জগতে আমার অনেক পরে তার পদচারণা। বিশেষ করে সংবাদপত্রে আসার পর প্রায় প্রতিটি দিন বিকালে কোটচাঁদপুরে আমার অফিসে আসতো সে। আড্ডা হতো, আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে রিপোর্টটি কীভাবে করলে ভালো হয় দেখিয়ে নিত। তার জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। একবার ধরিয়ে দিলে খুব সহজে লুফে নিত। এভাবে রিপোর্ট সংক্রান্ত বিষয় নিজের আয়ত্তে নিয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে গ্রামের কাগজে সাংবাদিকতা করেছেন দাপটের সাথে।
মিঠুর সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ২৭ বছরের। তার বাসায় এক টেবিলে দুপুরের খাবার খেয়েছি বহুবার। এ ছাড়া যশোর বা ঝিনাইদহ গেলে ফেরার পথে কালীগঞ্জে বাসস্ট্যান্ডে নেমে মিঠু শিকদার, টিপু সুলতান, জামির হোসেন, হাবিব ওসমান, জাকির হোসেন, নয়ন খন্দকারসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এক সাথে কালীগঞ্জের স্ট্যান্ডের একটি রেস্তরাঁয় বসে ঘণ্টাকে ঘণ্টা আড্ডায় কাটিয়েছি কত তা দিন গুনে বলতে পারবো না। অনেক সময় রাত দশটা থেকে দশটা বেজে গেছে মিঠু শিকদারের পীড়াপীড়িতে। ওই রাতে কোটচাঁদপুর আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সে বহুবার। কালীগঞ্জে কোনো কাজ থাকলে তার কাছে মোবাইল করলেই সাথে সাথে সমাধান। সাংবাদিকদের সমস্যা তার কানে গেলে ব্যস্ততা বেড়ে যেত তার সবার থেকে বহু গুন। সব থেকে বড় গুন ছিল তার কারো প্রতি রাগ হলে বেশিক্ষণ মনে রাখতে পারতো না সে। সব সময় ছোট বড় সমবয়সীদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতো। আর যেখানে যতটুকু সময় থাকতো সে তার জাদুকরী কথাবার্তায় সে সময়টুকু মাতিয়ে রাখতো। বড় মনের মানুষ ছিল সে। কালিগঞ্জ গেলে তার সাথে আড্ডা বাদে কখনো এসেছি বলে আমার মনে পড়ে না। কোটচাঁদপুর আসলে আগেই মিঠু শিকাদার ফোন দিয়ে বলতো, ‘দোস্ত, তুই তোর অফিস থেকে নড়বি না আমি আসছি। সাথে চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে রাখ।’
আমি লক্ষ্য করেছি, আমার উপর তার খবরদারিটা একটু অন্য রকম ছিল। সে মনে কষ্ট পুষে রাখতে পারতো না। যদি কখনো মন খারাপ হতো, হয় কোটচাঁদপুর চলে আসতো না হয় আমাকে ফোন দিত। প্রতি রাতে ফেসবুকে আমার সাথে দুষ্টুমি একটা রুটিন কাজ ছিল তার। কোনো কারণে আমার নেট বন্ধ থাকলে ফোন করে নেট অন করতে বলতো। এই কথা আজ খুব বেশি মনে পড়ছে। মিঠু চলে যাওয়ার পর থেকে ফেসবুকে বসতে পারিনি। বন্ধু মিঠুবিহীন বিশাল শূন্যতা যেন কুরে কুরে খাচ্ছে।
যে মিঠু শিকদারের পাঠানো রিপোর্ট গ্রামের কাগজে ছাপা হতো, সেই গ্রামের কাগজে মঙ্গলবার তার মৃত্যুর শিরোনাম হয়েছে। এটা ওই পত্রিকাসহ তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের জন্য বেদনাদায়ক তো বটেই। যেটা আজ বার বার অনুভব করছি। সব শেষে বলি, ‘বন্ধু মিঠু শিকদার তোমাকে হারিয়ে আমরা শোকাহত। জানি তুমি আর আসবে না ফিরে। ডাকবে না আর কাউকে কোনোদিন। যেখানেই থাকো ভালো থেকো বন্ধু আমার।’

লেখক : সাংবাদিক