মেঘ দেখলেই স্কুল ছুটি

আপডেট: 06:13:30 18/05/2018



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : ছয় বছর আগে লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ভবন ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে স্কুলের বারান্দা, গাছতলা ও খোলা আকাশের নিচে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে।
শিক্ষাদানে ওগ্রহণের অনুপযোগী পরিবেশ হওয়ায় আকাশে মেঘ দেখলেই স্কুল ছুটি দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে বিদ্যালয়ের একটি মাত্র কক্ষে কোন রকম নেয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করায় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছে না। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া হুমকির মুখে পড়ছে। ঊর্ধ্বতন মহলে বার বার বিষয়টি জানানো হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এর ছোট বড় তিনটি ভবনের মধ্যে দুটি সাত বছর আগে ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। বাকি একটি দুটি কক্ষবিশিষ্ট ভবনের একটি অফিস রুম এবং একটি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। স্কুলটিতে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় পাঁচ শত। আর ছয় বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয়ের বারান্দায়, গাছের নিচে ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তৈরি করা একটি টিন শেডের ছাবড়ায় (একচালা বিশিষ্ট টিনের ঘর) চলছে পাঠদান। এলাকাবাসীর উদ্যোগে তৈরি করা টিনের ছাবড়াটিতে চারিদিকে কোন বেড়া না থাকায় বৃষ্টি হলে এখানেও ক্লাস করতে পারে না শিক্ষার্থীরা।
মরিচপাশা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লা জানান, বার বার ওপর মহলে জানানোর পরও ভবন নির্মাণ না করায় ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করে এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা তুলে গত বছর একটি টিনের ছাবড়া তৈরি করা হয়েছে। টাকার অভাবে এখনো সেই ছাবড়ার চারিদিকে বেড়া দেওয়া হয়নি। ছেলে-মেয়েরা এখানে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করে। এই ঘরের মধ্যে দুই পাশে দুইটা শ্রেণির ক্লাস নেওয়া হয়। এতে ছেলেমেয়েরা ক্লাসে মনোযোগী হতে পারে না।
অভিভাবক লিটু সরদার জানান, সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তারা অনেক আতংকে থাকেন। আকাশে মেঘ হলেই ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। এতে তার সন্তানের মতো অন্য ছেলেমেয়েরও লেখাপড়ার অনেক ক্ষতি হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরণ্য, হাফসা, সেতু জানায়, তারা রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ক্লাস করতে পারে না। আশেপাশের শব্দের কারণে পড়াশোনায় মন বসে না। বিদ্যালয়ে ভবন না থাকায় খোলা জায়গায় পড়ালেখা করতে হয়। যে কোনো সময় গাছের ডালপালা ভেঙে এবং ঝড়-বৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। হঠাৎ বৃষ্টি হলে তাদের বই খাতা ভিজে যায়। ক্লাস করতে এসে বৃষ্টিতে ভিজে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছে বলেও জানায় তারা।
অভিভাবক মো. মিলু বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় হয়। খোলা আকাশে, গাছের নিচে ক্লাস হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে তারা আহত হতে পারে। এভাবে ক্লাস করা ছেলে মেয়েদের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।’
দ্রæত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের দাবি করেন এই অভিভাবক।
গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘নাতি-পোতারা বৃষ্টির জন্য স্কুলে যায় না। বাড়িতে প্রাইভেট মাস্টার দিয়েছি।’
এলাকাবাসী জানান, শুকনো মৌসুমে গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের নিচে ক্লাস নেওয়া হয়। সেখানে স্যাঁতস্যাঁতে। বৃষ্টি হলেই কাদা হয়। আশপাশের বাগান থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই এখানে।
শিক্ষকরা জানান, তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং ফলাফল অনেক ভালো। যে কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি। ভবন না থাকায় বাধ্য হয়ে ছেলে-মেয়েদের এভাবে ক্লাস নিচ্ছেন তারা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবিনা আক্তার সাথী বলেন, ‘আমাদের স্কুলের দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নতুন কোনো ভবন তৈরি না করে গত বছর দুটি ভবনই নিলাম করা হয়েছে। বর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য একটি মাত্র রুম আছে। গত বছর এই বিদ্যালয় থেকে ১৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে; যার মধ্যে ট্যালেন্টপুলে ১৪ জন। ভবন না থাকায় শিক্ষার্থীদের যাতে লেখাপড়ার ক্ষতি না হয় সেজন্য বারান্দা, খোলাস্থানে এবং টিনের ছাবড়ায় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।’
দ্রুত বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্থক্ষেপ কামনা করেন প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মান্নান সরদার বলেন, ‘বারবার উপর মহলে জানানো হলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। আমরা গ্রামবাসী চেষ্টা করে একটি টিন শেডের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দ্রুত ভবন নির্মান না হলে কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।’
লোহাগড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. লুৎফর রহমান বলেন, উপজেলার মধ্যে এই বিদ্যলয়ের শিক্ষার মান অনেক ভালো। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক বেশি। দ্রুত বিদ্যলয়ের ভবন নির্মাণের দরকার।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহ আলম জানান, জেলায় এ ধরনের বেশ কয়েকটি স্কুল রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঠদান অব্যাহত রাখতে আপাতত টিনশেড নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ করার জন্য ওপর মহলে তালিকা পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন