মুক্তিযুদ্ধের গল্প : একাত্তরের আগুন সময়

আপডেট: 02:10:57 04/01/2017



img

শাহনাজ পারভীন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

শায়লা বেগম বাম হাতে ছোট একটা স্যুটকেস এবং ডান হাতে ছোট মেয়ে শ্যামলীর হাত ধরে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। সাহসী মেয়ে সিমন কেমন চোখ মুখ শক্ত করে মায়ের পাশে আসে। শায়লা বেগমের ছোট জায়ের এখনো আঁতুড় কাটেনি। একুশ দিন আগে তার একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। আজ ওর সটির দিন। প্রথম বাচ্চা। প্রথম আনন্দ। সকাল থেকেই তোড়জোড় ছিল আনুষ্ঠানিকতার। বড় খাসি দিয়ে বাচ্চাটার আকিকা হবে। বাপের বাড়ির লোকজন পাড়া প্রতিবেশি সবাইকে দু’মুঠো ভাত খাওয়ানোর ইচ্ছে তার বহুদিনের। কিন্তু সকালের শুরুতেই সব ওলোট পালোট। সেও এক ঝটকায় ঘুমন্ত মেয়েটাকে নিয়ে পথে বের হয়।
কখনও হাঁটছে, কখনও দৌঁড়াচ্ছে। পেছনে শুধু আগুন আর শব্দ। শব্দ আর আগুন।
: এত আগুন কেন সেজো ভাই?
শায়লা বেগমের প্রশ্ন শুনে সেজো ভাসুর লুৎফর খবীর পেছন ফিরে তাকান।
: সতীশ বাবুর পাটের গুদামে আগুন দিয়েছে অমানুষের বাচ্চারা।
: বলেন কি সেজো ভাই? আপনার চাকরি তো ওখানেই। কী হবে তাহলে?
: শুধু কি আমার চাকরি ওখানে? আশে পাশের দশ গ্রামের মানুষের চাকরি ওখানে। বিভিন্ন লোক বিভিন্ন পেশায় কাজ করে। প্রতিদিন কত যে শ্রমিক পাটের মিলে ছুটো কাজ করে তারও ইয়ত্তা নেই। থাক, তুমি এ নিয়ে চিন্তা করো না এখন নোয়া বউ। বেঁচে থাকলে চাকরির চিন্তা পরেও করা যাবে।
: সব কিছু রেখে আগে উনার গুদামেই কেন আগুন দিলো সেজে ভাই?
: কারণ উনার নাম যে সতীশ।
: সতীশ বাবু তো মানুষের উপকার করে বলে শুনেছি। উনিই তো এই এলাকার সবচেয়ে ধনী। তাই না?
: হু। উনার মিল কারখানা, মোকাম গুদামসহ দোতলা বাড়ি।
: এলাকায় একজন ধনী লোক থাকলে জনগণেরও লাভ।
: তাই তো উনাকেই আগে ধরা হয়েছে।
: ওরা কি মানুষ না কি?
শায়লা বেগম আর কথা বাড়ায় না। সামনের দিকে পা বাড়ায়। দ্রুত পা চালায়। কিন্তু তার মন পড়ে রয়েছে পেছনে। কলেজপড়ুয়া ছেলেটা গেছে যুদ্ধে। তার কোনো খোঁজ নেই। স্বামী বেচারা আছে ট্রেনিংয়ে। শখের ঘরবাড়ি আসবাবপত্র কত কষ্ট করে গোছানো সংসার। দাউ দাউ জ্বলছে পাটের গুদাম। আগুন ধোঁয়া। সারা আকাশজুড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলি। সকালটা যেন হঠাৎ করেই কালো মেঘে ছেঁয়ে চোখের সামনে সন্ধ্যা হয়ে গল।

পেছনে পড়ে থাকলো সাধের ঘরবাড়ি। উঠোন। সারি সারি গোলাপের চারা। বেগুনভর্তি লম্বা বেগুনের বাগান। বাগানটা করতে মশিউর দিনরাত তাকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। ওর মা নেই। বাপ নেই বললেই চলে। অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছে। ওর খোঁজ খবর নেয় না। শায়লা বেগমই তার মা। তার বাবা। হঠাৎ মশিউরের জন্য শায়লা বেগমের মনটা পুড়ে যায়। ছেলেটার যে কী হলো কে জানে। যুদ্ধ শুরু হলো তো ওর রক্তও টগবগ করলো। দেশ স্বাধীন করেই ফিরবে।
ও শুনেছে দেশ স্বাধীন হলে চাল ডাল সস্তা হবে। কাজ পাবে সবাই। আমাদের কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ঠেলে যে পাট চাষ করে তার সব চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাহাদুরি করে তারা। মিল কারখানায় তা দিয়ে উৎপাদন হয় বিলাস ব্যসন। এর বিহিত সে করবেই করবে। মশিউর থাকলে শায়লা বেগমের কষ্ট একটু কম হতো। মেয়েকে একথা বলতেই সে বলে-

: মা, আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হোক। আমাদের শত কষ্ট হোক, তারপরও দেশ স্বাধীন হোক। মশিউররা যুদ্ধ করুক। মশিউরের দেখাদেখি ওর বয়সী অন্যরাও যুদ্ধে গেছে সেটা আমাদের ফ্যামিলির জন্য গর্বের।
: এজন্যই তো। আমাকে বলার সাথে সাথে আমি রাজি হয়ে গেলাম। ও যুদ্ধে গেছে সেটা আমাদের দেশের গৌরব।

শায়লা বেগমের মনটা আবার মোঁচড়ায়। পেছনে তাকায়। মানুষ...শুধু মানুষ। পিঁপড়ার সারির মতো মাথা। আঁকা বাঁকা। সোজা লাইন। পেছনের আকাশটা টকটকে লাল। আগুনের কুণ্ডুলি। পোড়া টিন উড়ে উড়ে পড়ছে এ বাড়ি ও বাড়ি। কাছের দূরের। মড়াৎ মড়াৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে দূর থেকেও। ঠাস ঠাস গুলির শব্দ। কী জানি, সতীশ বাবুর পাটের গুদাম তো শায়লাদের বাড়ির কাছাকাছি। এতক্ষণে তার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হলো নাকি? শায়লার মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কাঁদো কাঁদো চোখে, ভেঙে যাওয়া হৃদয় নিয়ে পা বাড়ায় সামনে। হঠাৎ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কেঁদে ওঠে শায়লার ছোট জা রোকসানা।
: আমার সর্বনাশ হইছে নোয়া বু। আমার মহা সর্বনাশ হইছে। আমার কোলে তো আমার মণি নাই!
ওর গগনবিদারী চিৎকারে আকাশটা কেঁপে ওঠে। কান্নায় চারপাশ ভারি হয় মুহূর্তেই।
বুঝতে পারে না শায়লা বেগম। মেয়েটা কী বলে? কোলের কচি শিশু কোলে নেই! মানেটা কী? এখানে তো কোনো গোলাগুলি হয়নি। তাহলে? তবে ও এই প্রথমবার মা হয়েছে। অল্প বয়স বুঝে উঠতে পারে না। বাচ্চাদের যত্ন আদর বোঝে না। এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি। সারাদিন ঐ এক ঘোরের মধ্যে থাকে। কী এক স্বপ্নের মধ্যে থাকে। সময় পেলেই বই খুলে বসে। লেখালেখি করে। বাচ্চাটা পাশে শুয়ে কচি কণ্ঠে কাঁদে। ওর কান পর্যন্ত পৌছায় না তা কখনো কখনো। তাই বলে কোলের শিশু কোলে থাকেব না, এটা কেমন কথা? এগিয়ে যায় শায়লা।
: ওমা তাই তো! মণি কই? তোমার মেয়ে কই?
 : জানি না বু। আমি জানি না আমার মেয়ে কই? আবারও গগন বিদারী চিৎকারে ভরিয়ে তোলে চারদিক। আমার মণি কই? আমার মণি কই? প্রচণ্ড রকম কান্নাকাটি শুরু করে রোকসানা।
তাড়াহুড়োর মধ্যে ঘুমন্ত শিশুটাকে রেখে পাশে থাকা কোলবালিশ কাথা কাপড় জড়ানো অবস্থায় নিয়ে চলে এসেছে রোকসানা। ও ভেবেছে এটাই ওর ঘুমন্ত মেয়ে। হায়রে কপাল! হায় রে যুদ্ধ! শায়লা জানে, যুদ্ধ সব সময়ই শিশু আর নারীদের জন্য নৃশংসতা বয়ে আনে। কিন্তু এইভাবে? এখন কী করা যায়? বাচ্চাটা কি এখনো বেঁচে আছে? নাকি দানব আগুনের পেটে এতক্ষণে দাউ দাউ জ্বলছে সে?

ওদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে এগিয়ে থাকা সেজ ভাসুরকে উৎকণ্ঠায় জোরে জোরে ডেকে ওঠে শায়লা বেগম। ঘটনা শোনার পর আবার পেছনে দৌড়ায় সবাই। পাথর সময়গুলো মুহূর্তেই কালো গহ্বরে ঢুকে যায়। এক মুহূর্ত আগেও কি ওরা যে কোনো মূল্যে পেছনে ছুটতে রাজি হতো? আসলে সময়ই মানুষকে শাসন করে, সময়ই মানুষকে সাহস জোগায়।

পাশের ঘরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। ছোট বউয়ের ঘরটা এখানো ধরেনি। বাচ্চাটা পায়খানা প্রসাব করে একাকার। কাঁদতে কাঁদতে মরার অবস্থা। রোকসানা পাগলের মতো বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেজ ভাসুরের সামনেই দ্রুত হাতে ব্লাউজের হুক খুলতে থাকে।

আবার পেছনে সরে যায় চির পরিচিত ঘর। উঠোন। আঙিনা। সীমানা। দৌঁড়ায়। হলদেডাঙ্গার ঘাটে হাজার হাজার নারী পুরুষের বিলাপ। আহাজারি। সকলের চোখে রাতের ঘন অন্ধকার। হতাশা। লাফিয়ে লাফিয়ে নৌকায় উঠতে চেষ্টা করছে সবাই। শায়লা বেগমরাও ঘাটে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই রহিম চাচার নৌকাটা এসে ঘাটে ভেড়ে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ওরা সবাই নিশ্চিন্তে নৌকায় ওঠে।
রহিম চাচা শায়লাদের পাশের গ্রামে থাকে। শায়লা বেগমের বিয়ে হয়েছে পর্যন্ত সে রহিম চাচার নৌকায় ঘাট পার হয়। কাজিবাড়ি থেকে যখন ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়ি এসে ঘাটে দাঁড়াতো শায়লা বেগমের জন্য, তখনই রহিম চাচা জানতো তাদের শায়লা মা নদী পার হবে। ঘোড়ার গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে সেও তার নৌকা নিয়ে বসে থাকতো এ পাড়ে। শেষে আবার শায়লা মায়ের কষ্ট হয় অপেক্ষা করে। বাবার বাড়িতে পৌঁছে বাবাকে সে কথা বলতেই বাবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতো। মাঝি কাকাকে পুষিয়ে দিতেন বাবা। সেই মাঝি কাকাকে দেখে শায়লা বেগমের মন এক ধরনের প্রশান্তিতে ভরে যায়।
: কীরে মা, তোরা?
: হ্যাঁ কাকা।
: দেশের অবস্থা যে হইলো মা? তোমাগো ঘরবাড়ি ঠিক আছে তো? আগুন যা জ্বলবার লাগছে...
: জানি না কাকা। আল্লাই ভাল জানেন কি অবস্থায় আছে। শায়লা শান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। কে কার আগে ওঠে। এই ঘাটে বোধ হয় এর আগে এত লোক একসাথে হয়নি। হাতের স্যুটকেসটা আস্তে সাবধানে নৌকার গলুইয়ের মধ্যে সেরে রাখে শায়লা। শায়লাদের নৌকা মাঝনদীতে না যেতেই শুরু হয় গোলাগুলি। কালো কালো মাথা পানিতে ভাসতে থাকে। সিঁদুরের মতো লাল রং রক্ত পানিতে মেশে।
নৌকা এ পাড়ে ভিড়তে না ভিড়তেই লাফিয়ে লাফিয়ে চরে নামে সবাই। আবার দৌড়ানো শুরু। বেশ কিছুটা পথ আসবার পর সে আবিষ্কার করে তার হাতে বহু আকাঙ্ক্ষিত স্যুটকেসটা নেই। যার মধ্যে আছে তার সারা জীবনের গোছানো সঞ্চয়।

শায়লার মাথা বোঁ বোঁ করে ঘোরে। কী করে কাকে বলবে এই কথা? ওর মধ্যেই যে তার জীবনের শেষ সম্বল। সব কিছু। সোনা গহনা টাকা পয়সা। নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য বানানো গহনা সব। স্বামীর ফিক্সড্ ডিপোজিটের কাগজপত্র, টাকা পয়সা, জমির দলিল। আরো কত কিছু। কী করে বলবে সে! আসলে এই বিপদে দীর্ঘদিনের পরিচিত মাঝি কাকাকে দেখে ওর মধ্যে এক ধরনের নিশ্চিন্ততা তৈরি হয়েছিল। মনে এসেছিল নির্ভরতা। স্যুটকেস নিয়ে ওর মধ্যে আর আলাদা ভাবনা কাজ করেনি। সেজ ভাসুরকে বলতেই তিনি প্রচণ্ড রেগে যান।
: এই তোমাদের মেয়েদের অবস্থা। কেউ কোলের বাচ্চা ফেলে এসেছো। কেউ স্যুটকেস ফেলে আসলে নৌকায়। বিপদ দেখলে কি মানুষকে হুঁশহারা হয়ে যেতে হয় নোয়া বউ? তোমাকে তো আমি অনেক জ্ঞানী ভাবতাম। কিন্তু তোমারও তো বুদ্ধি ভাল না। যাক গে, ও স্যুটকেস আর আনতে হবে না। থাক ওর মধ্যে। ওর মধ্যে আর অতো কী আছে? পাক বাহিনী নিশ্চয় এতক্ষণে নদী পার হওয়া শুরু করেছে। ফেরার সময় দেখলে না আইনুদ্দিরে। কেমন পিট পিট করে তাকাচ্ছিল। সেই তো সব পথ চেনাচ্ছে।
শায়লা বেগম ছোট মানুষের মতো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। আর যাই হোক, নোয়া বউকে কখনো মেয়ে মানুষের মতো কথায় কথায় কাঁদতে দেখেনি লুৎফুল খবীর। হঠাৎ নোয়া বউয়ের এই আচরণ দেখে হকচকিয়ে যান তিনি।
: কী হয়েছে? কাঁদছো কেন তুমি? কী আছে তার মধ্যে?
: সেজো ভাই আমার টাকা পয়সা সোনা গহনা সব রয়েছে তাতে। সব। সবকিছু। সাবধানতার জন্য সেরে রেখেছিলাম গলুইয়ের মধ্যে। গোলাগুলির শব্দে ভুলে গেছি আমি।
: এখন কি আর পাওয়া যাবে তা?
: ভাই, যেতেও তো পারে। মাঝি কাকা আমাদের চেনা জানা।
: কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে সে কি আর দেখেছে? খেয়াল রাখার তো কথা না। হিসাব তো মেলে না। তারপরও...। চলো। দেখো যাক।
আবার ছুটলো পেছনের দিকে। হা... পেছন তো ওদের পেছন ছাড়ছে না। ওরা যতই এগোতে চাক পেছন যাচ্ছে ওদের সাথে সমান্তরালে।
নৌকাটা ততক্ষণে মাঝ নদীতে। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে থেকে নৌকাটা এপাড়ে আসলে পাগলের মতো তন্ন তন্ন করে খোঁজে শায়লা। না নেই। কোথাও নেই। কোনোখানে নেই। নৌকার গলুইয়ের নিচে একেবারে ফাঁকা। মনটা হাহাকার করে ওঠে। ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। এই একটু আগে প্রথম যখন মাঝি কাকার নৌকাটা দেখেছিল শায়লা তখন হাজারো বিপদের মধ্যে ওর মনে একটু শান্তি একটু প্রশান্তির পরশ বয়ে গিয়েছিল। ওকে অনেক সুখী, নির্ভার লাগছিল। কিন্তু একটুখানি সময়ের ব্যবধানে পাহাড়সমান কষ্ট ওর বুকে এসে বিঁধছে। নিজেকে ওর রাস্তার ফকিরের মত নিঃস্ব, অসহায় মনে হচ্ছে। আল্লাহ কি না করতে পারেন! হা আল্লাহ! টাকা পয়সা ছাড়া এখন কী করে চলবে? স্বামী সন্তান ছাড়া পথে নেমেছে। যুদ্ধ করছে চারদিক থেকে। অথচ সে যুদ্ধ করছে না!

কেউ তো বলবে না যে শায়লা বেগম যুদ্ধ করেছে। এটা কি যুদ্ধ নয়? শায়লার চিন্তার বাঁধ ভেঙে যায়। সন্তানের জন্য মনটা পুড়ে যাওয়া, স্বামীর চিন্তায় অস্থির হওয়া, সাহসী মেয়েটাকে আগলে রাখা, কোলের বাচ্চাটাকে দূরে নানার বাড়িতে রাখা, অসুস্থ শরীরটাকে টেনে টেনে যুদ্ধের মোকাবেলা করা-এগুলো কি যুদ্ধ নয়?

শায়লা বেগমের ভাবনা আসলে ঠিকই ছিলো। ছেলেরা, মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধ করেছে আর নারীরা, শায়লা বেগমরা? যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধে তাদের সব কিছু খুঁইয়ে, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর বাড়ি সংসার সন্তানদেরকে পাহারা দিয়ে। এটা কি আসলেই যুদ্ধ নয়? নাকি যুদ্ধের চেয়েও অনেক বড় কিছু...?

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু শায়লা বেগমের যুদ্ধ তো শেষ হয় না। এই মুক্তিযুদ্ধে তার লায়েক ছেলেটা নিখোঁজ হয়। স্বামী শহীদ হয়। সোমত্ত মেয়েটাকে পাক হানাদাররা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। ঘর বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়। সাধের গহনা, জমানো টাকা সব হারায়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়, তথন সে তালিকায় শায়লা বেগমের নাম ওঠে না। নাম ওঠে না মশিউরের। তার কী পরিচয়? তার ঠিকানা কী? তার ঘর কোথায়? তার বাড়ি কোথায়? কে তার বাবা? কে তার মা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শায়লা বেগমের জানা নেই। যে যুদ্ধে স্বামী, সন্তান, সংসার, সম্পদ হারিয়ে সে নিঃস্ব, অথচ সেই নাকি এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি!
শায়লা বেগম অবাক হয়ে ভাবতে থাকে- এই হচ্ছে নারীদের যুদ্ধ। সব হারালো অথচ যুদ্ধে অংশ নিতে পারল না তারা!
সময় শেষে সে এখন নতুন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সংসার তো গোছাতে হবে! বাঁচতে হবে। তার একার কথা না হয় বাদ- ই দিলো। কিন্তু তার অনাগত সন্তান? আরো যে সন্তান রয়েছে তারা তো সময় হলে ঠিকই মায়ের কাছে খাবার চায়। নিরাপত্তা চায়। কীভাবে সে তাদেরকে এড়িয়ে থাকবে? তারা কোথায় যাবে? শায়লা বেগম ভাবে- সবার যুদ্ধ শেষ কিন্তু তার যুদ্ধ শুরু। সে নিজেকে বড় অসহায় মনে করে। আজ যদি ফারহানা আপার মতো তারও একটা চাকরি থাকত। সে নতুন করে উপলব্ধি করে সব মেয়েদেরই পড়াশুনা জানা দরকার। লেখাপড়াই সব চেয়ে বড় বিপদের বন্ধু। তবু ভাগ্যিস, তার লেখাপড়াটা কষ্ট করে হলেও শেষ করেছিল। যুদ্ধোত্তর এলাকায় মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য স্থানীয় সুশীল সমাজ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টায় কামারখালী পোস্ট অফিসের অদূরে একটা নতুন গার্লস স্কুল হচ্ছে। ওখানে অন্যান্য লেখাপড়াজানা মেয়েদের সাথে শায়লার চাকরির ব্যাপারে কথা হচ্ছে। তারা শায়লাকে স্কুলটির হেড টিচারের দায়িত্ব নেবার জন্য সিলেক্ট করেছে। এই সম্ভাবনাময় কথাবার্তা ঘনঘোর অন্ধকারেও তার কাছে নতুন করে এক উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার আভাস আনে।