মৃত্যুশিবিরে প্রণয়

আপডেট: 02:14:47 15/01/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের এক মৃত্যুশিবির পোল্যান্ডের অশরুইৎজ । সেখানে সে সময় হাজার হাজার মানুষকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়। সারা ইউরোপ থেকে মানুষকে ধরে এনে এই ক্যাম্পেই রাখা হতো।
যাদের এই ক্যাম্পে রাখা হতো, তারা মৃত্যুর জন্য শুধু দিন গুনতেন। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন অশরুইৎজ দখল করে নেওয়ার পর এই বিভীষিকার অবসান ঘটে। সে সময় ওই শিবিরে যারা ছিলেন, তাদের একটাই চিন্তা—কীভাবে বেঁচে থাকা যায়। এখানে প্রেম কেবল নিজের প্রতি। তবে এমন নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শিবিরের ভেতরে যে হৃদয়ের কোণে কারো প্রতি প্রেম তৈরি হতে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছেন লালে সোকোলভ নামের এক বন্দি।
স্লোভাকিয়ার লালে সোকোলভের জন্ম ১৯১৬ সালে। ২০০৬ সালে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি অশরুইৎজ শিবিরের প্রেমের সেই গল্পটি হেথার মরিস নামের একজনকে জানিয়েছেন। হেথার মরিস তিন বছর ধরে তার সেই গল্প রেকর্ড করেন। সম্প্রতি লালের প্রেমকাহিনি নিয়ে ‘দ্য ট্যাটুইস্ট অব অশরুইৎজ’ নামে একটি বই লিখেছেন হেথার মরিস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অশরুইৎজ ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া মানুষের পরিচয় আর নামে থাকত না। নামের বদলে তাদের হাতে একটি নম্বর এঁকে দেওয়া হতো। ওই নম্বরই হতো তাদের পরিচয়। আর বন্দিদের হাতে ট্যাটু করে নম্বর এঁকে দিতেন আরেক বন্দি লালে। লালের নম্বর ছিল ৩২৪০৭।
১৯৪২ সালের এপ্রিলে মাত্র ২৬ বছর বয়সে নাৎসিরা লালেকে ধরে ওই শিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে তার নম্বর ছিল ৩২৪০৭। সে সময় তাকে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে হতো। একসময় তার টাইফয়েড হলে আরেক বন্দি ফরাসি ট্যাটুশিল্পী পাপেন লালের দেখভাল করতেন। তিনিই তাকে ট্যাটু আঁকা শিখিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন কী করে ক্যাম্পের ভেতর মাথা নিচু করে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হয়। পাপেন একদিন নিখোঁজ হয়ে যান। কী হয়েছিল—তার এ খবর লালে কোনো দিন পাননি। লালে স্লোভাকিয়া, জার্মানি, রাশিয়া, ফরাসি ও হাঙ্গেরির ভাষা জানতেন। এ কারণেই পাপেনের পর তিনিই হয়ে ওঠেন মৃত্যুশিবিরের প্রধান ট্যাটুশিল্পী। এতে অন্য বন্দিদের চেয়ে একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা পেতেন তিনি। একটি কক্ষে একা থাকতেন, অতিরিক্ত রেশন পেতেন। পরের দুই বছর তিনি শত শত বন্দির হাতে ট্যাটু করে নম্বর এঁকে দিয়েছিলেন। যাদের হাতে ট্যাটু করা হতো, তাদের দিয়ে নানা কাজ করানো হতো। আর ক্যাম্পে আসার পরও যাদের হাতে ট্যাটু আঁকানো হতো না, তাদের সরাসরি গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হতো।
হেথার মরিস বলেন, লালে নাৎসিদের কাজ করলেও কখনোই নিজেকে তাদের সহযোগী মনে করতেন না। শুধু জীবন বাঁচানোর খাতিরেই তিনি এসব করতেন।
১৯৪২ সালে জুলাই মাসে লালেকে একটি নম্বর দেওয়া হয়। এক নারীর হাতে এঁকে দিতে হবে। ওই নম্বরটি ছিল ৩৪৯০২। এত দিন শুধু পুরুষদের হাতে ট্যাটু এঁকে দিতেন তিনি। এবার তরুণীর হাতে ট্যাটু আঁকতে হবে ভেবে বিব্রত হন তিনি। কিন্তু পাপেনের শেখানো সেই কথা—‘এখানে বাঁচতে হলে যা বলবে, সব মুখ বুজে করে যেতে হবে।’ এরপর যখন ট্যাটু আঁকার জন্য ওই তরুণীর বাঁ হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন, তখনই তার হৃদয়ে কিছু একটা ঘটে গিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই তরুণীর নাম গিটা। তিনি নারীদের ক্যাম্প বির্কেনাউতে থাকেন। পরে লালে তার ব্যক্তিগত এসএস গার্ডের মাধ্যমে গোপনে গিটাকে চিঠি লিখতে শুরু করেন। নিজের রেশন থেকে গিটার জন্য খাবার পাঠাতেন তিনি। এ ছাড়া একটি ভালো কাজ জুটিয়ে দেওয়ারও আশা দিয়েছিলেন। তবে গিটা ছাড়াও আরো অনেক বন্দিকে সাহায্য করতেন লালে।
১৯৪৫ সালে রাশিয়ার বাহিনী যখন অশরুইৎজ অভিযান চালাতে শুরু করে, তখন সেখান থেকে বাছাই করে কয়েকজনকে মুক্তি দেওয়া হয়। বাছাই হয়ে গিটা ও লালে ওই ক্যাম্প থেকে চলে যান। পরে তাদের কেউই আর কারো খবর জানতেন না। জানতেন না কেউ কারো পুরো নামও। চেকস্লোভাকিয়ার ক্রোমপাচি শহরে বাড়ি ফিরে লালে শোনেন, এক মাস আগেই নাৎসিরা তার মা-বাবাকে হত্যা করেছে। এরপর থেকে তার কেবল গিটার কথা মনে হতে থাকে। শিবির থেকে মুক্তি পেয়ে বন্দিরা ব্রাটিস্লাভার রেলস্টেশন দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এ কারণে তিনি ওই রেলস্টেশনে দিনের পর দিন গিটার জন্য অপেক্ষা করতেন। এই ঘটনা শুনে স্টেশনমাস্টার তাকে স্থানীয় রেডক্রস ক্যাম্পে যাওয়ার পরামর্শ দেন। একদিন রেডক্রস ক্যাম্পে যাওয়ার সময় এক তরুণী সামনে গিয়ে তার পথরোধ করেন। তার উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকাতেই আবার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে লালের। এ যে সেই গিটা, যাকে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।
দেখা হওয়ার পর পুরনো সেই সম্পর্ক আরো গভীর হলো দুজনের। বুকের ভেতর জমে থাকা প্রেমের প্রকাশ ঘটল। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে বিয়ে করেন তারা। বিয়ের পর নামের শেষাংশ সোকোলভ পরিবর্তন করে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত চেকস্লোভাকিয়ায় বাস করতে থাকেন লালে-গিটা দম্পতি। লালে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। ইসরায়েলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনে অর্থ সংগ্রহ পাঠিয়েছিলেন তিনি। বিষয়টি সরকার জানার পর তাকে আটক করা হয়। মুক্তির পর চেকস্লোভাকিয়া ছাড়েন তারা। ভিয়েনা ও প্যারিস হয়ে কৌশলে অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকে পড়েন। সেখানে আবারো কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন লালে। আর গিটা করতেন কাপড়ের নকশার কাজ। ১৯৬১ সালে গ্যারি নামের এক ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন তারা। ২০০৩ সালে মৃত্যুর আগে গিটা কয়েকবার ইউরোপে গিয়েছিলেন। কিন্তু লালে আর কখনোই অস্ট্রেলিয়া ছাড়েননি।
লালে ও গিটার এই প্রেমের গল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া আর কেউ জানতেন না। এমনকি তাদের ছেলে গ্যারিও অনেক বছর এই ঘটনা জানতেন না। জানতেন না তার বাবা-মা কীভাবে মৃত্যুশিবির থেকে ফিরে এসেছিলেন। গিটার মৃত্যুর পর লালে তাদের এই গল্প কাউকে বলতে চেয়েছিলেন। তার ছেলে গ্যারি বন্ধুদের সহযোগিতায় হেথার মরিসকে পেয়ে যান। তিন বছর ধরে লালের কাছে এই গল্প শোনেন হেথার। বিভিন্ন জাদুঘরে গিয়ে তার বলা কথার সপক্ষে নথিপত্রও জোগাড় করেন তিনি। সম্প্রতি লেখা ‘দ্য ট্যাটুইস্ট অব অশরুইৎজ’ বইয়ে লালে ও গিটার এই প্রেমকাহিনির বিবরণ দিয়েছেন হেথার।
সূত্র : বিবিসি, প্রথম আলো