মিল্টন বিশ্বাসের প্রেমের কবিতা

আপডেট: 02:10:55 13/12/2017



img

নন্দিনী সিরিজ : পর্ব-১
 

নন্দিনীর বেহালা

নন্দিনী, তখন তুমি দুঃখ বাজাতে?
তোমার শ্বেত পাথরের বেহালা
সারারাত তোমাকে সঙ্গ দিত।
বাড়ির পাশে মোড়, বিছানো হেলেঞ্চার পতাকা
তারও ওপারে মাচানো দীঘি।
কত সন্ধ্যা গেল, কত সকাল হলো
তোমার হৃদয় বীণায় তথাগত বুদ্ধ জাগল নীরবে
জাগল কি?
নন্দিনী,
তুমি দুঃখ বাজাতে বাজাতে কাচপোকার মতো উড়ে গেলে
নীরব জল, প্রাচীন শঙ্খ, সোনালি পালক পড়ে থাকল নিভৃতে
নীলকণ্ঠ আর মুনিয়া এসে জানাল বেহালা তাদেরও ভালো লাগে
সেখানে তারা খুঁজে পেল তোমার ত্রিশঙ্কু পাহাড়ের স্মৃতি।
কৌতূহলে ভরা নন্দিনীর স্বপ্নরা দিল দেখা
অজানা রহস্যে মাখা তার প্রেমকে ঘিরে থাকল দুপুরের
মখমলে রোদের পাখা।
২০.০২.২০১৭

 


অধম এই আমি!!

ক্ষমতা নেই, তাই পাশে কোনো মানুষ নেই
মানবিকতা শূন্য পৃথিবীতে প্রেম নেই।
আমি তো অধম
রাত জেগে কষ্ট বুনে চলি অবিরাম।
তাকানো ভুলে গেছে সে
তারও সময় নেই?
ক্ষমতার আদর উড়ছে দিশাহীন
তাই কি তুচ্ছ ভেবেছে আলোর শিখা?
২১.০২.২০১৭
 

নন্দিনী, দোষ আমাদের কারো নয়!

অদ্ভুতভাবে সবকিছু করে দাও বাতিল নন্দিনী?
অথচ দিন নেই, রাত নেই তোমাকে খুঁজে ফিরি অনন্ত নক্ষত্রে।
কথা ছিল আমরা দু’জনে হাঁটব পথ অনেক
কথা ছিল আমরা দু’জন হারাব নীলাকাশে।
সকালের কথা গভীর হলো সন্ধ্যায়
যা বলেছিলে রাতে তা খামচে ধরল হৃদয়।
আর দুপুরের রোদ মেখে
মাইলের পর মাইল হেঁটে—
যন্ত্রণায় কুঁকড়ে তবু চেয়েছি
কবুতরের ঠোঁটের ছোঁয়া।
তার বদলে পেয়েছি ক্যাকটাস আঘাত।
নন্দিনী, বেঁচে থাকা এতো কঠিন কেন??
২২.০২.২০১৭
 

 

নন্দিনী, গভীর ঘুমের ভেতর আলো...!

নন্দিনী,
বলেছিলে রাতের ঘুমকাতুরে জীবনের কথা
বলেছিলে হাত ধরে পাঁচ হাত নদী পার হওয়ার গল্প
তখন ছিল জেগে থাকা দুপুরের স্বপ্ন ভাঙা রোদ।
রাত নয় দিন নয় শুধু ঘুম, শুধু জীবন হারিয়ে ফেলা
প্রহর থেকে প্রহরে ছড়ানো আলোর টানে ফিরে আসা।
নন্দিনী,
তোমার দু’চোখে আমার বেঁচে থাকা জীবনের আকুতি।
সূর্যের দিকে তোমার সারারাত ধেয়ে যাওয়া
ছড়িয়ে থাকা উদ্যানময় শিশুর হাসি
আর দুনিয়ার সব ভালোবাসা
আমাদের জীবনের কোটরে এলোমেলো।
নন্দিনী,
সময় যাচ্ছে বয়ে ডুব দিয়ে দিয়ে
সঙ্গে থাকা তোমার পাখির গানে।
বোমা ফাটানো কোনো শব্দ নয়
অথচ ঘুমের সুখ ফেটে যায় চৌচির।
তাই একবার, শুধু একবার আলো ছড়িয়ে দাও তুমি—
ঘুম নয় গভীর স্বপ্নের ভেতর।
২৪.০২.২০১৭

 

তুমি সত্য বলেছিলে!

নন্দিনী,
তুমি বলেছিলে কবি হও। কবিকে আমার পছন্দ।
আদুরে মুখ, জ্বলে ওঠা চোখ আমাকে ডাকছে কবি হওয়ার জন্য।
প্রহর থেকে প্রহর গড়ায় রাত জেগে তোমার ঠোঁটের শব্দ গুনি।
একা জেগে থাকে নিশি তাড়ানো চাঁদ,
লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে যায় আমাদের প্রিয় গাছ ছেড়ে, পাহাড় পেরিয়ে।
নন্দিনী,
তোমার দক্ষিণে চামেলি বাগ, উত্তরে ধলেশ্বরী,
তোমার আঙিনা রঙে ছাওয়া আগুন।
ঢেউ ওঠে তোমার পেলব চুলে।
নীল কুয়াশায় তুমি হাতে নেও হাত।
কত সন্ধ্যা কাটে আমাদের পথ চলে
কত রাত যায় ঘরে ফেরার তাড়া নিয়ে।
অথচ এক ভোরের আলো মেখে
তুমি চলে গেলে দূরে।
নন্দিনী,
একিলিসের জাহাজের মতো
তুমি দূরে চলে গেলে
যুদ্ধ শেষে প্রিয় মুখের কাছে ফিরে না আসার গল্প শোনালে।
শূন্য মাঠের ওপার থেকে মাতাল বাতাস ছুটে আসে
একা আমি জেগে থাকি বেগুনি রাতের গভীরে।
দূরে চলে গেছ তুমি—
তবু তোমার আদুরে হাসির ছটায়
পথ চলি তোমারই দিকে।
২৫.০২.২০১৭


নন্দিনী, স্বপ্নগুলো মধুর ছিল!!

নন্দিনী,
তুমি চলে যাবার আগে নিঃশ্বাসে স্বপ্ন বুনে গেলে
লাল কবুতরের গল্প শুনিয়ে উধাও হলে।
চলে যাবার আগে যে নদী ছিল বুনো হাঁসের দখলে
ফণীমনসা তার শরীর জুড়াল এসে।
নন্দিনী,
তুমি চলে যাবার পর
আমার আর রিকশা চালানো হলো না।
তুমি বসে থাকবে আমি চালক—
এই কল্পনা পথ হারাল।
কথা ছিল ঘুরতে ঘুরতে যখন ক্লান্ত
কিন্তু আনন্দ তখনও অফুরন্ত
গাছের সব পাতা মুঠোতে নিয়ে বসে থাকব নদীর ধারে।
অনন্ত সময় পাল্টে দেবে প্রকৃতির সব আলাপন।
তোমার চুলে তখন বাতাসের ক্ষ্যাপাটে শুভেচ্ছা
তোমার কোলে তখন শ্রাবণ-কদমের নির্বিকার শুয়ে থাকা।
চোখ তুলে সাদা মেঘের দিকে তাকাবে মাছেরা,
ফিরে আসবে উড়ে আবার দয়ালু মাছরাঙা
দেখবে গাঙ শালিকের দুপুর বড়ই শূন্য ছায়ায় ঢাকা।
দেখবে দূর পাহাড়ের মগ্ন বিলাসিতা
দূর গ্রামের স্তব্ধ সময়ের আনাগোনা।
নন্দিনী,
তুমি চলে যাবার পর
সব স্বপ্ন ভেঙে প্ল্যাটিনাম গলেছে হৃদয়ের।
তুমি চলে যাবার পর আমি অধরা
তোমার স্বপ্ন এখন বকুলতলার উঠোনে।
তুমি ধু ধু সাগর জল।
২৬.০২.২০১৭
 

 

নন্দিনী তোমাকে ভালোবাসি!

নন্দিনী,
যত দূরেই যাও তুমি
তোমার স্বপ্ন আমাকে টানবে শুভ যুদ্ধের ময়দানে
যত দূরের পথিক হও না কেন
আমার হাসি তোমার শরীর ছুঁয়ে দেবে।
তুমি শুনতে পাবে নিরালার রূপালি কণ্ঠ।
কখনও যদি আনমনে থাকো, বিলাসি জীবনে একাকী
যদি থাক নৈঃশব্দের জানালায় দাঁড়িয়ে
ছুঁয়ে যেও আমার হাত, রেখ তোমার সুখের আদর।
তোমার দুঃখের দিন, তোমার কষ্টের রাত
সবটুকু নিয়ে আমি তোমাকেই ভালোবাসি।
২৮.০২.২০১৭
 

 

নন্দিনীর অনিঃশেষ প্রেম!

নন্দিনী,
আমাদের প্রেম অনিঃশেষ সময়ের গল্প বলে।
চলে যাওয়া দিন, খুশির আলোমাখা রাতের কোলাহল
আর আনন্দ ভালোবেসে আজকের আমরা।
নন্দিনী,
তোমার পথ চলা আমার ভাল লাগে
তোমার কুসুম কালো চোখের সুখ কাছে টানে
তোমার বেঁচে থাকা জীবনে আমি রহস্য খুঁজি।
নন্দিনী,
মনে পড়ে রাত গেছে বেদনার স্মৃতি নেড়ে
তবু ভালোবাসা ছিল বসন্ত বাতাসে
শীতের নিমজ্জিত আলো ছেনেছি দু’জনে।
যে চোখে স্বর্ণালু খেলা করে তার দিকে চেয়ে
খরবেগ রাস্তায় দেখেছি উড়ছে তোমার মদির চুল।
২৮.০২.২০১৭
 

 

প্রেমের আরতি!

ছল-চাতুরী শিখিনি কোনো দিন।
তবু স্রোত ভেঙে যেতে চায় মন।
মন্দিরে পূজার উপাচারে ব্যস্ত রাঙা হাত
বাইরে দাঁড়িয়ে আমি
ভক্তির আরতি ঢেলে বুদ্ধের দিকে নম্র নেত্র।
বুকে বাজে আশা
তথাগতের প্রণাম শেষে একটু করুণা দৃষ্টি!
দেবতা জাগে, দেবী হয়ে দেখা দেয় সবুজ নন্দিনী
দৃষ্টিতে লেগে থাকে অভিমানী গ্রীবা।
বাক্যালাপে ছন্দের খেলা? নাকি আসল ভক্তি?
দৃষ্টি ছুড়ে বলে যায়—
যদি জাগে ঢেউ এসো তবে আমার সাথে।
তবু কামনার প্রেম তুচ্ছ জেনেছি দুজনে।
নদী চলে যায়। আলো পড়ে থাকে তীরে।
আকাশের ঢেউ কেঁদে ফেরে নিরালায়।
পূজা শেষে ধাবমান ওই আঁখি—
প্রেম পথে হাঁটার বারতা জানায়।
পথ তার খুঁজে পায় ঘর
জেগে ওঠে ঠোঁটের আদর।
মিলনের গানে অরণ্য রঙিন—
বাতাসে বিলোল রাইকিশোরীর কাঁসর ধ্বনি—
ঢেউ দুলে আকাশ ভাঙে, মোহনার দিকে নদী—
পৃথিবীর হলাহলে, সৃষ্টির বীজ বুনে,
বাসনা উজাড় করি আমরা দু’জন।
০১.০৩.২০১৭
 

 

নন্দিনী, ময়নামতি তোমার কথা বলে!

নন্দিনী, ময়নামতির সন্ধ্যা!
ঢেউ তোলা চাঁদের নিচে একা আমি।
আকাশজুড়ে নিস্তব্ধতার কোলাহল,
চারিদিকে ফিসফাস, খয়রঙা ইট
পুরোনো ঘাসের খোলস থেকে কোনো এক প্রারমিতা
ডেকে নিল গভীরে, নিরিবিলি আলিঙ্গনে।
নন্দিনী,
পতিত ইটের ভাণ্ডারে তোমাকে পেলাম আমি
তোমার নাম ধরে কে যেন দিল ডাক, দিল কি?
নামের সংকেতে ফিরে তাকাতেই দেখি
গৌতম বুদ্ধের অঙুলি নির্দেশ।

নন্দিনী,
এ কোন নগর, যার দ্বারে দাঁড়িয়ে স্বয়ং তথাগত!
এ কোন কুটির যার ছায়ায় বিদগ্ধ যুবকের আনাগোনা!
দুঃখের নির্বাণ নিয়ে রাতদিনের বিশাখা যজ্ঞ?
নন্দিনী,
আলোতে শরীর ধুয়ে মৈত্রী সংঘের বাণীতে
আমরা সুর তুলি
বুদ্ধের দয়া মাগি।
জেগে ওঠে প্রাচীন নগর-
দেখি তোমার নাম ধরে ডাকছে তিষ্য রাজকুমার
তোমার গুণগান করছে বিদুষী জিতসোমা
এ প্রাচীন নগরে এসে কোশলপতি
তোমার রূপের কথাই বলেছে আমাকে।

নন্দিনী,
এ নগরে শালবন এখন স্নিগ্ধ অন্ধকার
জাতকের গল্প রঙ ছড়িয়ে সবুজ ঘোড়া।
এ নগরে,
তোমাকে দেখছি হেঁটে যাচ্ছ পুথিশালার পাশ দিয়ে
তোমাকে দেখছি আচার্যের সামনে দাঁড়িয়ে জোড়হাতে
মন্দিরের আঙিনায় বসে মুগ্ধ চোখে দেখচ্ছ করুণা বৃষ্টি
তোমাকে দেখছি গেরুয়া চরণ ছুঁয়ে নত মস্তকে
তপস্যার জপমালা তোমার নীলাঞ্জল।
নন্দিনী, ময়নামতি তোমারই কথা বলে…।
০৪.০৩.২০১৭
 

 

বৌদ্ধমন্দিরের দুপুর!

নন্দিনী,
রোদ ঝলমলে ভিড়
অথচ তুমি ছাড়া কি ভয়ংকর শূন্য।
ক্রমশ বিকাল গড়িয়ে নরম হয় মাটি
রাতের বাতাসে চোখ মেলে ভালোবাসার জল
ঠিক তখন রহস্য এক ডাকে জেগে উঠলে তুমি।
হাত ধরে নিয়ে গেলে বোধিকুমারের পর্ণ কুটিরে।
নন্দিনী,
তোমার নগর, তোমার দুপুর, তোমার আলোভরা রাত
জীবন এখানে শতমুখী বৃক্ষ
জীবন এখানে একমুঠো সুখ
হাঁটুগেড়ে বসে থাকি সেই জীবনের সামনে।
রাত বাড়ে, সুজাতা এসে ডেকে নেন ভোজনশালায়
তথাগত বলেন বনচ্ছায়ে তোমার হারিয়ে যাবার গল্প।
নন্দিনী,
এ বৌদ্ধবিহারে, এ প্রাচীন শালবনে
চারিদিকে তুমি আর তুমি
আকাশ-বাতাসে মেঘমল্লারে
ফুলে ঢাকা পাখির কলতানে।
তবু নীল, তামাটে আর লাল দিগন্তে
ধুলো আর সমুদ্র ঘিরে
রঙ ছুঁয়ে, অসীম প্রান্তর পেরিয়ে
খুঁজে ফেরা তোমাকেই।
ময়নামতি, ময়নামতি আমার
বারবার তোমারই ঘরে—
ঘুরেফিরে আসব আমি—
চিরকালের নন্দিনী ছায়ায়।
০৪.০৩.২০১৭

[এনটিভি থেকে]