মুক্তিযুদ্ধের গল্প : একাত্তরের আগুন সময়

আপডেট: 03:28:47 15/12/2016



img

শাহনাজ পারভীন

সকাল থেকেই মরার কাকটা কা কা করছে। খারাপ স্বপ্নটা দেখে রাত দুপুরে সেই যে ঘুমটা ভেঙে গেল, পোড়া চোখে আর ঘুম আসছে না শায়লা বেগমের। কয়দিন হলো যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কলেজ পড়য়া ছেলেটা যুদ্ধে গেছে। ছেলের বাবা গিয়েছে আরো আগে। সাহসী মেয়েটা বায়না ধরেছে সেও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করবে। কোলের ছেলেটাকে নিয়ে গেছে ওর নানা। পুতুলের মতো ছোট মেয়েটি ওর কাছছাড়া হয় না। পুতুলের তুলতুলে দেহ নিয়ে বিড়ালের মতো সারাক্ষণ মিউ মিউ করে। কিন্তু যুদ্ধের আবহাওয়ায় সেও কেমন নীরব। অকারণ মিউ মিউ স্বভাব তার পালিয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটির যেন সামনে বৃত্তি পরীক্ষা। চুপচাপ নিশিদিন। ওর নানি খুব চিন্তিত। শায়লা তো কোলের বাচ্চাটাকে ঠিকমতো যত্ন নিচ্ছে না।
চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। সবাই যুদ্ধ করছে। শুধু শায়লা বেগমরা, নারীরা, গৃহিণীরা কিছু করছে না। আসলেই কি তারা কিছু করছে না? সেই যে ৭ মার্চ, ঢাকা রেসকোর্স ময়দান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ সেই থেকে বাঙালি জাতি তৈরি। স্বাধীনতা শব্দটি তারা তাদের করে নিয়েছে। কীভাবে সেটিকে ছিনিয়ে আনতে হবে তার জন্য তারা প্রস্তুত। অপেক্ষা শুধু সময়ের। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী ঢাকাকে কসাইখানা বানালো। রক্তের বন্যায় ভেসে গেল ঢাকা শহর। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। মেজর জিয়া কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দিলেন- আমি মেজর জিয়া বলছি...। সেই ঘোষণায় মানুষের রক্তে আগুন ধরেছে। বাঙালির সন্তানরা বীর বিক্রমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
স্কুল কলেজ বন্ধ। পড়াশুনার চাপ নেই সিমনের। এক প্রকার ঘরে বন্দি হয়ে আছে মেয়েটি। শায়লা বেগমেরও রান্না বান্নার চাপ নেই। কী এক অলস সময় পার করছে পুরো পরিবার। শুধু পরিবারই বা কেন, গোটা জাতিই তো তথৈবচ। নানা ভাবনা মাথার মধ্যে পোঁ পোঁ করে শায়লা বেগমের। গতকাল রাশেদ মোল্লা কেমন ঘুরঘুর করছিল। ওর মতলব ভালো মনে হয়নি। ও তো পাক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছে। শান্তি কমিটির সদস্য সে। শান্তির নামে পাক বাহিনীর গাড়ির সামনের সিটে বসে থাকে। পথ দেখিয়ে চিনিয়ে নিয়ে যায় গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা। এর পুকুরের মাছ ওর বাড়ির মুরগি ওর খামারের গরু ছাগল জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। লোকে তাকে ভয়ও পাচ্ছে। ভয় না করেই বা করবে কী? পাক বাহিনী তো এদেশের মানুষের হাড়ির খবর নাড়ির খবর জানে না। ওরা সব জানে। ওদের গোয়েন্দাগিরির জন্যই পাক বাহিনী এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এত অত্যাচার করছে মানুষের উপর। কী জানি, রোজ আসছে ছেলের খোঁজে, ছেলের বাপের খোঁজে। সব মিলিয়ে সে কী করে বসে। রাশেদ মোল্লা যদি পাক বাহিনীদের খবর দেয়? দেখতে দেখতে মেয়েটা আমার তর তর করে বড় হয়ে উঠছে। শায়লার ভাবনায় ছেদ পড়ে ওর চাচিশাশুড়ির কথায়:
`নোয়া বউ, সোমত্ত মেয়েটাকে নানাবাড়ি পাঠাও না ক্যান? ওকে না পাঠিয়ে কোলের বাচ্চাটাকে পাঠালে? তোমার তো বুদ্ধি ভালো। কিন্তু এইডা তুমি কি করলে? শোন নাই, দক্ষিণপাড়ার রিজিয়ারে নিয়ে গেছে কাল রাতে? মাঝরাতের চেঁচামেচিতে সেই যে ঘুম ভাঙল, আর ঘুম আসল না। ফজরের পরে কিয়ামুদ্দি চাচা এই বাজ পড়া খবর দিল।’
-‘তাই নাকি? কী কন চাচিআম্মা? গেছে রাত আমারও তো এক ফোটা ঘুম হয়নি। রিজিয়া তো এক রত্তি মেয়ে। ভাল ছাত্রী। সে ক্লাসে ফার্স্ট হয়।’
‘রাখো তোমার ফাস হওয়া। বুঝতি পারিচো, মেয়েটার জীবন চিরজীবনের জন্যি নষ্ট। তুমি তুমার মেয়েডার এক ব্যবস্থা কর।
-‘কী করব চাচিআম্মা। কী করে তাকে পাঠাব বাবার বাড়ি? গ্রামেও নানান ঝামেলা রয়েছে। মনু ভাইয়ের ছেলেটা হয়েছে একটা আস্ত অমানুষ। গত মাসে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। দেখেন! সাহসের কী বলিহারি? ক্লাস টেনে পড়া মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠায় যে কি না প্রাইমারির দরজা ডিঙোয়নি। এখন তো যুদ্ধ শুরু হয়েছে। না জানি, আরো কত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নিশ্চয়ই! ধন সম্পদ থাকলে কি মানুষ রাজা হয়ে যায়?’
-‘গজবও তো পড়ে না ওদের উপর? মন খারাপ করো না নোয়া বউ। এর বিচার হবেই হবে। সময়েই সব ঠিক হয়ে যাবে। তয় নোয়া বউ, একখান কথা। তুমি ওরে কোনোভাবেই ঘরের বাইর হতে দিও না। আমার চিন্তা এখন শুধু শিমনরে নিয়ে। দেখতে দেখতে মেয়েটা রাজকন্যার মতো সুন্দরী পরী হয়ে উঠল।’
শায়লা বেগম জানে, মানুষ যখন অসহায় হয়ে যায়, নিজের কোনো কিছু করবার থাকে না, সব যখন তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়, তখন সে তার বিচার আল্লাহর দরবারে দেয়। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে নিজে নিশ্চিন্ত হতে চায়। কিছুটা হলেও শান্তি খোঁজে।
-‘আমারও তো ঐ একই চিন্তা। কী করি চাচিআম্মা বলেন?’
-‘চিন্তা করে আর কী করবা? দোয়া কর আল্লাহর কাছে। আমিও দোয়া করি নোয়া বউ।’
-‘ কী যে হবে বুঝতে পারছি না।’
-‘ও আর এক খবর, শোনো নাই? গত রাতে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা মধুমতি নদীর উপরের ব্রিজটা ভেঙে দিয়েছে। পাক বাহিনীর যশোর যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। এই জন্য এই কামারখালীতেই ওরা ওদের রাগ ঝাল মিটিয়ে নেবে। দেখে নিও, তাণ্ডব শুরু হবে আজই। কী প্রতিশোধ নেয় দেখো। আজ রাতেই কিছু একটা ঘটবে।
শায়লা বেগমের চাচিশাশুড়ির কথা মুখে থাকতেই দৌঁড়ে আসে মিজান। শায়লা বেগমের ভাসুরের ছেলে সে।
-‘নোয়া চাচি, ও নোয়া চাচি। পাক বাহিনীর গাড়ি সব লাইন দিয়ে আসছে। ব্রিজ ভেঙে দিয়েছে বলে বাজার পার হতে পারছে না। যদি বাঁচতে চান তো এবার আমাদের বাড়ি ছাড়তেই হবে। শিমন কই? ও শিমন তাড়াতাড়ি কর। চাচি, দেখতে না দেখতেই বাজারের সব দোকানপাট ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে গেল। মানুষ শুধু দৌড়াচ্ছে। যার যার জান নিয়ে পালাচ্ছে।’
কিন্তু শায়লা বেগমের পা চলে না। তার যত চিন্তা তার ছেলেকে নিয়ে। শুনেছে তার ছেলে শাওনের সাথে এলাকার অনেক ছেলেই যুদ্ধে গেছে। তারা রাতের অন্ধকারে তাদের বাড়িতে আসে। মাকে দেখে যায়। শায়লা ভাবে, যদি আমার শাওনও রাতে পালিয়ে আমাকে দেখতে আসে। এসে যদি ডেকে ডেকে না পায়? ওর মন খারাপ হবে। ও চিন্তা করবে। ওর জন্যই আমার থাকা দরকার। ওর বাবারও কোনো খোঁজ নেই। সে গেছে ভারতে। ট্রেনিং শেষে আসবে দেশে।
শায়লা বেগম আর কিছু ভাবতে পারে না। নিজের শরীরটাও ভালো না। পায়ে একটু একটু পানি জমেছে। ডাক্তার বলেছে
-‘এই বয়সে কনসিভ করা বেশ ঝঁকিপূর্ণ। মনে জোর রাখুন।’
কিন্তু শায়লা বেগমের মনে আর আগের মতো জোর নেই। চোখজুড়ে যখন তখন ঘুম আসতে চায়। মনে হয়, সমস্ত চিন্তা ভাবনা এক পাশে সরিয়ে রেখে এখানে এই বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ুক।
কয়েকটা কাক কা কা উড়ে যায়। পরিবেশের খবর বুঝি পশু পাখিরা বুঝতে পারে সবার আগে। ফরিদপুর জেলার শেষ সীমানা মধুমতির পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে তকতকে পাড় এই কামারখালীতে এর আগে এত কাক দেখা যায়নি। কিন্তু যুদ্ধ এদেরকে কোথা থেকে তাড়া করে এখানে এনেছে? কী খবর এনেছে কাকগুলো তা বোঝার জন্য শায়লা বেগম বারান্দা থেকে আস্তে আস্তে উঠোনে নেমে আসে। চোখের উপর হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু একী! শোঁ শোঁ শব্দে সারা আকাশ পাকিস্তানি প্লেনে ছেয়ে গেছে। শোঁ শোঁ আকাশ কাঁপানো শব্দ। ভয়...আতংক।
- ‘নোয়া বউ, তাড়াতাড়ি চলো। হলদেডাঙ্গার ঘাট পার হয়ে বাবুখালী, নাগরা হয়েই তোমার বাপের বাড়ি ভাটরা যেতে হবে। মাগুরা হয়ে ঐ সোজা লাইনে যাওয়া যাবে না। ওপাশ দিয়ে গেলে বেশি হাঙ্গামা হবে। বিনোদপুর যেতেই অনেকটা সময় চলে যাবে। তাছাড়া এই মধুমতি পার হওয়াও সহজ কথা না।
তাড়াতাড়ি করো। স্কুলঘর পার হয়েই মাঠ বরাবর যেতে হবে। এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না।’
খুব দ্রুত ছুটে আসে শায়লা বেগমের সেজো ভাসুর। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢোকে। মুহূর্তেই বের হয়ে আসে মাঝারি একটা স্যুটকেস হাতে নিয়ে।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

আরও পড়ুন