মৃত্যুচিন্তা নিয়ে সুনীতি দেবনাথের পাঁচটি কবিতা

আপডেট: 09:08:50 10/06/2017



img

জীবন এক দ্বন্দ্ব

ভাবনার জানালা খুলে দরজাটা বন্ধ রাখি
অর্থাৎ আমি আর কিছু ভাবতে নারাজ
জানালা খুলে রেখেছি যতটুকু দেখা যায়
দু 'চোখে ঠিক ততটুকুই দেখবো বলে
দেখবোই বা কি চরাচরে ঝুম অন্ধকার
অন্ধকারে কিছু দৃশ্যপটে আসে না
অন্ধকারই শুধু বিশাল মূর্তিতে থাকে
জানালার ওপাশে সামনে বিশাল বৃক্ষ
সেও এখন স্তূপাকার অন্ধকার শুধু
দুই অন্ধকার মিলেমিশে একাকার
ভাবনার কপাটে খিল একাকার কিনা
দৃঢ়কণ্ঠে বলা তো যাবে না যায় না
জানালায় উপরে তাকালে তবু স্পষ্ট দেখি
নক্ষত্র খচিত আকাশের আশ্চর্য সামিয়ানা
ভাববো না ভেবেও ভাবি এ দেখা সত্য কিনা
অন্ধকারে আমাকেও আমি দেখি না কখনো
আমিও তাহলে সত্য নই প্রচণ্ড এক মিথ্যা
বাইরে এক আমি ভেতরে আরেক জনা
দু'হয়ে এক কি করে যে হয় হিসেবে মেলে না
চেতনে এক অবচেতনে আরেক কেমনে যে হয়
ঘোরতর এই দ্বন্দ্বের সমাধান আমার নেই জানা
দরজা রুদ্ধ জানালা খোলা এটাই তাহলে জীবন




বেলা কালবেলা

আমার দেহকে ঘিরেছে লকলকে নীলাভ
আগুনের শিখা খোলা ময়দানে
ধীরে ধীরে আমি পঙ্গু হয়ে যাই
পায়ের নীলচে শিরাগুলো জট পাকিয়ে
পলায়নের শক্তি অপহৃত হয়
মেরুদণ্ড বেঁকেচুরে কিম্ভুতকিমাকার
আমার সমগ্র অস্তিত্ব বিশ্বাসঘাতক
এই আগুনে খেলায় কালবোশেখী ঝড়
মাতাল উদ্দাম হয়ে ওঠে
বহুকালের পৈত্রিক বসত ভিটে
নড়বড়ে দাপুটে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়ে
ভিটেমাটি থরথর কেঁপে ওঠে
মৃত্যুর করাল উপস্থিতি
বহুদূরে পালিয়ে খলখল হাসে
উঠোনে ফাটলে একটি দোলনচাঁপার ঝাড়
এলোমেলো কাঁপে
সাদা সাদা ফুলগুলো দুমড়ে মুচড়ে
বিকট গন্ধে হা হা অট্টহাসি হাসে
পেছনে গড়িয়ে পালাতে চাই
অতীতের পিতা মাতা দুবাহু মেলে
বড় ক্ষিধে এক দলা
পচাগলা ভাত নাহয় দে
অত্যন্ত স্নেহের সন্তান তুই এতো স্বার্থপর
সামনে তাকিয়ে স্তম্ভিত
হাড় জিরজিরে আমার সন্তানেরা
এলুমিনিয়ামের ভাঙ্গা থালা চাটছে কেবলই
কষ বেয়ে রক্তধারা মেঘনার স্রোতে মেশে
আকাশ পিঙ্গলবর্ণ তার মাঝে বিকলাঙ্গ
আমার স্বপ্ন সব হাহাকার করে
এই অবেলায় কালবেলায় বারুদগন্ধী
আনবিক বোমাটাই ভীষণ আক্রোশে ফাটুক




পিতামহের স্বেচ্ছামৃত্যু

মৃত্যু তোমাকে ছোঁয়নি কোনদিন
জন্মের মাহেন্দ্রক্ষণ একবার এসেছিলো
তুমি ঘর পালালে
অনুচ্চ অরণ্য পার হয়ে
খোলা ময়দানে তেজিয়ান কৃষ্ণ অশ্বের মত
দিনমান ছুটলে কেবল ছুটলে
অচেতনে ছোটার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজারো সাল
প্রজন্মের নিম্নতম সিঁড়ি থেকে বিস্ময়ে
তোমাকে দেখে হতবাক আমি
পাহাড়ের উত্তুঙ্গ শিখর টপকে পেরোলে
কোনো এক বর্ষা মেদুর দিনে
আকাশে ঘনঘটা বজ্র নির্ঘোষ
শিখরে শিখরে বজ্র শিখার নাচন
সে এসেছিল
কেশসজ্জায় ময়ূর পালক গুঞ্জামালা গলে
শবরী বিদ্যুৎবালা হৃদয়ে মোচড় দেয়
এই দেখি এই নেই আহা
ওগো বালিকা দেখা দাও
প্রতিটি শিখরে আলোচোখ মেলে পেলে না আর
প্রজন্মের সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে এলে হাজার বছরে
মৃত্যু নেই জন্ম নেই অনুভব অনুভূতি নেই
আছে শুধু শূন্যতা ক্লান্তি অপার অসীম
জলকুণ্ড সামনে রেখে তুমি বসে গেলে
শ্যাওলা শ্যামল প্রস্তরখণ্ডে
জলআয়না
তোমার দুটি চক্ষু অলৌকিক তৃতীয় নয়নে
আয়নায় দেখলো তাকে জলকেলি মত্ত
আহা ময়ূরপুচ্ছ আহা গুঞ্জামালা
ভেসে ভেসে যায় স্মিত হাসি বালিকার মুখে
ছলছলাৎ জল ছিটকালো তোমার অঙ্গে
পাথর হয়ে গেলে সহস্রের এপারে
স্বেচ্ছামৃত্যুধারী পিতামহ আমার জাদুমন্ত্রে
ফিসফিস উচ্চারণ করলে শুধু সেই চর্যাবাণী
উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই শবরী বালী।
মোরঙ্গী পিচ্ছ পহরিন শবরী গিবত গুঞ্জরী মালী।।
পিতামহ এখন তুমি ভাঙ্গাচুরা পাথরের স্ট্যাচু




অনিকেত ঘর

একই কথা বারবার কতবার বলি
একই গান কতবার শুনি
ভৈরবীর আলাপ তান বারবার
বুকের পাঁজরে মুচড়ায়
খাঁচার পাখিটা ডানা ঝাপটিয়ে
উড়ে যায় অচিন আকাশে
একে একে প্রিয়জন চলে যায়
একাকী বেলায় কান্না এসে
ঝটপট আসন গুছিয়ে বসে
একই কান্না কতবার কাঁদি
সারাটা পৃথিবী জুড়ে অনন্ত শ্মশান
বৈরাগ্য বেঁধেছে বাসা অস্তিত্বের ঘরে
ঊর্ধ্বে নীলাকাশ ঘরের ছাউনি
মাটির বাথানে বিষাদ-রোদন শুধু
যে আসে চলে যেতে হয় সে জানে
তবু হাসি কান্না গান আর স্বপ্ন দিয়ে
রচে যায় আশ্চর্য এক অনিকেত ঘর




আমার মৃত্যুর পরে

আমার মৃত্যুর পরে এই নশ্বর দেহ গঙ্গার কোন ঘাটে পুড়িয়ে দিয়ো —
মণিকর্ণিকা নয় বরং দেহাতি দলিত কোন জনপদের পাশে,
অস্পৃশ্য মানুষের অস্পৃশ্য ঘাটের পাশে অখ্যাত চিতায়।
আমি পুড়ে পুড়ে ছাই হবো, চাই না চন্দন কাঠ
দেহাতি জনের আনা কাঠকুটো দিয়ে সাজানো চিতায়,
পুড়ে পুড়ে ছাই হতে চাই, হয়তো বাতাসে ভেসে
কিছু কিছু তার উড়ে উড়ে দূরে চলে যাবে মিশে যাবে
দুরন্ত ঘূর্ণিতে উড়ে আসা দক্ষিণ-পশ্চিমা বায়ুর সাথে,
বাষ্পকণায় মিশে চলে যাবে তুষারাবৃত হিমালয়ের উত্তুঙ্গ শিখরে,
তারপর জলকণা হয়ে ঝরবে, শীতল প্রগাঢ় বৃষ্টিকণা ঝরবে,
সারাটা দেশের মাটিতে ঝরবে, বৃষ্টি আমি মিশে যাবো,
কণা কণা আমি মিশে যাবো, ধূলিতে ধূসর হয়ে যাবো।
অনুভবে শেষবারের মত জেনে যাবো ভারতীয় আমি,
আমি এক নগন্যা ভারত-কন্যা এ দেশের মাটিকে ভালোবাসি,
এ দেশের মাটিকে ভালোবেসে মৃত্যু শেষে হয়ে গেছি মাটি।
আরো কিছু ছাইভস্ম গঙ্গার স্রোতে ভেসে দূর দূরান্তরে —
তীর ছুঁয়ে কত কত ঘাট ছুঁয়ে, জনপদ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভাটি পথে যাবে,
পদ্মার স্রোতে মিশে বাংলার উদাসী জনপদে
ভাটিয়ালী আজানের সুর শুনে ভেসে যাবে দূরে,
সাগরে মিশে যাবে একদিন বিশাল সে স্রোতের সাগরে!
সাগরে সাগর হয়ে জানা হবে বিরাট এ পৃথিবীর আমি একজন,
খণ্ডে খণ্ডে নয় বিশালত্বে আমার ছিলো শেষ পরিচয়,
পৃথিবীর কন্যা আমি পৃথিবীতেই হয়েছি বিলীন।