মোসাব্বির আহে আলীর গল্প

আপডেট: 02:24:26 13/06/2017



img

বিষণ্ন বোতাম

কোথা থেকে শুরু করা যায়? তার কথা কীভাবে শুরু করা যায়? কোন উপক্রমণিকার কি প্রয়োজন আছে? নাকি কোন ভণিতারই দরকার নেই। খুব অনাড়ম্বরে শুরু হোক না তার কথা, সমস্যা কী?
মেয়েটা নিখাদ মায়াবী। বাক্যটায় কোন অতীত বা ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত করতে পারছি না। কারণ ওর বর্তমান খবরাখবর আমি জানি না। কালেভদ্রে ফেইসবুকে সার্চ করে ওর টাইমলাইন একটু দেখি। এতে ওর বর্তমান খবর ঠিকঠাক মত পাওয়া যায় না। পেলেও সচক্ষে দেখা বা অনুভবের স্বাদটা মেটে না। কারণ ওর ফ্রেন্ডলিস্টে আমি নেই। অনুরোধ পাঠিয়ে তীর্থের কাকের মত বসে আছি বেশ ক’টা বছর। কোন সদিচ্ছা বা বিবেচনার চিহ্ন নেই। কার্যত ও আড়ালেই যাপন করছে ওর নিজস্ব জীবন। নির্ঝঞ্ঝাট নির্জলা উন্নত জীবন যাপন। এই সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ওর কথা একাকী ঘরে ভাবলেও বিপদ। চতুর্দিকে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ বসানো। মনে হয় অসংখ্য সিসি ক্যামেরা মাছির চোখের মত ঘরময় ঘুরছে। যেন চরম নিষিদ্ধ এক ভাবনা এটি। ওর কথা ভাবা মানেই ঠিক একটা খুনের অপরাধ। ফাঁসিও যেন বড়োজোর তার উনশাস্তি। এমনি ঘোরবিরোধী সময়ে সাদামাটা দিন যায় আমার। কী যেন একটা দমকা হাওয়ার ধাওয়া ঘাড়ে লাগে প্রায়ই। পেছনে তাকাই। ভাবি তার চুল থেকে বুঝি উৎসারিত এই ঢেউ। আঁতিপাঁতি করে খুঁজি। পাই না।
ওর জাবর কাটা স্মৃতি উগলে উগলে আবার খাই। মুছে ফেলা মেমোরি আবার রিলোড করি মাথায়। ভাল্লাগে। একটা চোখ হেসে হেসে চলে যায়। চোখটা আমার চোখের দেড়গুণ তো হবেই। তখন আমার প্রিয় নায়িকা শিল্পা শেঠি হবার কারণ ছিল ওর চোখ আর হাসি। এ কারণে ও একইসাথে খুশি ও রাগ হত আমার উপর।
যা-ই হোক, ওর সম্পর্কে বেশি বাড়িয়ে বলছি না। বাড়িয়ে বলাটাই ওর জন্য বরং কম হবে। ও হ্যাঁ, খুব ভাল চোখে কাজল দিতে পারত সে। একদম তলোয়ারের মত বাঁকা করে। অথবা খালের উপর কোন পেট উঁচু সিমেন্টের সেতুর মত করে। মাঝে মাঝে কাজলরেখাকে পাখির লেজের মত আড়াআড়ি করে দিয়ে কত কত বিকাল সন্ধ্যা বিলীন করে দিত আমার! যেন ঝিম ধরা লাটিমের একাগ্রতায় পেয়ে বসতো আমাকে নিমেষে।
ওর সম্পর্কে আর একটু বলি। ব্যস, আর একটু। ওর গায়ের রঙ বার্নিশ করা কাঠের মত ছিল। কাঠে যেমন গাছটির বয়স নির্ণয়ের জন্য ঢেউ ঢেউ আঁকাবাঁকা রেখা থাকে তেমন কোন দাগও ছিল না ওর শরীরে। হালকা বাদামি পশমগুলো ধানচারার মত ফুটে থাকতো ওর ত্বকে। আর কি মিষ্টি গান গাইতে পারত মেয়েটা! তুমুল সব গান।
একবার খালিদের একটা গান ও আমাকে শুনিয়েছিল। সরলতার প্রতিমা...। গানটা গাওয়ার সময় মনে হয়েছিল এই গানটা ও ছাড়া আর কেউ কোনদিন গায়নি। ওই গানটা যেন কেবল আমাকে শুনানোর জন্যই শতবর্ষ ধরে কেউ একজন লিখে আসছিল। এরকমই নান্দনিক সব ফিচারে ভরা ছিল সে।
এবার আপনাদের মূল্যবান ধৈর্যটুকু আর হারাতে দেব না। নিজের কথায় চলে আসি। তখন আমি সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে। দিন রাত একটাই চিন্তা মাথায়। কোন মেয়েমানুষের খপ্পরে পড়ি না কেন? সবাই পড়ে, কালো-সাদা-মেটে সব ছেলেরা মেয়েদের সাথে প্রেমে পড়ে তবে আমিই কেন শুধু শুধু অবিচার সইব? পড়ালেখা করে বেশ বিদ্যাসাগর তো হয়েছি! এখন তবে একজন শকুন্তলার ব্যবস্থা হোক। দিন যায়।

২.
ইয়া মাইলখানেক লম্বা লম্বা লোহার পাইপ দিয়ে বালু এনে মহল্লার প্রায় সবাই নিজেদের ডোবা-নর্দমাগুলো ভরে ফেলছে বালুতে। সেই নামার জলাভূমি দিয়ে দূর-দুরান্ত থেকে স্টিমারে আসছে বালু। যেন হিড়িক পড়েছে বালু ভরাটের। বাদ যায়নি বড়বাড়ির ডোবাও। এখানে ৭-৮ দিন ধরে বালু ফেলা হচ্ছে। আমরা যারা পরীক্ষা দিয়ে গুষ্টি উদ্ধার করেছি বলে মনে করছি তারা তো খুশিতে আটখানা। কারণ অন্তত কয়েকদিনের জন্য হলেও জুতসই সময়ে এরকম একটা খেলার সাময়িক মাঠ পেতে যাচ্ছি আমরা। ওখানে নতুন বালুতে নতুন মাপে ক্রিকেট, ফুটবল, কোন কিছু বাদ যাওয়ার কথা ছিল না।
এসব ভাবছিলাম আর লোহার পাইপের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে স্টিমারের কাছাকাছি এসে পড়েছি। কী অবাক ব্যাপার!পাইপে পাইপে এতগুলা ঘরবাড়ি ডিঙিয়ে পথটাকে টেনেটুনে প্রায় সোজা করে খালের ধারে প্রায় স্টিমারের কাছে চলে এসেছি! টের বলতে কিছুই পেলাম না। কিন্তু জীবনের পথটা সেবার খুব করে বেঁকে যায়। সেই ফিরতি বাঁকা পথে একদম খেই হারিয়ে ফেলি আমি।
নতুন বালু এখনো শক্ত হয়নি ভাল করে। এরই মধ্যে আমরা ধুমসে খেলা খেলে যাচ্ছি। খেলতে খেলতে পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়। আর আমি পরীক্ষায় ভাল করে ফেলি। খুশি খুশি লাগে।
কিন্তু ঝামেলা শুরু হয়। আন্ধার গিঁট লাগে একটা। আব্বা একদিন ডেকে আমাকে বলেন, হাতে তার অত টাকা নেই যে আমাকে আরও পড়াবে । পড়তে চাইলে নাকি পড়াতে হবে। ছাত্র। ঘরে হোক আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে হোক। আমাকে পড়াতে হবে!এরকম অবস্থায় আমি ভাবনায় পড়ি।
ভাবছি আর পথ হাঁটছি। মনসুর আলির বাড়ির সরু গলিটা পার হয়ে কেবলমাত্র বড়বাড়ির গলিতে ঢুকেছি। তখনি একটা মহিলার গলা শুনতে পাই। বাসার গেটে মহিলা ও তার মেয়েবয়সী একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমি ফিরে তাকানোতে ভদ্রমহিলার গলার স্বর একদম নেমে গেলো। ইশারা করে আমাকে কাছে যেতে বললেন। আমি কিছুটা অবাক হয়ে কাছে যাই। মহিলা আমার পূর্বপরিচিত। দুই-এক বার এলাকার হাইস্কুলের অভিভাবক প্রতিনিধি পদে তার পোস্টার ঝুলতে দেখেছি গলির মোড়ে, বাজারের ইলেকট্রিক পোলে। তাই আমি একটু ভয় পেয়ে যাই। বিব্রত বোধ করতে থাকি। মহিলার দিকে তাকানো ছাড়া আর কোন দিকে তাকাতে পারছিলাম না তখন। হঠাৎ করে খেয়াল হলো ভদ্রমহিলা তো দূরের কেউ নন। পরিচিত। বেশ কদিন আগেও আমাদের ঘরে ভোট চাইতে এসেছিল। কথায় কথায় জানতে চেয়েছিল আমার কথা। ভাল রেজাল্টের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিল আর ভরসা দিয়েছিল। সেই আন্টি তাহলে আমাকে ডাকল! আমি ভাবি। একটু সাহস আসে। এবার তার মেয়ের দিকে তাকাই। আবছা তাকাই। ঘোলা লাগে সব। চোখ-মুখ-নাক সব ঘোলা মনে হয়। মুহূর্তের জন্য হলেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারছিলাম না। ফলে ফের আন্টির কথায় আমি মনোযোগ দেই।
আবার মেয়েটির দিকে তাকাই। এবার একটু স্পষ্ট করে তাকানোর চেষ্টা করি। তাকে তো এলাকায় কখনোই দেখিনি। আন্টির মেয়ে হলে তো স্থানীয় হিসেবে অনেকবার মহল্লায় দেখা বা অন্তত মুখ চেনার কথা। কই, কখনো তো দেখিনি নাকি অন্য কোন আত্মীয়ের বাসায় ছিল এতদিন?
ভাবতে ভাবতে খুব সুন্দর, শান্তির, মনোরম আর আনন্দের একটা প্রস্তাব দেয় আন্টি। তার মেয়েটাকে পড়াতে হবে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র এ কথা আন্টি সেদিন ভোট চাওয়ার দিন আম্মার কাছ থেকে জেনেছিল। তাই নিজের মেয়েও বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় তিনি আমার কথা হয়ত ভেবে রেখে আমাকে খুঁজছিলেন।
সেদিন তাই সবকিছুই ওই বড়বাড়ির গলির মোড়ে হঠাৎ মিলে গেল আমার। একবারে জুৎসই মিলে গেল। আব্বার কথা মনে পড়ল। ওনাকে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না ভেবে ভাল লাগলো। ভাল লাগলো মেয়েটির কথা ভেবে। খুব বড় চোখ, উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বক। ব্যস, এটুকুই ছিল আমার প্রথম দর্শনের সীমানায়।

৩.
তখনকার বিকেলগুলোতে ‘আশিক বানায়া আপনে’ টাইপের গানগুলো খুব বাজতো। এর-ওর বাড়ির ছাদ-ঘর-বারান্দা থেকে ভেসে আসতো নাকি সুরের সেই জাদুকর গানগুলো। ১৭-১৮ বয়সের কী যে উত্তাপ আমি নিজেই টের পেতাম তখন।
কানে এসে সহজেই তীর লাগত আরও নানান ধরনের। চোখের তীর, কানের তীর- সব ধরনের তীর। আতিফ আসলামের গান, বাপ্পার গান, তাহসান তাদের গান এসে এলোমেলো করে দিচ্ছিলো সব। এরকমই অস্থির সময়ে আমি সত্যি সত্যি একদিন মাস্টার হয়ে গেলাম।
যেন-তেন মাস্টার নয়, একদম লাল চামড়ার চশমাপরা বিজ্ঞ মাস্টার। সেই সময়টায় আমার মুখের চামড়ায় তখনও কিছু ব্রনের দাগ উৎকীর্ণ ছিল, যেন তারা পুরোপুরি তাদের ভিটে মাটি থেকে ভাঙ্গা ঘর তুলে নেয়নি।
অনেক গল্প আছে এমন। ভূরি ভূরি এরকম রোমান্টিক গল্প হয়তো আমরা পড়েছি দেখেছি। আমার এই গল্পটাও ওই ভূরি ভূরি অনেকগুলোর মধ্যে একটি। একদম আলাদা নয়, আগের মতই-পরের মতই। সব সময়ের মতই। কিন্তু গল্পটা সময়ের মতো ছিল না। বরং সময়টা গল্পের মত ছিলো। মেয়েটা গল্পের মত ছিলো না, গল্পটা-ই মেয়েটার মত ছিল। সুন্দর। মেদহীন।
অনুহা বেশ ভাল ছাত্রী। এটা টিউটর হিসেবে আমার কাছে ভাল খবর। আরও খবর যে সে ছোটবেলা থেকেই মুন্সিগঞ্জে নানাবাড়িতে মানুষ। এইখানে সে প্রায় নতুন মানুষই বলা যায়। নতুন সব গল্প। নতুন লাগে সব কিছু। জোয়ারের নতুন পানিতে নতুন পোনার মত অনুভূতি আমাদের। দুই বছরের ব্যবধানের দুইটা মানুষ। আমি পড়াই ও পড়ে।
আমার ইংরেজির উচ্চারণে ও থমকে যায়। বুঝে কি না বুঝে জানি না, বেশ প্রশংসা করতে থাকে আমার। একদম ঠিক যেন নিজের পড়া আমি করছি মনে করে আমি ওকে পড়াতে থাকি। দিনগুলো যেতে থাকে। ধীরে ধীরে ওদের পরিবারে আমি বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠি। অতিরিক্ত পরিমাণে নিয়মিত হয়ে পড়ি। গ্রামার বই- কমন নলেজ, ম্যাথ-সব পড়াতে থাকি ওকে। মাসখানেক যাওয়ার পর বুঝতে পারি পড়াশুনা একটু বেশি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ওর। মানে গণেশটা ঠিক উলটে যাচ্ছে। পড়ার চেয়ে আমার দিকে ওর মনোযোগ বেশি বোধ হলো।
তখন খানা-খন্দকে ভরা রাবিশের রাস্তাও মহাসড়কের মত মসৃণ মনে হত আমার কাছে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এশা অবধি আমি ওকে পড়াতাম। সবগুলো বিষয়। আর আমরা সারাক্ষণ ছুতো খুঁজতাম কীভাবে আরও অনেকক্ষণ পড়ার টেবিলে থাকা যায়।
পড়ার টেবিলটা বোবা বস্তু। না হলে ও কখনই চুপ থাকতো না। একদিন কি একটা পড়ার বিষয়ে ধমক দেয়ায় ছাত্রী আমার কেঁদে ফেলেছিল। তারপর কী ঝড় রে বাবা! ভাঁজ করা যায় এমন পড়ার টেবিলটা কি অপারগ নীরব ছিল সেদিন! ওর কলার মোচার মত চোখ দুইটা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল। হাতের দশ আঙুল দিয়ে মুখটা ঢাকতে গিয়েও লুকাতে পারেনি লাল চোখ। ছোট বাচ্চাদের মত অভিমান জমিয়ে জমিয়ে ঠোঁট- নাক গাল ফুলিয়ে পাকা আমের মত অবস্থা করেছিল। ইশ! সে কী মুহূর্ত!
এভাবে পড়াতে থাকি আমি। ভাল আর বুদ্ধিমতি ছাত্রী হওয়ার কারণে ওকে পড়াতে বেশ সুবিধাই হতো আমার।
ওদের পরিবারটা আমাকে অবাক করত। ওর ছাপোষা বাবা খুব বেশি কাজে মনোযোগী ছিলেন বলা যাবে না। কিন্তু ওর মা সংগ্রামী ছিলেন। আমি মাঝে মাঝে হিসাব মেলাতে পারতাম না। জনপ্রতিনিধিত্ব করার মত এত খরুচে হওয়ার সুযোগ উনার ছিল না।
যাই হোক- আমার কথা ফাঁকে হালকা বলে নিই।
এরই মধ্যে আমি ভার্সিটি ভর্তির ব্যাপারে উঠেপড়ে লেগে যাই। নানান বইটই- কোচিং শিট ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। রাজধানী ও অন্যান্য বিভাগীয় ক্যাম্পাসে গিয়ে পরীক্ষা দেয়ার ধুম পড়ে যায় সেবার। টিউশনির টাকাগুলো কাজে লাগিয়ে মা বাবার স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখার লোভ করি। অনুহা আমার এইসব কর্মকাণ্ডের দিনযাপনে আরো তীব্রভাবে সেঁটে যায়।
তিন চার মাস কাটে। আমি ঢাকার বাইরে পড়তে যাব, এমনটাই চূড়ান্ত হয়ে গেলো। কিচ্ছু করার নেই। অনুহা বিপাকে পড়ে। ও ভাবতেই পারেনি যে আমাকে ঢাকার বাইরে পড়তে যেতে হতে পারে। ওর দিন খারাপ যায়। আমারও। এরকম অবস্থায় ও আমাকে একটা শার্ট গিফট করে একদিন। খুব সুন্দর ছিল শার্টটা। হালকা নিল রঙের উপর ছোপ ছোপ শেডের ছাপ। আমার ক্রমপ্রসারমান কাঁধে বুকে খুব সুন্দর করে এঁটে গিয়েছিল সেটা।
এরপরে দিনগুলো সুখের ছিল না আমাদের দুজনের কারোই। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার এক-দেড় বছর পার করে ফেলেছি। ঢাকায় মাস তিনেক পর পর আসি। ভেকেশানে ঢাকায় আসলে একদম ঘুড়ির মত হয়ে যাই।
অনুহা হঠাৎ একদিন আমার বাসায় সকালবেলা এসে আমার ঘরে হাজির। কলেজের কী যেন একটা কাজ। অনুরোধ করে তার সাথে কলেজে যাওয়ার জন্য। সাথে যাই। টেস্ট এক্সাম এ খারাপ করায় একটু সাক্ষী-টাক্ষি টাইপের কিছু দিয়ে বন্ড সই দিয়ে ফিরে আসি। অনুহা আমাকে বলে-
‘স্যার, তুমি তো আজব মানুষ! আমাকে একদম ভুলে টুলে সারা। তুমি কি পাল্টে গেলে?
আমি আকাশ থেকে পড়ি। বলে কী মেয়ে! এমনিতেই ওর সম্বোধনের ভঙ্গিটার জন্য ওকে আরও বেশি আপন লাগতো। স্যার বলে তুমিতে কথা চালানো- এ এক অদ্ভুত সুন্দর ডাক যেনো। আমি বলি- ‘তুমি তো বেশ সময় কাটাচ্ছো। নতুন বন্ধু-বান্ধব। কলেজের দুটা বছর তো বেশ কাটিয়ে দিলে। শুনলাম জামিল নামের একটা ছেলে তোমার ক্লাসমেট তোমাকে গিফট দিচ্ছে, ঘোরাঘুরি করছো। মডেল টেস্ট আর কোচিং ফাঁকি দিয়ে এদিক-ওদিক দেদারসে আড্ডা দিচ্ছো। এ জন্য রেজাল্ট খারাপ করেছো, দুই সাবজেক্টে তোমার মার্কস ফল করেছে। আর তুমি আমাকে বলছো আমি তোমাকে ভুলে গেছি। ভালই তো মশকরা করতে শিখেছো-
অনুহা লজ্জা পেয়েছিল। সেই মুহূর্তে আমার কথাগুলো মুখ দিয়ে বের হবার জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। ওর এই লজ্জাটা আমার ভাল লেগেছিলো। কারণ আমি জানতাম অসম্ভব ইচ্ছেগুলির কোন অভিভাবক থাকে না। ওগুলো বরাবরই বেওয়ারিশ হয়। তাছাড়া ওরই বা কী দোষ! মিষ্টি মেয়ে। ওর মাথায় এখন বুদ্ধি চাষাবাদের সবসময়। সুন্দর চোখ- হাসি, চাহনি সব ছিল অপহৃত হওয়ার মত। ওইসব জামির-টামিলদের কী অন্যায়? বয়সটাই তো অভ্যাস পাল্টানোর, পোশাক বা মানিব্যাগ পাল্টানোর মত। তাই আমি আর ওকে কিছু বলি না। কারণ বলবৎ রাখার মত অলঙ্ঘনীয় কোনো চুক্তি আমাদের ছিল না। অনুহা আর আমি তাই বাস্তবে পা ফেলি।
এরই দুইমাস পর অনুহার হঠাৎ একটা চাকরি হয়। আমি খোঁজ করি ও ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে কিনা। কিন্তু ও আমাকে ওর চাকরির খবর দেয় কেবল। আমি হতাশ হই। অবাক হই। এত ব্রাইট ব্রেনের মেয়ে পড়াশুনাটা তো একদম বন্ধ করতে পারে না, তাই না? উচিত না। অন্য আরেকজন ছেলেবন্ধুর হেল্পে জবের কাজটা এগিয়ে নেয় ও। জবটা ওর ভালভাবেই হয়ে যায়। এয়ারলাইন্সে জব। রিসেপশানে বসবে।
আমি কষ্ট পাই কি পাই না ঠিক বুঝতে পারি না।

৪.
অটোয়া শহরের শেষ প্রান্তের দিকে একটা ঢালু পথের সুন্দর একটা ছবি। একটা মেয়ে রোদচশমা পরে ছবির ঠিক সামনে। কী সুন্দর হাসি তার। সমুদ্রে-পাহাড়ে তার ভুবনভুলানো রূপ। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে যেন আমার চোখ সরে না। ভিতর থেকে হাহাকার আসতে থাকে আমার। মনে হয় চুপসে যাই কোন এক ফাঁকে। কোন এক অজানা কাঁপুনি লাগে মাথা থেকে হৃদপিণ্ড হয়ে পায়ের পাতা পর্যন্ত। তারপরও স্ক্রল করে ওর টাইমলাইন দেখতে থাকি স্বাভাবিক হয়ে। পোশাক-আশাকে কি পরিবর্তন! সাথে দুর্দান্ত সব নৈসর্গিক দৃশ্য।
হঠাৎ চোখ স্থির হয়ে যায় আমার। মেয়েটার স্ট্যাটাসে চোখ বুলাতে বুলাতে একটা পোস্টে ফেবিকলের মত আটকে যায় আমার চোখ। তাতে লেখা-
‘ও স্যার, তুমি কেমন আছো? কতোদিন দেখি না! তুমি ভাবছো কেন তোমার রিকু আমি একসেপ্ট করি না, তাই না? এটা আমি কখনোই করবো না। তার কারণও বলবো না কোনদিন। এই পোস্টটা তোমার জন্যই সাময়িক পাবলিক করেছি। কারণ জানি তুমি আমাকে চেক কর। এইখানে এই নীল জলরাশি তো তোমার চেয়ে কোমল নয়! এই অন্টারিওর বাতাসে তোমার ছোঁয়া পাই না। কোন কাজে দূরের শহর নভা স্কটিয়া কিংবা আলবার্টা যেখানেই যাই না কেনো সবখানেই সরল হাসি হীরার মত দুর্লভ। জানো স্যার, এখানে আমি ঘড়ির মত মেপে মেপে চলি, তুমি যে আমার ছবিগুলো দেখছো এগুলো মাস শেষে আধঘণ্টার লাফালাফি ছাড়া আর কিছুই না। আর তোমরা ওখানে বসে বসে কী যে ভাবো আমাদের! এইখানে গ্রিনকার্ডের একটা সবুজ কুৎসিত ভূত আমাদের কাঁধে বসে থাকে অহর্নিশ। সরাতে পারি না, তোমাদের এখানে আসতেও পারি না। মেয়েমানুষ। বয়স তো তুমি জানোই। বিয়েটা পর্যন্ত করতে পারলাম না। দেশে আসতে পারি না। ওহ্হো, ভাল কথা। যে জন্য স্ট্যাটাসটা দিতে বসলাম সেটাই লিখলাম না। তোমার সেই ফ্যাকাশে নীল শার্টটার একটা স্পেয়ার বাটন আমি এইখানে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম। তোমাকে জানাইনি তখন। শেষবার আমি তোমাদের বাসায় যাওয়ার দিন হ্যাঙ্গারে রাখা শার্টটা থেকে কেটে রেখেছিলাম তোমার আড়ালে। ভেবেছিলাম শার্টটা তো তোমার কাছেই থাকবে। তোমার প্রিয় শার্টের একটা বোতাম না হয় এট লিস্ট আমার কাছে থাক। তাতে কী এমন ক্ষতি হবে পৃথিবীর! নিচে বোতামটির ছবি দিয়ে দিলাম। আরেকটা কথা স্যার, সেবার তোমার ঢাকা ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি, তোমাকে আমি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম এবং অনেক মার খেয়েছি তার জন্য।
স্যার ভাল থেকো।’