মুমিনের গন্তব্য জান্নাত

আপডেট: 02:47:12 07/06/2018



img

এম মোহাম্মদ : বৃহস্পতিবার ২১ রমজান। গত হয়েছে মাগফেরাতের দশক। শুরু হলো নাজাতের দশক।
মুমিনের হৃদয়ের অলিন্দে বিদায়ের সুর অনুরণিত এখন। ক্রমাগত প্রান্তসীমার দিকে ধাবমান মাহে রমজান। গেল সন্ধ্যা থেকে রমজানের সার্বিক বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে এলাকার মসজিদে মসজিদে ইতেকাফে বসেছেন বহু মুমিন বান্দা। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি। যার একমাত্র গন্তব্য পবিত্র জান্নাত। আটখানা জান্নাত সুসজ্জিত মুমিন, মুত্তাকিকে সাদর সম্ভাষণ জানাতে। আছে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রিদওয়ান। এ কারণে এক পরম সৌভাগ্যের রজনী উপহার দেওয়া হয়েছে মুসলিম উম্মাহকে। যাকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে কোরআনে। এই রজনী তালাশ করতে হবে প্রত্যেককে ইবাদতের মাধ্যমে। এটা সবাই পরিজ্ঞাত, জিন আর মানবমণ্ডলিকে একমাত্র সৃষ্টি করা হয়েছে রাব্বুল আলামিনের ইবাদতের জন্য। তাই আসুন ইবাদতে গুজরান হোক আমাদের বাকি কটা রমজান।
আমরা এখানে একুশে রমজান লাইলাতুল কদর তালাশ করা সম্পর্কিত হাদিস উদ্ধৃত করছি। আবু সালামা ইবন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আলোচনা করলাম, অতঃপর আমি আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট যাই, তিনি আমার একান্ত বন্ধু ছিলেন। আমি তাকে বললাম, 'চলুন না খেজুরবাগানে যাই!' তিনি বের হলেন, গায়ে উলের কালো চাদর। আমি তাকে বললাম, 'আপনি কি রাসুল [সা.] কে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলতে শুনেছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ,। আমরা রাসুলের [সা.] সঙ্গে রমজানের মধ্য দশক ইতিকাফ করলাম। তিনি একুশের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে খুতবা দিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি লাইলাতুল কদর দেখেছি, কিন্তু আমি তা ভুলে গেছি অথবা আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা তা শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাতে তালাশ কর। আমাকে দেখানো হয়েছে আমি মাটি ও পানিতে সেজদা করছি, যে রাসুলের সঙ্গে ইতিকাফ করেছিল সে যেন ফিরে আসে।'' তিনি বলেন, 'আমরা ফিরে গেলাম, কিন্তু আসমানে কোন মেঘ দেখিনি।' তিনি বলেন, 'মেঘ এলো ও আমাদের উপর বর্ষিত হলো, মসজিদের ছাদ টপকে বৃষ্টির পানি পড়ল, যা ছিল খেজুরপাতার। সালাত কায়েম হলো, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম পানি ও মাটিতে সেজদা করছেন।' তিনি বলেন, 'আমি তার কপালে পর্যন্ত মাটির দাগ দেখেছি।'
আবু সায়িদ রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমরা রাসুলের [সা.] সাথে মধ্যম দশক ইতিকাফ করেছি, যখন বিশ রমজানের সকাল হলো আমরা আমাদের বিছানাপত্র স্থানান্তর করলাম, অতঃপর রাসুল [সা.] আমাদের নিকট আসলেন, তিনি বললেন, 'যে ইতিকাফ করছিল সে যেন তার ইতিকাফে ফিরে যায়, কারণ আমি আজ রাতে (লাইলাতুল কদর) দেখেছি, আমি দেখেছি আমি পানি ও মাটিতে সেজদা করছি।' যখন তিনি তার ইতিকাফে ফিরে যান, বলেন, 'আসমান অশান্ত হলো, ফলে আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হলো। সে সত্তার কসম, যে তাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছে, সেদিন শেষে আসমান অশান্ত হয়েছিল, তখন মসজিদ ছিল চালাঘর ও মাচার তৈরি, আমি তার নাক ও নাকের ডগায় পানি ও মাটির আলামত দেখেছি।”
অপর বর্ণনায় আছে, আবু সায়িদ খুদরি [রা.]‎ বলেন, “রাসুলুল্লাহ [সা.] রমজানের মধ্যম দশক ইতিকাফ করতেন, যখন তিনি প্রস্থানরত বিশের রাতে সন্ধ্যা করে একুশের রাতে পদার্পণ করতেন, নিজ ঘরে ফিরে যেতেন। যে তার সাথে ইতিকাফ করত সেও ফিরে যেত। তিনি কোনো এক রমজান মাসে, যে রাতে সাধারণত ইতিকাফ থেকে ফিরে যেতেন, সে রাতে ফিরে না গিয়ে কিয়াম (অবস্থান) করলেন, অতঃপর খুতবা প্রদান করলেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল তাই তিনি লোকদের নির্দেশ করলেন। অতঃপর বললেন, 'আমি এ দশক ইতিকাফ করতাম, অতঃপর আমার নিকট স্পষ্ট হলো যে, আমি ইতিকাফ করব এ শেষ দশক। অতএব যে আমার সাথে ইতিকাফ করেছে, সে যেন তার ইতিকাফে বহাল থাকে। আমাকে এ রাত দেখানো হয়েছিল, অতঃপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তোমরা তা তালাশ কর শেষ দশকে। আর তা তালাশ কর প্রত্যেক বেজোড় রাতে। আমি দেখেছি, আমি পানি ও মাটিতে সেজদা করছি।' সে রাতে আসমান গর্জন করে বৃষ্টি হলো। একুশের রাতে নবী [সা.] এর সালাতের জায়গায় মসজিদ ফোটা ফোটা বৃষ্টির পানি ফেলল। আমার দু’চোখ রাসুলকে [সা.] দেখেছে, আমি তার দিকে দৃষ্টি দিলাম, তিনি সকালের সালাত থেকে ফিরলেন, তখন তার চেহারা মাটি ও পানি ভর্তি ছিল।”

শিক্ষা ও মাসায়েল
এক. ইলম অন্বেষণের জন্য সফর করা এবং উপযুক্ত স্থান ও সময়ে আলেমদের জিজ্ঞাসা করা।
দুই. শিক্ষকদের কর্তব্য ছাত্রদের সুযোগ দেওয়া, যেন তারা সুন্দরভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
তিন. নামাজির চেহারায় সেজদার সময় যে ধুলা-মাটি লাগে তা দূর করা উচিত নয়, তবে তা যদি কষ্টের কারণ হয়, সালাতের একাগ্রতা নষ্ট করে, তাহলে মুছতে সমস্যা নেই। মাটিতে সেজদা দেওয়া ও সালাত আদায় করা বৈধ।
চার. নবী [সা.] মানুষ, তিনি মানুষের মতো ভুলে যান, তবে খোদাতায়ালা তাকে যা পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন তা ব্যতীত, কারণ সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে ভুল থেকে হিফাজত করেন। নবীদের স্বপ্ন সত্য, তারা যেভাবে দেখেন সেভাবে তা ঘটে।
পাঁচ. নবীর [সা.] লাইলাতুল কদর দেখার অর্থ তিনি তা জেনেছেন, অথবা তার আলামত দেখেছেন। আবু সায়িদ [রা.] থেকে ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন, জিবরিল তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে।
ছয়. আলেম যদি কোনো বিষয় জানার পর ভুলে যান, তাহলে সাথীদের বলে দেওয়া ও তা স্বীকার করা।
সাত. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, রমজানে ইতিকাফ করা মোস্তাহাব। তবে প্রথম দশক থেকে মধ্যম দশক উত্তম, আবার মধ্যম দশক থেকে শেষ দশক উত্তম।
আট. জনসাধারণের উদ্দেশে ইমামের খুতবা দেওয়া ও তাদের জরুরি বিষয় বর্ণনা করা বৈধ।
নয়. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, নবী [সা.] উম্মতকে তাদের কল্যাণের বস্তু জানানোর জন্য উদগ্রীব ছিলেন। লাইলাতুল কদর তালাশে তিনি ও তার সাহাবিগণ সচেষ্ট থাকতেন।
দশ. রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করার ফজিলত, বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, যেহেতু নবী [সা.] কখনো তা ত্যাগ করেননি।
এগারো. লাইলাতুল কদর শেষ দশকে, বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে, আরো বিশেষ একুশের রাত।
বারো. সেজদায় কপাল ও নাক স্থির রাখা ওয়াজিব, যেরূপ নবী [সা.] রেখেছেন।
তেরো. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, নবীর [সা.] যুগে মুসলিমগণ দুনিয়ার সামান্য বস্তু ও সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তাদের মসজিদ ছিল খেজুরপাতার, যখন বৃষ্টি হতো, সালাতে থাকাবস্থায় তাদের ওপর বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ত।
চৌদ্দ. একুশে রমজানের ফজিলত, এটা সম্ভাব্য লাইলাতুল কদরের রাত, অতএব এ রাতে অবহেলা করা মুসলিমদের উচিত নয়।