মৃত্যুপথযাত্রীদের সান্নিধ্যে

আপডেট: 08:20:04 02/07/2017



img
img

আহসান কবীর

রাত তখন সাড়ে এগারো-পৌনে বারো হবে। গল্প করছিলাম দু’জন। হঠাৎ আমার দুই হাত জড়িয়ে ধরলেন জোয়ার্দার। আকুল স্বরে বললেন, ‘বাবু ভাই, বাঁচার খুব ইচ্ছা। পারবো বাঁচতে?’
জোয়ার্দারের হঠাৎ এই আকুতিতে থতমত খেয়ে গেলাম। উচ্চশব্দে হেসে উঠলাম; যা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। বললাম, ‘আরে আপনার অপারেশন তো সাকসেসফুল। আপনি কেন মরবেন?’
চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম খানিকটা যেন আশ্বস্ত হলেন জোয়ার্দার। ‘একটা ওষুধ খেতে হবে, আসছি’- বলে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।
আসলে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ায় জোয়ার্দারের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তাই পালিয়ে এসে হোটেলের ব্যালকনিতে পায়চারি করতে থাকলাম। বিনা কারণেই সিগারেট ধরালাম।

আবুল হোসেন জোয়ার্দার। খুলনার পাইকগাছা বারের কয়েকবারের সভাপতি। দুঁদে উকিল। কিছুদিন হলো ক্যানসার বাসা বেঁধেছে শরীরে। আমাদের পরিচয় হয়েছে কলকাতার ঠাকুরপুকুরে আবাসিক হোটেলে।
ভীষণ সাহসী এই লোকটি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাও। পাকস্থলীতে দূরারোগ্য অসুখ। তার শরীরে অস্ত্রোপচারের কিছুদিন পর আমি কলকাতায় গেছি। গিয়ে শুনেছি, অপারেশনের সময় তার সঙ্গে নিকটজন বলে কেউ ছিলেন না। পাইকগাছা থেকে ভারতে পাড়ি জমানো একব্যক্তিকে সঙ্গে রেখেছিলেন। একবার বাদে প্রতিবারই তাকে এভাবেই দেখেছি। কখনো পাইকগাছা থেকে কোনো হিন্দু লোককে সঙ্গে নিতেন, যার ভারতেও বাড়ি আছে। আবার কখনো বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া কাউকে ফোনে ডেকে নিতেন।

আমার মা ক্যানসারে আক্রান্ত। সেই সূত্রে দক্ষিণ কলকাতার ঠাকুরপুকুরে ‘সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনসটিটিউট’-এ যাওয়া। আর জোয়ার্দারসহ অনেকের সঙ্গে আলাপ, যারা হয় ক্যানসার রোগী বা তাদের স্বজন।

‘যেখানেই থাকো ভালো থেকো’
ফারজানা। ২০-২১ বছরের টুকটুকে ফর্সা একহারা তরুণী। ইংরেজিতে অনার্স ভর্তি হয়েছিল। বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। বাবা বোধহয় বিআরডিবিতে চাকরি করেন। মেয়ের চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে সাথে নিয়ে গেছেন কলকাতায়। জরায়ুতে ক্যানসার। অস্ত্রোপচার হয়েছে। ডাক্তাররা ঝুঁকি নিয়েছেন। গোটা জরায়ু ফেলে দিলে এই তরুণীর ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকবে না। তাই কেটেছেন জরায়ুর একাংশ।
দিনের বেশির ভাগ সময় যন্ত্রণায় কাতরায় মেয়েটি। মা সেবা-যত্নের ত্রুটি রাখেন না। নমাজে বসে সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্নাকাটিরও কমতি নেই ভদ্রমহিলার। কিন্তু মেয়ের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।
ডাক্তারের পরামর্শ মতো বিকেল-সন্ধের দিকে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করে ফারজানা। ওর মন ভালো রাখার জন্য কিছু গল্প করি প্রায়ই। আমি সংবাদকর্মী, একথা ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলিনি। কিন্তু কীভাবে যেন সবাই জেনে যায়। বুঝতে পারি, সংবাদকর্মী জেনে ফারজানা এক ধরনের সমীহ করে আমাকে। জানতে চায় নানা খবর। আমি খবর এড়িয়ে তাকে নানা হাস্যরসাত্মক কাহিনি বলার চেষ্টা করি।

রাত সাড়ে এগারোটা মতো হবে। আমার মা ঘরে ঘুমাচ্ছেন। ব্যালকনিতে বসে গুলতানি মারছিলাম কয়েকজন। হঠাৎ নারীকণ্ঠে কান্নার শব্দ। দ্রুত উঠে এগিয়ে গেলাম ২০৯ নম্বর কক্ষের দিকে। দেখি ফারজানা জ্ঞান হারিয়েছে। ওর মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সন্ধ্যা থেকে অনেক যন্ত্রণা। এখন অজ্ঞান হয়ে গেছে।’
ওর বাবা নির্বাক দাঁড়িয়ে। হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছেন বেচারা। বললাম, ‘ভাই, হাসপাতালে নিয়ে চলেন।’
-এতো রাতে হাসপাতালে তো কাউকে পাওয়া যাবে না!
-যাবে। জরুরি বিভাগ আছে। আপনি রেডি হন।
-আমি... আমি...।
ইতস্তত করতে থাকলেন ভদ্রলোক। বললাম, ‘আপনাকে কিছু করা লাগবে না। শুধু সাথে কিছু টাকা নেন।’
আমার রুমে এসে দেখি শব্দ শুনে মা জেগে গেছেন। কী হয়েছে জানতে চাইলেন আমার কাছে। আমি সংক্ষেপে বললাম। আর মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম। মা এক মুহূর্ত দেরি না করে বললেন, ‘যাও’।
ওই রাতে ফারজানাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলাম কয়েকজন মিলে। ডাক্তার ডেকে আনলেন সেবিকারা। তিনি এসে নানাভাবে পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত দিলেন, হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। রাত দেড়টার দিকে যখন মেয়েটির অবস্থা খানিকটা উন্নতির দিকে, তখন হাসপাতাল ছাড়লাম।

কয়েক মাস পর ফারজানার বাবা-মায়ের সাথে দেখা রাস্তার ধারে দোকানে। এবার ওরা উঠেছেন অন্য একটি হোটেলে। প্রাথমিক কুশলাদিবিনিময়ের এক পর্যায়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘ভাই, আমাদের হোটেলে একটু যাবেন? মেয়েটি শুধু ভাজাপোড়া খেতে চায়। অন্য কিছু খেতে চায় না। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। আপনি একটু বলবেন?’
-আমি বললে কি খাবে?
-আপনার কথা শুনবে।
আমার কথা কী কারণে শুনবে বোধগম্য হলো না। কিন্তু অনুরোধ এড়াতে পারলাম না। বললাম, ‘মায়ের জন্য সুজি কিনতে এসেছি। দিয়ে আসছি। আপনারা এগুতে থাকেন।’
ওই হোটেলটি আমার চেনা। গেলাম। আমাকে দেখে ফারজানা মিষ্টি করে হাসলো। টুকটাক কিছু কথাবার্তার পর আসল প্রসঙ্গে এলাম। বললাম, ‘ফারজানা, তোমার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন? নিশ্চয় ঠিকমতো খাচ্ছো না!’
ও চুপ করে রইলো। বিশেষ গুরুতর কিছু বললাম না। শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে ওর বাবা-মা যে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন- এটিই ওর মনে গেঁথে দিলাম। বললাম, ‘ভাবি, ঘরে খাবার কী আছে? ফারজানাকে দেন।’
ওর মা দুই-তিন প্রকার ফল, হরলিকস, আরো কী কী যেন আনলেন। কী আশ্চর্য, মেয়েটি চুপ করে খেতে থাকলো।
মঙ্গল কামনা করে ওদের রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছন পেছন ফারজানার মা-ও এলেন। বললেন, ‘ভাই, অনেক চেষ্টা করেও মেয়েকে খাওয়াতে পারছিলাম না। আমি জানতাম, আপনি কথা বললে কাজ হবে।’
ডুকরে কেঁদে উঠলেন ভদ্রমহিলা। আমি হন হন করে হাঁটতে থাকলাম রাস্তা পানে।

প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আর দেখা হয়নি।
ফারজানা এখন কোন জগতের বাসিন্দা জানি না। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।

‘আশা পূর্ণ হলো না’
বলা নেই কওয়া নেই একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ হাজির আবুল হোসেন জোয়ার্দার। এবার সঙ্গে কেউই নেই। হোটেলের রিসিপশনে আমার সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘একা কেনো?’
-অনুপদার কাছে শুনলাম আপনি কলকাতায়। তাই কাউকে সঙ্গে আনিনি। এখানকার কাউকে খবরও দিইনি।
আমার ওপর অগাধ বিশ্বাস তার। সেই দফা চার রাত ছিলেন। ক্যানসারের রোগী একা থাকবেন! আমার মায়ের কাছে থাকার জন্য ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আছে। আমি নিজের রুম ছেড়ে চার রাতই জোয়ার্দারের রুমে কাটালাম। সুখ-দুঃখের অনেক কথা হয় আমাদের মধ্যে। একদিন বললেন, ‘বাবু ভাই, আমি যদি মরেই যাই, তো যাওয়ার আগে আপনার জন্য একটা বড় খবর তৈরি করে দিয়ে যাবো।’
-কী খবর?
-শুনবেন, পাইকগাছার একজন জনপ্রতিনিধি গুলিতে নিহত। আমার নিজের লাইসেন্স করা বন্দুক আছে।
জোয়ার্দারের ধারণা, ওই জনপ্রতিনিধির কারণে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। তার প্রায় ২০০ বিঘা চিংড়ির ঘের নাকি ওই জনপ্রতিনিধি দখল করে নিয়েছেন। তাই তাকে খুন করতে জোয়ার্দার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ঘের দখল করার কারণে কারো ক্যানসার হতে পারে- এমন আজব আবিষ্কার তিনি কীভাবে করলেন জানি না। আমি যুক্তি দেওয়ার চেষ্টাও করিনি। যুক্তি সব সময় খাটে না। কখনো কখনো আবেগ বড় হয়ে ওঠে।

একরাতে হোটেলের ব্যালকনিতে সিগারেট হাতে পায়চারি করছি। চেয়ারে বসার জো নেই কলকাতার আগ্রাসী মশার অত্যাচারে। হাঁটতে হাঁটতে এলেন জোয়ার্দার। বললেন, ‘বাবু ভাই, একটা সিগারেট হবে?’
-না আপনাকে সিগারেট দেওয়া যাবে না।
-দেন না ভাই একটা! সারা দিন তো খাইনি!
যুক্তি এক্ষেত্রেও খাটেনি। জোয়ার্দারের ভিখিরির মতো পাতা হাত ফেরাতে পারিনি।

জোয়ার্দার যেমন প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেননি, আমার দেওয়া আশ্বাসও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক মাস পর বন্ধু অনুপকুমার পিন্টু ফোনে জানালো, আবুল হোসেন জোয়ার্দার মারা গেছেন।
জোয়ার্দার যে বেশি দিন বাঁচবেন না, তা আমিও বুঝতাম। কিন্তু এতো দ্রুত যে মৃত্যু তাকে গ্রাস করবে, ভাবিনি। যে জনপ্রতিনিধিকে তিনি গুলি করে মারতে চেয়েছিলেন, তিনি কিন্তু বহালতবিয়তে রাজ্য শাসন করছেন।

‘জীবন! সে তো পদ্মপাতার শিশিরবিন্দু’
প্রতিবার কলকাতায় যাই, আর শুনি অমুক মারা গেছেন, তমুক মরণাপন্ন। মনটা খারাপ হয়ে যায়। আবার নতুন নতুন লোকের সাথে পরিচয় হয়। বন্ধুতা হয়।
সেবার বিকেলের দিকে হোটেলের সামনের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আড্ডায় মশগুল ছিলাম আমি, কুষ্টিয়া কুমারখালীর মঞ্জু (ঝিনাইদহের মানুষ, পুলিশে কর্মসূত্রে কুমারখালীতে অবস্থান), চুয়াডাঙ্গার মুক্তি, সাভারের বাবুসহ বেশ কয়েকজন। মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাজির হলেন পাবনার আজম। এই ভদ্রলোকের পেশা শিক্ষকতা। রাজনীতিও করেন। ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা কমিটির সদস্য। সারাক্ষণ ফোনে কথা বলতেই থাকেন দেশে।
আজম ভাই এসেই ঘোষণা দিলেন, ‘চলেন। সবাইকে চা-সিগারেট খাওয়াবো।’
উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল তাকে। ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে যা বিরল।
শুধালাম, ‘ব্যাপার কী?’
আজম ভাই জবাব দেওয়ার সুযোগ পেলেন না। মঞ্জু ভাই বললেন, ‘আপনি জানেন না? আজ ডাক্তার আজম ভাইকে সুখবর দিয়েছে। বলেছে, আজম ভাইয়ের শরীরে আর ক্যানসারের অস্তিত্ব নেই। বাড়ি চলে যেতে পারে। শুধু মাঝে মাঝে এসে চেকআপ করিয়ে যেতে হবে।’
সবাই খুশি হলেন এই খোশ খবরে। দল বেঁধে চললাম ‘বরিশাইল্যার দোকানে’। আজম ভাই বেশ হাঁকডাক করে বিস্কুট-কলা, চা-সিগারেটের অর্ডার দিলেন।

এর প্রায় মাস পাঁচেক পর গিয়েছি কলকাতায়। তার এক-দুইদিন আগে গেছেন মঞ্জু ভাই। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজম ভাইয়ের সাথে আপনার যোগাযোগ আছে? আমি কয়েকবার ফোন দিয়েছি। রিসিভ করে না।’
-আজম ভাই তো নেই!
-কী বলেন?
-হ্যাঁ। গত ফেব্রুয়ারিতে তো মারা গেছে!
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। কয়েক মাস আগে ডাক্তার জানালেন, রোগী বিপন্মুক্ত! এরই মধ্যে মারা গেলেন! হতাশায় বুকটা ভেঙে গেল যেন। চোখের সামনে ভেসে উঠলো হাসপাতালের মধ্যে টানানো একটি পোস্টার। যেখানে ওপরে লেখা : Cancer? No answer| এই অংশটি ক্রস দিয়ে কাটা। নিচে লেখা : Cancer? Yes answer| এই অংশটিতে টিক দেওয়া।
রোগীদের প্রবোধ দেওয়ার জন্যই কি এই পোস্টার তৈরি? মেলাতে পারছি না কিছুই।

‘তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে’
দীপিকা আর পালমো। দুই বোন। দীপিকা বড়, অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। পালমো সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে। ওরা দুই বোন বাবাকে নিয়ে আসে কলকাতায়। বাবার গলায় মারণব্যাধি।
মাকে নিয়ে কলকাতায় প্রথম যেদিন যাই, সেই দিন সন্ধ্যার পরই এই দুই বোনের সাথে আলাপ। বন্ধু অনুপকুমার পিন্টুর কক্ষে বসে ছিলাম। সে-ই ডাকলো দুই বোনকে। আলাপ করিয়ে দিলো- ‘বলেছিলাম না, বাবু ভাই আসবে! এই হলো বাবু ভাই।’
প্রথম আলাপেই বুঝে গেলাম দীপিকা খুব মিশুক। তুলনায় পালমো বেশ চুপচাপ। থাকে দার্জিলিংয়ের কাছাকাছি। বাবা চাকরি করেন একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে। ভদ্রলোকের পুরো নাম মনে নেই। তবে পদবি যে লামা, তা বেশ মনে আছে।
পাহাড়ি এই পরিবারটি বাংলা বোঝে মোটামুটি। কিন্তু তেমনএকটা বলতে পারে না। লামা নিজ ঘরে শুয়ে সারাদিন পত্রিকা পড়েন। হিন্দি পত্রিকা। মাঝে-মধ্যে ওনার সাথে কথা বলতে যাই রুমে। আমার অসীম কৌতূহল। লামা তো তিব্বতিদের পদবি বলে শুনেছি। আপনি কীভাবে লামা হলেন? আরো সব প্রশ্নের জবাব দেন ভদ্রলোক ভাঙা ভাঙা বাংলায়। জানান, জন্ম পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং হলেও তিনি নেপালি বংশোদ্ভূত। আর তিব্বতের পাশাপাশি নেপালিদের মধ্যেও লামা পদবি আছে। বিয়ে করেছেন সিকিমে।
মেয়ে দুটির মধ্যে দীপিকা খুব বেশি বেশি মেশে আমাদের সাথে। অনুপ থাকতে সারাদিন যাতায়াত ছিল ওর ঘরে।

বলে রাখি, অনুপের স্ত্রী ক্যানসার রোগী। ঢাকার ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাড়ি নিয়ে ভালো-মন্দ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছিলেন।
অনুপ হাল ছাড়েনি। ঢাকা থেকে বিমানযোগে সোজা কলকাতা। সেখানে টানা চার-সাড়ে চার মাস হোটেলে অবস্থান করে বউকে চিকিৎসা করিয়েছে। বলা যায়, অনুপ তার সাধ্যের অতিরিক্ত করেছে স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য।
দীর্ঘদিন একই হোটেলে থাকায় প্রায় সব বোর্ডার ওর পরিচিত। রাজনীতি করা ছেলে। মানুষের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়ায়। তাই বোর্ডারদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়ও।

অনুপ চলে আসার পর দীপিকা-পালমোর প্রধান পরিচিতজন হয়ে উঠলাম যেন আমি। দীপিকা দিনের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা আমার ঘরে কাটায়। আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করে। আমি বাইরে থেকে এসে প্রায়ই দেখি, তরুণী আমার বিছানায় দিব্যি শুয়ে আছে। কিছু খেতে বললে বাঙালি মধ্যবিত্তসুলভ আচরণ করে না। বৌদ্ধ হওয়ায় আমিষ খায় না। অন্য কিছু খেতে বললে না করে না কখনো। পাহাড়িদের এই সরলতা আমাকে মুগ্ধ করে। নিজে নিরামিষভোজী হলেও একদিন তো আমাদের রান্না করে খাওয়ালো পাহাড়ি মোরগ। অনুপ তখনো ছিল কলকাতায়। আমি আর ও গিয়ে বাজার থেকে কিনে এনেছিলাম। সে দিন ঘনিষ্ঠ কয়েক পরিবার একসঙ্গে খেয়েছিলাম দীপিকার রান্না করা মোরগ।
অনুপ একদিন আমাকে বললো, ‘বাবু ভাই, দীপিকার বিয়েতে কিন্তু আপনি আর আমি দাওয়াতি। ও আমাকে কথা দিয়েছে।’
বিয়ের কথায় বাঙালি তরুণীর মুখে যেমন লজ্জার আভা ফুটে ওঠে, খেয়াল করলাম দীপিকার ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটলো না। বললো, ‘হ্যাঁ তো। পাপা কিওর হলেই আমার ম্যারেজ হবে। আপনাদের ইনভাইট করবো।’

হাসপাতালে একদিন আমার মা আর দীপিকা-পালমোর বাবার একই সাথে কেমো চলছে। ওয়েটিং রুমে বসে থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নেই। এক জায়গায় বেশি সময় বসে থাকলে বোর লাগে। আমি দুই বোনকে বললাম, ‘চলো, কফি খেয়ে আসি।’
-এখানে কফি পাওয়া যায় না বাইয়া।
-যায়। চলো।
দুই বোন আমার সাথে নেমে এলো দোতলা থেকে। আউটডোরের পাশেই ছোট্ট একটি কফিশপ। এক নারী চালান। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনজন একসঙ্গে কফি পান করলাম। এরই ফাঁকে দীপিকা তথ্য দিলো, তার বাবাকে কোনো এক বৈদ্যর পরামর্শ মতো হারবাল ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। দামী ওষুধ। কাজ হচ্ছে দ্রুত। আমি ভ্রু কুঁচকাচ্ছি দেখে সে বললো, ‘হ্যাঁ বাইয়া। বালো কাজ হয়! আন্টির জন্যও এনে দিতে পারি।’

বাবা যে দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন- এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো দুই বোনেরই।
দীপিকার ফোন নাম্বার আমার কাছে নেই। পালমোর (নেপালি ভাষা। যার অর্থ বাংলায় ‘প্রীতি’ ধরনের) নাম্বার আছে। অনুপ আবার দীপিকার ফেসবুক ফ্রেন্ড।

দেশে রয়েছি। হঠাৎ একদিন অনুপ ফোনে জানালো দীপিকা ফেসবুকে নেপালি ভাষায় কী যেন লিখেছে। নিচে অনেক কমেন্ট। বোঝা যাচ্ছে, ওদের বাবা মারা গেছেন।
আমার বিশ্বাস হতে চায় না। এই তো সেদিন দেখে এলাম ভদ্রলোক আগের চেয়ে বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে মারা যাবেন!
অনুপকে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কি নিশ্চিত?’
-হ্যাঁ।

দীপিকার বিয়ে হয়নি। আমাদেরও আর দাওয়াত খাওয়া হয়নি।
এবার কলকাতা গিয়ে ফোন করলাম পালমোকে। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করার পর কথা বলতে চাইলাম দীপিকার সাথে।
-বাইয়া, আমি তো দূরে!
-এতো রাতে তুমি দূরে! এর আগে বাংলাদেশ থেকে একদিন ফোন করেছিলাম। সেদিনও তুমি একই কথা বলেছিলে। ব্যাপারখানা কী?
পালমো কোনো জবাব দেয় না। আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়। বললাম, ‘আচ্ছা তুমি কি বিয়ে করেছো? ঠিক ঠিক বলো তো!’
কথার জবাব না দিয়ে ও শুধু খিল খিল করে হাসে। যা বোঝার বুঝলাম। মনে পড়লো হোটেলে থাকার সময় পালমো কার সঙ্গে যেন ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতো। নেপালি ভাষায়। হয়তো ওর মনের মানুষের সাথেই।
অঘটন-দুর্ঘটনা সাময়িক ছন্দপতন ঘটালেও জীবন কিন্তু থেমে থাকে না।

‘অভিমান করে বলো আর কী হবে’
ইলিয়াস ঢালী। বাড়ি শরীয়তপুরের কোনো এক গ্রামে। মালয়েশিয়ায় কাজ করতো ২৬-২৭ বছর বয়সী ছেলেটি। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারে, গলায় রাজরোগ। কোম্পানির খরচে সেদেশেই চিকিৎসার সুযোগ ছিল। কিন্তু ক্যানসার বলে কথা! চাকরি ছেড়ে তড়িঘড়ি দেশের ফ্লাইট ধরে ইলিয়াস। কয়েকদিনের মধ্যে কলকাতা। সাথে তার মামা। চাকরি করেন ঢাকার একটি গার্মেন্টে। দীর্ঘমেয়াদের চিকিৎসায় ভাগনেকে সঙ্গ দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না।
দ্বিতীয় দফায় ইলিয়াস যখন কলকাতা যায়, তখন সাথে তার মা। দেহাতি সরল মহিলা। জীবনে প্রথম দেশের বাইরে গেলেন। সারাক্ষণ গল্প করতে পছন্দ করেন। তার গল্পের বিষয়বস্তু বাড়িতে কয়টি দুধেল গাই আছে, এবার ক্ষেতে আনাজ কেমন হলো, ছেলে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর পর বাড়িতে কতগুলো নতুন ঘর উঠলো, ঢাকায় থাকা একমাত্র মেয়ের বাচ্চাটি কেমন চঞ্চল...। আমার মা তার একনিষ্ঠ শ্রোতা।

বেলা আড়াইটার দিকে মাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হোটেলে ফিরছি। রিসিপশনের সোফায় বসে থাকতে দেখলাম ইলিয়াস আর তার মাকে। কিন্তু এ কী! ইলিয়াস সোফায় বসেই ঘুমাচ্ছে। লাগেজ পড়ে আছে পাশে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচি, ইলিয়াসের শরীর কি খুব খারাপ?’
ভদ্রমহিলা আমাকে পাশে ডেকে নিলেন। আস্তে আস্তে যা বললেন, তার সারমর্ম হলো, ঢাকায় মেয়ের বাসায় ছিলেন তারা। সেখান থেকে বেনাপোলের গাড়িতে উঠেছেন। মাওয়া ঘাটে ইলিয়াস বাস থেকে নেমে বাইরে গিয়েছিল। পরে বাসের সিটে এসে ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি ভেবেছিলেন, ছেলে অসুস্থ তাই ঘুমাচ্ছে। কিন্তু বেনাপোল এসে বাস যখন থামলো, তখনো ওর ঘুম ভাঙেনি। তিনি তখন পাশেই ইলিয়াসের মানিব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখেন। মানিব্যাগে কোনো টাকা নেই। যা বোঝার বুঝে ফেলেন তিনি। ছেলে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছে।
ওই অবস্থায় কীভাবে বেনাপোল-পেট্রাপোল বর্ডার পার হয়ে কলকাতায় এসেছেন, সে বর্ণনাও দিলেন। আমি ওদের জন্য হোটেলের একটি রুম বুক করে মালপত্র নিজহাতে নিয়ে দোতলায় পৌঁছে দিলাম। আরো কয়েকজনের সহযোগিতা নিয়ে ইলিয়াসকেও দোতলার ঘরে উঠিয়ে শুইয়ে দিলাম। চাচিকে বললাম, ‘ও কিছুক্ষণ রেস্ট করুক।’
দুপুরের খাবার খেয়ে চলে এলাম ইলিয়াসের অবস্থা দেখতে। দেখি তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। গায়ে হাত দিয়ে কয়েক দফা ডাকলাম। কিন্তু কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
চাচিকে বললাম, ‘ওকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। এখনই। না হলে অঘটন ঘটে যেতে পারে।’
-এইডা তো ক্যানসার হাসপাতাল! এইহানে নিয়া কী অইবো?
-অন্য কোনো হাসপাতালে নিতে হবে।
-আমি তো কুনো হাসপাতাল চিনি না।
-আমি চিনি। চলেন।
দোতলা-তিনতলা থেকে মঞ্জু, মুক্তি, দীপিকাসহ ছয়-সাতজনকে ডেকে আনলাম। চ্যাংদোলা করে ইলিয়াসকে নিচে নামিয়ে একটি অটোতে ওঠালাম। সোজা ‘কস্তুরি হাসপাতাল’। কাছাকাছির মধ্যে ওই হাসপাতালটিই ভালো। থ্রিএ বাসস্ট্যান্ডের কাছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডাক্তার দেখে সিসিইউ-তে রেফার করলেন। সেখানে সিনিয়র ডাক্তার দেখে প্রাথমিক ব্যবস্থাপত্র লিখলেন। বললেন, ‘ওষুধগুলো কিনে আনুন।’
চাচি আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছেন। বললেন, ‘কাকা আমার কাছে ইনডিয়ান ট্যাহা নাই। কিছু বাংলা ট্যাহা আছে। ওষুদের দোকানে কি বাংলা ট্যাহা নিবো?’
-আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আমার কাছে আছে।
আশ্বস্ত হলেন ভদ্রমহিলা।
ওষুধ কিনে এনে ডাক্তারকে বুঝিয়ে দিলাম। এবার ডাক্তার যা বললেন, তা শুনে ভয়ানক ঘাবড়ে গেলাম।
-শুনুন। এটা হলো পুলিস কেস। নিকটস্থ পুলিস স্টেশনে লিখিতভাবে ইনফর্ম করতে হবে।
আমি বললাম, পুলিস স্টেশনে ইনফর্ম না করলে হয় না?
-না। রোগীর যদি কিছু একটা হয়ে যায়, আমরা ঝামেলায় পড়বো।
আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। এসেছি মায়ের চিকিৎসা করাতে। এর মধ্যে থানা-পুলিস! এ তো বিরাট হ্যাপা!
ডাক্তারকে বুঝিয়ে বললাম বিষয়টি।
-রোগী আপনার কে হয়?
-কেউ না।
শুনে ডাক্তার তো হতভম্ব!
-কেউ না তো আপনি কেন ওকে হাসপাতালে এনেছেন?
-ও ক্যানসারের রোগী। আমার মা-ও। একই হোটেলে থাকার সুবাদে পরিচয়। ওর মাকে তো দেখছেন। ঠিকমতো নাম সইও করতে পারে না। চোখের সামনে ছেলেটা মরে যাবে! তাই দায়িত্ব নিয়ে হাসপাতালে এনেছি।
ডাক্তার বুঝলেন। কিন্তু চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন।
খানিকটা ভেবে বললাম, ‘আপনি বরং এক কাজ করুন। পুলিশ স্টেশনে পাঠানোর জন্য লিখে রেডি করে রাখুন। যদি রোগীর অবস্থার অবনতি হয় তখন কাগজটি পাঠিয়ে দিয়েন। আর যদি উন্নতি হয়, তাহলে এই ঝামেলার মধ্যে আমাদের নিয়েন না।’
কাজ হলো। ডাক্তার রাজি হলেন।

দুই রাত সিসিইউ-তে থাকার পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলো ইলিয়াস। তাকে নিয়ে এলাম হোটেলে। শুরু হলো তার দ্বিতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা, ক্যানসার হাসপাতালে। গলায় রেডিওথেরাপি। ঠিকমতো কথা বলতে পারে না ছেলেটি। খুব কষ্টে ফ্যাসফেসে গলায় দু’একটি কথা কয়। গলায় ভীষণ যন্ত্রণা। প্রায় সারারাত তার কাশির শব্দ শুনি। মাঝে মাঝে রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে কমন কিচেনে ঢোকে। কাশতে কাশতে গলা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে যায়। থান থান রক্ত।

মাকে নিয়ে দেশে ফিরে এসেছি। হঠাৎ একদিন অচেনা নাম্বার থেকে ফোন।
-আমি চাচি কইতাছি। ইলিয়াসের মা।
-হ্যাঁ, চাচি। বলেন খবর কী।
-কাকা, আমার ভালো ঠ্যাকতাছে না। ইলিয়াসরে মাদরাজে চিকিস্বা করাবো। আপনে ছাড়া কেউ নাই।
-বুঝলাম। তা কী করতে হবে?
-আপনে আমার পোলাডারে মাদরাজে লন। ট্যাহা যে কয় লাক লাগে দিমু। আপনে ইচ্ছামতো খরচ কইরেন।
-চাচি, আমার পক্ষে তো যাওয়া সম্ভব না। আমার মেডিকেল ভিসা। ছয় মাসে তিনবার ঢুকতে পারি ভারতে। যদি আমি একবার বাড়তি যাই তাহলে ঝামেলা হয়ে যাবে। আমার ভিসা শেষ হয়ে যাবে। মায়ের ভিসা থাকবে। মা তো একা গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারবে না।
তবু বুঝতে চান না ভদ্রমহিলা। বার বার ফোন করেন আর একই অনুরোধ করতে থাকেন।
দু’দিন পর আরেকটি নাম্বার থেকে ফোন এলো। ওই প্রান্ত থেকে নারীকণ্ঠে বললো, ‘ভাইয়া আমি ইলিয়াসের ছোট বোইন। তার মাইনে আপনেরও ছোট বোইন।’
সেই একই অনুরোধ এবার ইলিয়াসের বোনের পক্ষ থেকে। কিন্তু আমি তো অপারগ।
হতাশ হয়ে ফোন কেটে দিলো মেয়েটি। সেই যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, আর কখনো কথাবার্তা হয়নি পরিবারটির সঙ্গে। কলকাতায়ও আর দেখা হয়নি। হয়তো অভিমানবশত আমার সাথে যোগাযোগ রাখেনি।
ইলিয়াসের পরিণতি আর দশজন ক্যানসার রোগীর মতো হয়েছে কি-না তাও জানি না।

‘চিতাতেই সব শেষ’
আগেই বলেছি অনুপের কথা। আমার রাজনৈতিক বন্ধু। প্রথম যৌবনে এক সাথে স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়েছি। ওর সাথে সম্পর্ক গভীর। তার অন্য কারণও আছে। ওর স্ত্রী কাকলিরানি রায় আমার বউয়ের বাল্যবন্ধু। একসাথে একই স্কুলে লেখাপড়া করেছে ওরা।
মাঝে কালিপুজো উপলক্ষে অনুপ একবার দেশে আসায় ভিসাজনিত কারণে পরের দফায় স্ত্রীর সাথে ভারতে যেতে পারলো না। কাকলির কাকা থাকেন উত্তর চব্বিশ পরগনার হাবড়ার কাছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলো। সিদ্ধান্ত হলো, কাকলিকে বেনাপোল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে অনুপ; আর ওপার থেকে তাকে রিসিভ করে কলকাতা নিয়ে যাবেন কাকা।
কাকাশ্বশুরকে অনুপ ভালো করে চেনে। ও জানতো, কাকা কতটুকু এগোবেন। সে কারণে সে আমাকে খানিকটা দায়িত্ব দিয়ে রাখলো।
অনুপের কথাই ঠিক হলো। ঠিক দুইদিন পর কাকা আমাকে ডেকে বললেন, ‘ইয়ে... মানে আমার বাড়ি একটা বিশেষ দরকার। মানে... ওই শ্রাদ্ধ আর কী! আমাকে তো একবার হাবড়ায় যেতে হয়। শ্রাদ্ধ শেষে আবার চলে আসবো। এই কয়দিন আপনি কি একটু কাকলির দায়িত্ব নিতে পারেন?’
-কেন পারবো না? আপনি বোধ হয় জানেন না, অনুপ আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর কাকলি আমার স্ত্রীর। ওরা একসাথে একই স্কুলে পড়েছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।’
-তাই নাকি? তাহলে নিশ্চিন্ত হলাম।
এতোটা রেসপন্স পাবেন, কাকা হয়তো ধারণাই করতে পারেননি। যারপরনাই খুশি তিনি। বললেন, ‘তাহলে কাল সকালে আমি যাচ্ছি।’
-ঠিক আছে।

কাকা ছিলেন না তিনদিন। এই দিনগুলোতে কাকলিকে শত অনুরোধ করেও রান্না বন্ধ করাতে পারিনি। সে কোনোভাবেই অন্যের বার্ডেন হতে চায় না। পেটে অপারেশনের কারণে একবারে বেশি খাবার গ্রহণ করতে পারতো না। ঘন ঘন অল্প অল্প খেতো। ওর পছন্দের খাবার আমার জানা। সেগুলো নিয়মিত কিনে এনে দিতাম। কপট রাগ দেখাতো। আবার কখনো নিজেই উপযাচক হয়ে বলতো, ‘ভাই, ... খেতে ইচ্ছে করছে।’ সঙ্গে সঙ্গে আমি তার চাওয়া পূরণ করতাম।
সকালে বাজারে যাওয়ার আগে কাকলি আমার হাতে টাকা গুঁজে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতো। আবার কিছু কিনে আনলে দাম জানতে চাইতো টাকা দেওয়ার জন্য। টাকা দিতে না পেরে একদিন সে বলেই বসলো, ‘ভাই, আমার তো ডাক পড়ে গেছে! কারো কাছে ঋণী থাকতি চাইনে। পরকালে গিয়ে কী জবাব দেবো?’
এ সময় ওর চোখ ছলছল করতে দেখেছি। হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। শেষে মরিয়া হয়ে বলেছি, ‘আসলে পরকাল-টরকাল বলে কিছু নেই। খামাখা এসব কথা মাথায় আনার দরকার কী?’ পরক্ষণেই হেসে দিয়েছে ভীষণ ভালো মনের মেয়েটি।

তিনদিন পর কাকা ফিরে এসে কাকলিকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে, ফাইনাল চেক করাতে। হাসপাতাল থেকে যখন ফিরলেন, বিকেল গড়িয়ে গেছে। কাকা আমাকে নিভৃতে ডাকলেন। বললেন, ‘খবর খারাপ। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে।’
হরিনাম জপ করতে থাকলেন কাকা।
আমি খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। অনেক স্মৃতি ঘুরপাক খেতে থাকলো মাথায়। মনে পড়লো কাকলি একদিন বলছিল, ‘ভগবান তো আমারে নিয়েই যাবে। কিন্তু কয়ডা বছর যদি সময় পাতাম! ছেলেটা একটু বুঝার মতো হলি মরতাম, আমার কোনো দুঃখ থাকতো না। এখন মরলি অবুঝ ছেলেটার কী হবে?’

সন্ধ্যার পর কাকলি ভেজাচোখে কাপড়-চোপড় গোছাতে শুরু করলো। আমরা কেউ তাকে কিছুই বলিনি। কিন্তু বুঝতে পেরেছে সবই। পরদিন ভোরে দেশের উদ্দেশে রওনা হবে। হোটেলের বিলও পরিশোধ করা হয়ে গেছে এরই মধ্যে।
কী মনে করে ফোন দিলাম অনুপকে। বললাম, ‘অনুপ, সবই তো শুনেছো। শেষ চেষ্টা হিসেবে একবার পি কে ব্যানার্জিকে দেখালে হতো না?’
অনুপ সম্মতি দিয়ে বললো, ‘আপনি একবার কাকাকে বলেন।’
-আমার কথা শুনবে কেন? তুমি বলো।
অনুপ কাকার সাথে কথা বললো ফোনে। ভদ্রলোক অনিচ্ছা সত্ত্বেও একদিন বাড়তি থেকে গেলেন কলকাতায়। কাকলিকে নিয়ে গেলেন বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ পি কে ব্যানার্জির কাছে। ফিরলেন রাত প্রায় একটার দিকে। ততক্ষণে হোটেলের গেট বন্ধ। ফোন পেয়ে আমি নিচে নেমে গেট খোলানোর ব্যবস্থা করলাম। কাকা জানালেন, পি কে ব্যানার্জিও একই কথা বলেছেন। অগত্যা পরদিন ভোরে কাকলি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিলো।

যশোরে এসে শ্বশুরবাড়িতে কয়েকদিন ছিল কাকলি। এর মধ্যে একদিন সস্ত্রীক দেখতেও গিয়েছিলাম। কষ্ট পাচ্ছিলো। কিন্তু শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ বলে মনে হয়নি।
পরে সে কুষ্টিয়ায় বোনের বাড়িতে চলে যায়। ফিরে আসার পর পরই ওকে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালে। অনুপ আমাকে এই খবর জানিয়েছিল। আমি সেদিন আর হাসপাতালে যেতে পারিনি। কাজের কিছু চাপ ছিল। পরদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে অনুপের ফোন- ‘কাকলি মারা গেছে।’
-বলো কী? কখন?
-এইমাত্র। কুইন্স হসপিটালে।
-আমি এখনই বের হচ্ছি।
পোশাক পরিবর্তনে মিনিট তিনেক সময় লাগলো। কিন্তু বাসা থেকে বেরুতে পারলাম না। রুদ্র কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ঝড়ের দাপট কিছুটা কমলে শুরু হলো বৃষ্টি। ঘরের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলছিলাম, ‘কাকলি, বোন আমার, তুমি আমার কাছে ঋণী নও। পরপারে তোমাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। বরং তোমার কাছেই আমি ঋণী। হাসপাতালে ভর্তি শুনেও তোমাকে দেখতে যেতে পারিনি। এই অপরাধ ক্ষমা করে দিও।’
বিমর্ষ অবস্থায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার স্ত্রী এগিয়ে এলো। জানতে চাইলো কী হয়েছে।
-তোমার বান্ধবি কাকলি মারা গেছে।
আর্তনাদ করে উঠলো আমার স্ত্রী।
আমার মা এই মর্মান্তিক সংবাদ জানেন না। কিন্তু হঠাৎ করে পর দিনই তিনি আমার কাছে কাকলির শারীরিক অবস্থা সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। ব্যাপারটা কাকতালীয় হয়তো। অতিন্দ্রীয় কোনো ব্যাপার হলেও হতে পারে। আমি নিশ্চিত না।
মায়ের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অন্য কথা পাড়লাম আমি।
মাস দেড়েক পর কলকাতা গিয়ে মা কাকলির মৃত্যুসংবাদ জানলেন অন্য এক বোর্ডারের কাছ থেকে। শুনেই সে কী কান্না! বিলাপ করতে থাকলেন, ‘আমার মন কেমন যেন করছিলো। বাবু সব জানতো... আমি একবার মেয়েটার মুখ দেখতে পারলাম না...।’

আমার মায়ের খুব আপনজন ছিল না কাকলি। কলকাতাতেই তাদের আলাপ। কিন্তু অল্প ক’দিনে মানুষের মন জয় করার ক্ষমতা ছিল মেয়েটির।
তার একান্ত আপন বলে ছিল স্বামী অনুপ আর বছর আষ্টেকের একমাত্র ছেলে অভিনব। মা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে। অবুঝ ছেলেটি তা মানবে কেন! সে কারণে অভিমানে কথাও বলতো না। মাঝে একবার যখন আমরা একসঙ্গে যশোর এলাম, প্রথমে অনুপ-কাকলিকে নামালাম ওদের বাড়ির সামনে। ছেলেটি অপেক্ষা করছিল রাস্তায়। কাকলি গাড়ি থেকে নামতেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ঝাঁপিয়ে পড়লো মায়ের বুকে।

অনুপের কাছে পরে শুনেছি, মায়ের মরদেহ বাড়িতে আনার পরও তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি অভিনবর মধ্যে। কিন্তু চিতায় মুখাগ্নির সময় তার চোখ দিয়ে দর দর করে ঝরেছিল অশ্রু। বাচ্চা ছেলেটি শেষ সময়ে হয়তো বুঝেছিল- চিতাতেই সব শেষ।

[আহসান কবীর : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি।]